দেড় বছরে ২১ হাজার কোটি টাকার সুকুক

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২২, ১২:২০ এএম

বাংলাদেশে সুকুক বন্ড চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি খাতে মোট ১৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এসেছে। এর মধ্যে সরকারি খাতের দু’টি প্রকল্পে সুকুক ইজারার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বেসরকারি খাতের একটি প্রতিষ্ঠান ৩ হাজার কোটি বিনিয়োগ নিয়েছে সুকুক বন্ড ছেড়ে। এবার নতুন আরেকটি প্রকল্পে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এর মধ্যে দিয়ে মাত্র দেড় বছরে সরকারি বেসরকারি খাতে ২১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আসছে সুকুক থেকে।

সরকারি খাতে সুকুক বন্ডের ১৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ দিয়ে সুপেয় পানির বন্দোবস্ত ও প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়। এবার গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (আইআরআইডিপি)-৩ বাস্তবায়নে সুকুক বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করবে সরকার। এই প্রকল্পে ব্যয়ের জন্য সুকুক বন্ড ছেড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

এ লক্ষ্যে আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে একটি নিলাম আয়োজন করবে ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ইসলামিক সিকিউরিটিজ সেকশন। পাঁচ বছর মেয়াদে এই সুকুক বন্ড ইস্যু করা হবে। বন্ডের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ২০ এপ্রিল।

এ সুকুকে বিনিয়োগের বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের বার্ষিক ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে ‘ভাড়া’ বছরে দুইবার পরিশোধ করবে সরকার। মেয়াদপূর্তির ভিত্তিতে প্রতি বছর অক্টোবরের ২০ তারিখ এবং এপ্রিল মাসের ২০ তারিখ এই ভাড়া পরিশোধ করবে সরকার।

এই সুকুকের অভিহিত মূল্য হবে ১০ হাজার টাকা। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানিগুলো তাদের নিজের জন্য ১০ হাজার টাকার গুণিতক যেকোনো পরিমাণে সুকুক কেনার জন্য নোটিসে বর্ণিত পদ্ধতিতে বিড দাখিল করতে পারবে।

এছাড়া নিলামে দেশি-বিদেশি যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে অবস্থিত যেকোনো ইসলামিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ইসলামিক শাখা বা উইন্ডো পরিচালনাকারী প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে যাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চলতি হিসাব বা আল-ওয়াদিয়াহ হিসাব রয়েছে তাদের মাধ্যমে বিড দাখিল করতে পারবে।

এবারের সুকুক বন্ডের মধ্যে ৮৫ শতাংশ বন্ড শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানির জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ইসলামিক শাখা বা উইন্ডো পরিচালনাকারী প্রচলিত ব্যাংকগুলোর জন্য সংরক্ষিত থাকবে ১০ শতাংশ বন্ড। বাকি ৫ শতাংশ বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারবে ব্যক্তি, ভবিষ্য তহবিল, আমানত বীমা তহবিল ও অন্যরা।

আগামী মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সুকুক বন্ডে বিনিয়োগের জন্য বিড দাখিল করা যাবে। বিডে কৃতকার্য বিডারদের তাদের আবেদনের বিপরীতে বরাদ্দকৃত সুকুকের পরিমাণ একই দিনে ই-মেইলের মাধ্যমে অবহিত করা হবে। অকশন-পরবর্তী কার্যদিবসে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে রক্ষিত আল-ওয়াদিয়াহ বা চলতি হিসাব বিকলন এবং সিকিউরিটিজ হিসাব আকলন করে এ লেনদেন সম্পন্ন করা হবে। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংক সুকুক নিলামসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

প্রসঙ্গত, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুদনির্ভর ব্যবসা না করার কারণে সরকারের অনেক ধরনের বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারছিল না। এ কারণে দীর্ঘদিন গবেষণার পর ২০২০ সালে সরকার ইসলামিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুকুক ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেয়।

২০২০ সালের ৮ অক্টোবর সুকুক ইস্যু ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত নীতিমালায় অনুমোদন দেয় সরকার। ওই নীতিমালার চতুর্থ অনুচ্ছেদে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংককে এই বন্ডের ‘স্পেশাল পারপাস ভেহিকল’ বা এসপিভি এবং ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক দুই দফায় বিনিয়োগকারীদের কাছে সুকুকের সার্টিফিকেট বিক্রি করে।

২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে গণস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পরিচালিত একটি প্রকল্পে ব্যয়ের জন্য প্রথম দফায় ৪ হাজার কোটি টাকা তোলে সরকার। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। দ্বিতীয় দফার নিলাম ২০২১ সালের ২৮ জুন আরও ৪ হাজার কোটি টাকা তোলে সরকার।

এরপর ২০২১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্প’-এর প্রথম পর্যায়ের ব্যয় মেটাতে ‘সুকুক’ বন্ড ছেড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ নেয় সরকার। পাঁচ বছর মেয়াদে নেওয়া এই বিনিয়োগের বিপরীতে ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ ভাড়া পরিশোধ করবে সরকার।

এদিকে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও সুকুক ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে পুঁজিবাজারে সুকুক বন্ড ছেড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো লিমিটেড। এই সুকুকের ৭০ শতাংশের ক্রেতা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বেক্সিমকো ছাড়াও সুকুকের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে আরও বেশ কয়েকটি কোম্পানি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (এসইসি) আবেদন করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত