পুলিশের চোখে নির্দোষ পিবিআই তদন্তে অপরাধী

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২২, ০৬:৩২ এএম

গোপালগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সুমন খান (২৭) হত্যা মামলায় থানা পুলিশ এজাহারভুক্ত যে চার আসামির নাম বাদ দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছিল, অভিযোগপত্রের আসামি মইয়ার শেখ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকান্ডে এ চারজনের জড়িত থাকার তথ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে মোস্তফা শিকদার নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এজাহারের ১২ নম্বরে থাকা এই আসামি হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট পিবিআই কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে হত্যা মামলার অভিযোগপত্র থেকে ঘটনার হোতাসহ এজাহারভুক্ত চার আসামির নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগে মামলাটির প্রথম তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার বিচার চেয়েছেন বাদী মো. রুহুল আমিন খান রিপন। গত ২৮ মার্চ তিনি বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের ‘আইজিপি’স কমপ্লেইন সেল’-এ লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা হলেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার আমিনুর রহমান।

পুলিশ কর্মকর্তা খন্দকার আমিনুর হত্যাকারীদের দিয়ে ১২টি মামলা করিয়ে নিহত সুমন খানের পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের প্রতিনিয়ত হয়রানি করছেন বলেও ওই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের এ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্তেরও দাবি করেছেন সুমনের ভাই রুহুল আমিন খান রিপন। জমিজমাসংক্রান্ত  বিরোধের জের ধরে ২০২০ সালের ৩০ অক্টোবর সকালে হামলায় নিহত হন মুকসুদপুর উপজেলার পূর্ব ভাকুড়ী গ্রামের মো. আলী খানের ছেলে সুমন খান। তিনি ঢাকার ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বিএসসি ইন টেক্সটাইল অনুষদের ১৪ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। সুমনের ভাই মো. রুহুল আমিন খান রিপন বাদী হয়ে ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয়ের ১৫-২০ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুকসুদপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলো হুমায়ুন কবির খান ওরফে বিল্লাল, মইয়ার শেখ, মঞ্জুর শেখ, মুকুল শেখ, দুলাল মোল্লা, লুৎফর শেখ, কবির শেখ, ইবাদ শেখ, রুহুল শেখ, রুবেল শেখ, এনায়েত শিকদার, মোস্তফা শিকদার, সুজন শিকদার, আতিক শেখ, মনির শেখ ও ফোরকান শিকদার।

মামলাটি তদন্ত করে গত বছর ২৪ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার আমিনুর রহমান। ওই অভিযোগপত্রে এজাহারভুক্ত ১ নম্বর আসামি হুমায়ুন কবির খান ওরফে বিল্লাল, ৯ নম্বর আসামি রুহুল শেখ, ১২ নম্বর আসামি মোস্তফা শিকদার ও ১৬ নম্বর আসামি ফোরকান শিকদারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

রুহুল আমিন খান রিপন আদালতে পুলিশের এ অভিযোগপত্রের ওপর নারাজি দিলে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই গোপালগঞ্জ জেলা ইউনিট। জেলা পিবিআইয়ের পরিদর্শক আমিরুল ইসলাম কিছুদিন তদন্ত করলেও বর্তমানে তদন্ত করছেন পরিদর্শক শাহ কামাল। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মোস্তফা শিকদারকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। অথচ থানা পুলিশের অভিযোগে ঘটনার সময় মোস্তফা শিকদার ঢাকায় অবস্থান করছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

পিবিআই কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় মোস্তফা শিকদারকে গ্রেপ্তার করেছি।’

পরিদর্শক শাহ কামাল বলেন, ‘মামলাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। আমি তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর মামলার ২ নম্বর আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাতে অনেকের নামই এসেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখন বলা যাচ্ছে না।’ মামলার আসামিদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১২ জন বর্তমানে জামিনে আছেন।’

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের কাছে করা আবেদনে মামলার বাদী রুহুল আমিন খান রিপন উল্লেখ করেন, তার ছোট ভাই সুমন খানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা মুকসুদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার আমিনুর রহমান সঠিকভাবে তদন্ত করেননি। তিনি আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অবৈধ অর্থ নিয়ে এজাহারভুক্ত এক নম্বর আসামিসহ চার আসামির নাম বাদ দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছেন। আমিনুর রহমান সরেজমিন সাক্ষীদের সাক্ষ্য না নিয়ে নিজেই সাক্ষ্য লিখে আদালতে জমা দিয়েছেন।

অভিযোগপত্রে রুহুল আমিন আরও উল্লেখ করেন, খন্দকার আমিনুর রহমান বর্তমানে হত্যা মামলার আসামিদের তাগিদ দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা করিয়েছেন। এর মধ্যে তিনটি জিআর এবং নয়টি সিআর মামলা। প্রতিটি মামলার আসামি করেছে ৩০ থেকে ৪০ জন করে। এসব মামলা করার মূল কারণ তাদের হয়রানির মধ্যে রাখা যাতে ভাইয়ের হত্যাকা-ের মামলার সুষ্ঠু তদন্তে সহযোগিতা করতে না পারি। এছাড়া পরিদর্শক খন্দকার আমিনুর রহমান মামলাটির সুষ্ঠু তদন্ত না করার কারণে তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। খন্দকার আমিনুর রহমানকে জরুরি ভিত্তিতে বদলি না করা হলে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে করানো মামলায় হয়রানি বাড়তে থাকবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার আমিনুর রহমান গত বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তরে অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি তদন্ত করেছি সুষ্ঠুভাবে। যারা জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। যারা জড়িত নয় তাদের বিরুদ্ধে তো চার্জশিট দেওয়া যায় না।’

বাদীপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে পাল্টা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার থানায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। আমি মামলা করাব কেন। আমি পেশাদার পুলিশ।’

অথচ সুমন হত্যা মামলার বাদীপক্ষের বিরুদ্ধে মুকসুদপুর থানায় আসামিপক্ষের স্বজনদের করা মামলার কপি রয়েছে দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের কাছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত