পুঁজিবাজারে লেনদেন বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) প্রায় সব উদ্যোগ ব্যর্থতায় রূপ নিচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমাসহ বাজার মধ্যস্থতাকারীদের একাধিক বৈঠকের পরও বাজারে কোনো প্রভাব পড়েনি। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েও বিনিয়োগে ফেরেননি। ফলে তারল্য সংকটে পড়ে পুঁজিবাজারে বড় দরপতন হচ্ছে। দরপতনের সর্বোচ্চ সীমা কমিয়ে আনার পরও পতন ঠেকানো যাচ্ছে না।
গতকালও পর্যাপ্ত ক্রেতার অভাবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কেনাবেচা হওয়া ৮৩ শতাংশ শেয়ারের দর কমেছে। এর মধ্যে ১১৯টি শেয়ারের সর্বোচ্চ দর কমেছে। লেনদেনের একপর্যায়ে এসব শেয়ারে কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। ফলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৬৪ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে। সূচক নেমে এসেছে ৬৫৭৪ পয়েন্টে।
রমজান মাসকে কেন্দ্র করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নগদ টাকার চাহিদার কারণে বিক্রিচাপ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তবে ঢালাও দরপতনে গুজব প্রধান ভূমিকা রেখেছে। গত ৮ মার্চ শেয়ারের সর্বোচ্চ দর হ্রাসের সীমা ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা প্রত্যাহার করে ২০২০ সালের মতো পুনরায় ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হতে পারে, এমন গুজব তৈরি হয় বাজারে। যদিও এসইসির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, এমন কোনো উদ্যোগ কিংবা আলোচনা কমিশনে হয়নি।
এদিকে পুঁজিবাজারকে সাপোর্ট দিতে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। আইসিবির মাধ্যমে এ বিনিয়োগ হলেও তা বাজারে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। রমজান মাসে বাজার মধ্যস্থতাকারীরা প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা তা রক্ষা করেনি বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে। ব্যাংক কিংবা বীমা কোম্পানিও এ সময়ে বিনিয়োগে নিষ্ক্রিয় রয়েছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে এসইসির পদক্ষেপ ভেস্তে গেছে। ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগনির্ভর পুঁজিবাজারে রোজার মাসে আরও পতনের শঙ্কা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। কারণ আসন্ন রোজার ঈদের প্রয়োজন মেটাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আরও বিক্রিচাপ আসতে পারে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশের পুঁজিবাজারে চলা অব্যাহত পতন ঠেকাতে গত ৮ মার্চ শেয়ারের সর্বোচ্চ দর হ্রাসের সীমা ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এতে করে পরদিন সূচক ১৫৫ পয়েন্ট বেড়ে ৬৬৩০ পয়েন্টে উন্নীত হয়। এরপর কিছুদিন বাজারে স্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ায় সূচকটি ৬৭৭১ পয়েন্টে উন্নীত হয়। তবে ২৩ মার্চ থেকে আবারও অস্থিরতা দেখা দেয়। লেনদেন কমে যাওয়ার পাশাপাশি সূচকও কমতে শুরু করে। গত ছয় কার্যদিবসের মধ্যে পাঁচ দিনই পতন দেখা যায় বাজারে।
গতকালও লেনদেনের শুরু থেকেই অধিকাংশ শেয়ারের বিক্রিচাপের কারণে দরপতন দেখা দেয় এবং বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা বাড়তে থাকে। পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় দিনশেষে ৩৩৭টি সিকিউরিটিজ দর হারায়। বিপরীতে মাত্র ১৮টি কোম্পানির দর বাড়ে। তবে সবগুলো খাত বাজার মূলধন হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে কাগজ ও প্রকাশনা, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সেবা ও নির্মাণ এবং টেলিকম খাতের।
গতকাল পুঁজিবাজারে লেনদেনও খানিকটা কমেছে। ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ৫৩৩ কোটি টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট, যা আগের দিনের চেয়ে ২৪ কোটি টাকা কম।
তবে মূলবাজারে বড় পতন হলেও উল্টো চিত্র ছিল এসএমই মার্কেটের। গতকাল এ খাতের সব কোম্পানির সর্বোচ্চ দর বেড়েছে। এতে করে ডিএসই এসএমই সূচকটি প্রায় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
