বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার ও জামিন না দেয়া, কলেজের শিক্ষক লতা সমাদ্দারকে টিপ পরার কারণে পুলিশ সদস্য কর্তৃক লাঞ্ছনার ঘটনাসহ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের ১৮ জন নাগরিক।
বুধবার এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগের কথা জানান তারা। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ গণমাধ্যমে বিবৃতিটি পাঠিয়েছেন।
বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন- আব্দুল গাফফার চৌধুরী, সৈয়দ হাসান ইমাম, অনুপম সেন, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, সারোওয়ার আলী, আবেদ খান, সেলিনা হোসেন, লায়লা হাসান, আবদুস সেলিম, মফিদুল হক, শফি আহমেদ, শাহরিয়ার কবীর, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, মুনতাসীর মামুন, সারা যাকের, শিমূল ইউসুফ, হারুণ হাবীব।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি বাংলাদেশে সংঘটিত বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত করেছে, যা জাতির জন্য বহন করছে অশনিসংকেত। বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার ও জামিন না দেয়া; কলেজের শিক্ষক লতা সমাদ্দারকে টিপ পরার কারণে পুলিশ সদস্য কর্তৃক লাঞ্ছনার ঘটনা; মুজিব শতবর্ষে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙা; পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষকে ঘৃণা করার শিক্ষা সম্বলিত রচনার অন্তর্ভুক্তি; দুবছর আগে একজন সচিবের ‘টাকনু’র ওপরে কাপড় পরার বাধ্যবাধকতা সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি এবং বাংলা নববর্ষের প্রভাতে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে ‘বেদাত’ বলে ঘোষণা রাষ্ট্রকাঠামোর অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তির অবস্থানকে পাকাপোক্ত করেছে।
আরও বলা হয়েছে, বিগত কয়েক বছরে সমাজে বিচ্ছিন্নভাবে ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী সহিংস ঘটনা ঘটিয়েছে। যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কতিপয় সদস্য সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে শিক্ষক, শিল্পী ও সাধারণ মানুষকে নানাভাবে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত করছে। তখন জনগণের মনে হওয়াটা স্বাভাবিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধের মূল চারনীতি ও মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করতে সচেষ্ট নয়।
‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিকে বিধর্মীদের সংস্কৃতি বলে মিথ্যাচার করে সরকারের ও রাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থান নেয়া স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার-আলবদরের উত্তরসূরিরা আজ রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করার প্রয়াস নিয়েছে।’
এ প্রবণতা রোধ এবং এর শিকড় উৎপাটন করার এখনই সময় বলে উল্লেখ করে বিবৃতিদাতারা বলেন, অতিসত্বর ব্যবস্থা সরকারকে নিতে হবে। দ্বিধা ও বিলম্ব মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে।
‘বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়ে যে প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উদ্ভব হয়েছে সেই ধারায় অনুগত শিক্ষা ও সংস্কৃতির উত্থান ঘটিয়ে দেশকে পশ্চাৎপদ রাষ্ট্রে পরিণত করার পাঁয়তারা করা হয়েছে।’
তারা আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এক যুগেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থেকেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে সেই রাহুমুক্ত করতে পারেনি। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের অবৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও সাম্প্রদায়িক পাঠদানই আজকের এই বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশের শিক্ষাধারায় বিজ্ঞান ভিত্তিক ও সমতার সমাজ গড়ার লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে পাঠ্যসূচি থেকে যেকোনো ধরনের ঘৃণা সঞ্চারী রচনা বাদ দেওয়ার দাবি করছি।
শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে তারা বলেন, যে কিশোর ছাত্ররা মৌলবাদী চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে অপমান করে পুলিশে সোপর্দ করেছে তাদের মধ্যে মানবিক চেতনার বিকাশ ঘটানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে পুলিশ ও প্রশাসনের যে সকল ব্যক্তি এহেন কাজে সহযোগিতা ও ইন্ধন জোগাচ্ছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।
