ধর্ম অবমাননার মামলায় কারাগারে থাকা মুন্সীগঞ্জের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডল ১৯ দিন পর মুক্তি পেয়েছেন। গতকাল রবিবার বেলা দেড়টার দিকে মুন্সীগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক অতিরিক্ত জেলা জজ মোতাহারাত আখতার ভূঁইয়া তার জামিন মঞ্জুর করেন। পরে বিকেল ৫টার পরে জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের বিনোদপুর রামকুমার উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডল।
গত ২০ মার্চ দশম শ্রেণির একটি অনির্ধারিত ক্লাসে গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করছিলেন হৃদয় মণ্ডল। সেখানে একজন ছাত্র বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের তুলনা করে কিছু প্রশ্ন করে। হৃদয় মণ্ডল সেগুলোর জবাব দেন। ক্লাসের এক ছাত্র ওই আলোচনা মোবাইলে রেকর্ড করে এবং তা ছড়িয়ে দেয়। দুদিন পর কিছু ছাত্র ও স্থানীয় লোকজন মিলে হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। পরে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়। ওই রাতেই স্কুলের অফিস সহকারী আসাদ বাদী হয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা করলে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে। পরে গত ২৩ ও ২৮ মার্চ হৃদয় মণ্ডলের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে আদালত, যা নানামুখী আলোচনার জন্ম দেয়।
এদিকে গতকাল দুপুরে জামিনের শুনানির সময় আদালতে আনা হয়নি হৃদয় মন্ডলকে। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা শুনানি শেষে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করে। পরে সোয়া ৪টার দিকে জামিননামার কাগজ কারাগারে পৌঁছালে আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেল ৫টার দিকে ছাড়া পান তিনি।
হৃদয় মণ্ডলের আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহিন মোহাম্মদ বলেন, বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডল ধর্ম অবমাননার কোনো উক্তি করেননি। বিজ্ঞ আদালত ৫ হাজার টাকা বন্ডে তার জামিন মঞ্জুর করেছেন।’
এই আইনজীবী বলেন, ‘বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রদের মোবাইল ফোন নিয়ে শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার এখতিয়ার নেই। অথচ শ্রেণিকক্ষে ছাত্ররা হৃদয় মণ্ডলকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নানা প্রশ্ন করে তা রেকর্ড করেছে। মামলার বাদী যে অভিযোগ করেছিলেন সরকারপক্ষ আদালতে তা প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু ছাত্ররা যে উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত হয়ে তাকে নানা প্রশ্ন করেছে আমরা আদালতে সেটা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি।’
এদিকে শিক্ষক হৃদয় মন্ডলের স্ত্রী ববিতা হাওলাদার বলেন, ‘ধর্ম অবমাননার মামলায় আমার স্বামী কারাগারে গেলে সাংবাদিকরাই আমাদের পাশে ছিলেন। এ জন্য সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানাই। জামিন মঞ্জুর করায় আমরা খুশি।’
কারামুক্ত হওয়ার পর হৃদয় চন্দ্র মন্ডল বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এ রকম পরিস্থিতিতে যাতে রাষ্ট্রের আর কেউ না পড়ে, আমি সেই কামনা করি।’ পরিবার ও তার নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের কাছে আমার ও আমার পরিবারের নিরাপত্তা চাচ্ছি।’ তিনি যেন আগের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে রাষ্ট্রের সহযোগিতা কামনা করেন। পরে পরিবার নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন হৃদয় মণ্ডল।
মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান : বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের জামিনে স্বস্তি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন আর্টিকেল নাইনটিন। একই সঙ্গে সংগঠনটি হৃদয় মন্ডলের মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানায় সংগঠনটি।
আর্টিকেল নাইনটিন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল বিবৃতিতে বলেন, ‘যে কারণে হৃদয় মণ্ডলকে কারাগারে যেতে হলো তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাডেমিক স্বাধীনতা তথা মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভিন্নমত চর্চার ধারণাকে হুমকির মুখে ফেলে দিল। এটি দেশের সব শিক্ষক ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের মনে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করবে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যায়, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সহনশীলতা, যুক্তিবোধ তথা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জ্ঞানভিত্তিক, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য জরুরি। তাই এ ঘটনাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নেওয়া উচিত।’
আর্টিকেল নাইনটিন জামিনে মুক্তির পর হৃদয় মণ্ডল ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাটি প্রত্যাহারের দাবি জানায়।
