প্রথম সেঞ্চুরিতে অনন্য জয়

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২২, ০৫:১৫ এএম

প্রথম দিনের মতো আবারও নির্ধারিত সময়ের আগেই থামল খেলা। সেদিন হয়নি ১৪ ওভার, কাল ১৭। দুই দিনেই বাংলাদেশ বোলিংয়ে, তাই ক্ষতিটা মুমিনুল হকের দলেরই। কাল যেমন মাহমুদুল হাসান জয়ের ইতিহাস গড়া দিনটিতে আরও এগিয়ে যেতে পারত বাংলাদেশ। খেলা আগে শেষ হওয়ায় তা হলো না। শেষ বিকেলে ফ্লাডলাইটের আলোয় বল করে কয়েকটি উইকেট নেওয়ার সুযোগ হারায় বাংলাদেশ। তাতে অবশ্য দিন খারাপ গেছে তা বলা যাবে না। জয়ের ব্যাটে দিনটি বাংলাদেশেরই। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্টে প্রথম বাংলাদেশি সেঞ্চুরিয়ান থেমেছেন ১৩৭ রানে। এই প্রতিপক্ষের সঙ্গে কোনো বাংলাদেশির সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানও এটি। তার ব্যাটেই আগের দিন বিপদে পড়েও তা কাটিয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। ৪ উইকেটে ৯৮ রানে দিন শুরু করা বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ইনিংস শেষ করেছে ২৯৮ রানে। ৬৯ রানের লিড পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। দ্বিতীয় ইনিংসে নেমে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে বিনা উইকেটে ৬ রান করেছে তারা। তৃতীয় দিন শেষে এগিয়ে ৭৫ রানে।

কাল ইতিহাসের দিনে জয়ের ইনিংসকে বর্ণনা করা যায় তিনটি শটে। উইয়ান মালডার করেন মিডিয়াম পেস। তবে ৪০০ মিনিটের বেশি ব্যাট করা একজনের জন্য ওই মিডিয়াম পেস সহজ না। তাকেই টানা তিন চার মেরে দিলেন জয়। দুটি লং অফ দিয়ে একটি ডিপ মিড উইকেটে। যেন ক্রিকেট শুদ্ধতার প্রতীক সেইসব শট। গ্যাপ দেখে তুলে মারার বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিং। শুধু এই তিন শটে অবশ্য জয়ের ইনিংসের মহত্ত্ব বর্ণনা করা যাবে না। ১৭০ বল খেলে করেছেন ৫০ রান। সেঞ্চুরির আগে তাই জয় কৃতিত্বটা পাবেন সেখানে। বিশ্বের কত ব্যাটারই তো দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে গিয়ে খাবি খেয়েছেন। ভারতের সেরা ব্যাটিং লাইনআপকেও লড়াই করতে হতো সেখানে রান করতে। অথচ জয় ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্টে প্রথমবার দক্ষিণ আফ্রিকায় নেমেই সেঞ্চুরি হাঁকালেন। বিশুদ্ধ ব্যাটিং টেকনিক, শট ও বল ছাড়ার কৌশল। সব মিলিয়ে কোনো প্রোটিয়া বোলারই তাকে বিপদে ফেলতে পারেননি। ওপেনে নেমে ব্যাট ক্যারি করার খুব কাছেই ছিলেন জয়। শেষ ব্যাটসম্যানকে নিয়ে রানের চিন্তা না থাকলেও এই ইনিংসে তাকে আউট করা যেত কিনা সন্দেহ! ৩২৬ বলে ৪৪২ মিনিট ক্রিজে থেকে ১৫টি অসম্ভব সুন্দর চার ও ২টি বিশাল ছক্কায় ১৩৭ করেছেন এই ব্যাটার।

তাতে দেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে এশিয়ার বাইরে ৩০০ বল খেলার কীর্তিও গড়লেন। ইনিংস শুরু করতে নেমে আউট হন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে। মুমিনুল হককে (৭৭) ছাড়িয়ে হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে সর্বোচ্চ রান করা বাংলাদেশি।

নিউজিল্যান্ড জয়ের ইতিহাসেও ৭৮ রানের ধৈর্যশীল ও মহাগুরুত্বপূর্ণ ইনিংস ছিল জয়ের। দক্ষিণ আফ্রিকায় জয়ের ইতিহাস হবে কি না তা সময়ই বলে দেবে। তবে জয়ের ব্যাটে হয়েছে জুটির রেকর্ড। দিনের শুরুতে তাসকিনকে দ্রুত হারালেও লিটন দাশের সঙ্গে দারুণ প্রথম সেশন কাটিয়েছেন দুজনে। তাদের ৮২ রানের জুটিতে সেশন জয় করে বাংলাদেশ। লাঞ্চের পরপরই জুটি ভাঙে জয়-লিটনের। দুইবার জীবন পাওয়া লিটন ৬ চারে ৯২ বলে ৪১ রানে আউট হন। তার আগে ১৬ রানে তার ক্যাচ ফেলেন ডিন এলগার, পরে ৩৯ রানে লেগ স্লিপে মালডার ক্যাচ মিস করলে দ্বিতীয় জীবন পেয়েছিলেন। তাদের ৮২ রানের জুটি অল্পের জন্য ছুঁতে পারেনি আগের কীর্তিকে। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ২০০২ সিরিজে দ্বিতীয় উইকেটে হাবিবুল বাশার ও হান্নান সরকার গড়েছিলেন ৮৪ রানের জুটি। তবে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ষষ্ঠ উইকেটে সেরা জুটির রেকর্ড হয়েছে লিটন ও জয়ের। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম টেস্টে সাকিব আল হাসানের সঙ্গে লিটন গড়েছিলেন ৮২ রানের জুটি।

লিটনের পর ইয়াসির আলিকে নিয়ে ৩৩ রানের ছোট জুটি গড়েন জয়। দারুণ খেলছিলেন দুজনেই। ইয়াসির ২ চারে ৩৭ বলে করেন ২২। কিন্তু উইকেটে সেট হয়েও ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট হয়ে ফেরেন। পরে অষ্টম উইকেটে মিরাজের সঙ্গে আরেকটি ভালো জুটি গড়েন জয়। ৫১ রানের জুটিতে তিনশোর কাছে যাওয়ার সম্ভাবনাও জাগে। সেই সম্ভাবনা সত্যি করেন জয় একাই। দলকে ২৯৮ রানে পৌঁছে দিতে পরের ৩১ রানের পুরোটা একাই নিয়েছেন এই ব্যাটার।

জয়ের ইনিংসে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশে আসা কোচ জেমি সিডন্স পুরোপুরি মুগ্ধ। প্রশংসার কোনো কমতি না রেখে দিন শেষে সিডন্স জানান, ‘আমি মাত্র ২ মাস বাংলাদেশের সঙ্গে আছি। এর মধ্যে যে কয়জন আমার নজর কেড়েছে তার মধ্যে জয় একজন। তার বেসিক, ধৈর্য, ব্যাটিংয়ের ধরন, নিজের খেলার প্রতি মনোযোগ অসাধারণ। এটা তার তৃতীয় টেস্ট ম্যাচ, জয়কে ঘরোয়া ক্রিকেটে যারা দেখেছে তারা ছাড়া কেউই জানে না তার সম্পর্কে। আজকের ইনিংসটিকে আমি ধৈর্য, গ্রেট ম্যাচ পরিকল্পনা এবং যা নিজের মধ্যে আছে তা দেখানোর দারুণ উদাহরণ বলব।’

ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্টেই দুটি দেখার মতো ইনিংস খেলেছেন জয়। শুরুর ধাক্কাটায় নামের মতোই জিতে গেছেন এই তরুণ। বিশ্বকাপ (অনূর্ধ্ব-১৯) জয়ের সাহস তার বুকে আছে। এবার আন্তর্জাতিকে জয়ের পালা ‘জয়ের’। তার আগে অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকায় ঐতিহাসিক টেস্ট জয়েই মন দিচ্ছেন এই তরুণ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত