দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ ২৫ এপ্রিল। ১৮৮৮ সালের এই দিনে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই বন্দরের। এরপর দীর্ঘ অভিযাত্রায় বিশে^র শীর্ষ বন্দরগুলোর কাতারে স্থান করে নিয়েছে এ বন্দর। বন্দর কর্মকর্তাদের মতে, অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে এ অবস্থানে এসেছে বন্দর। বিশেষ করে করোনায় যখন বিশ্বের বড় বড় বন্দর পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে, তখনো চট্টগ্রাম বন্দর ধরে রেখেছে নিজস্ব চালিকাশক্তি।
বন্দরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিশ^ব্যাপী কভিডের ভয়াবহ সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ধাক্কা খাওয়ায় প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর কার্গো হ্যান্ডলিং, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং আর শিপ হ্যান্ডলিং প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি অর্জনে চমক লাগিয়েছে। ২০২০ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং হয় ১০ কোটি ৩২ লাখ ৯ হাজার ৭২৪ মেট্রিক টন। আর ২০২১ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ কোটি ৬৬ লাখ ১৯ হাজার ১৫৮ মেট্রিক টন। গত বছর কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১২.৯৯ শতাংশ। ২০২০ সালে যেখানে বন্দরে মোট কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭৭ টিইইউস, সেখানে ২০২১ সালে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ লক্ষাখ ১৪ হাজার ৫৪৮ টিইইউস। ২০২০ সালে বন্দরে জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছিল ৩ হাজার ৭২৮টি আর ২০২১ সালে হয় ৪ হাজার ২০৯টি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দুই বছর অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে চট্টগ্রাম বন্দর সামনের দিকে এগিয়েছে। বিশেষ করে করোনার ভয়াবহ দিনগুলোতে বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকরা যেভাবে বন্দরের গতিশীলতা রক্ষায় নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন তা অকল্পনীয়। করোনায় ৫৩ জন সহকর্মীকে হারানোর পরও এক দিনের জন্য বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকেনি। করোনার মধ্যে যেখানে সিঙ্গাপুর, কলম্বোসহ বিশে^র শীর্ষস্থানীয় বন্দরগুলোর অপারেশনাল কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখনো চট্টগ্রাম বন্দরে স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।
তিনি বলেন, একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বন্দরের আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল, কর্ণফুলীর ক্যাপিটেল ড্রেজিং, মাতারবাড়ী বন্দর নির্মাণ, বে-টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে।
বন্দরের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ‘চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার্স অ্যাক্ট’-এর অধীনে ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য গঠিত হয় ‘চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্ট’। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বন্দরের কার্যক্রমের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৭৬ সালে বন্দর ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ ১৯৭৬ জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে এ পর্যন্ত বন্দর পরিচালিত হয়ে আসছে। গত ৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিল-২০২২ নামে নতুন আইন পাস হয়েছে।
এস এস টেনাসিটি নামক জাহাজে পরিবাহিত ৬টি কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে ১৯৭৭ সালে কন্টেইনার পোর্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯৮৯ সালে প্রথম ১ লাখ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়। আর ২০১৯ সালে এসে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। কিন্তু কভিড পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালে এসে কিছুটা পিছিয়ে পড়ে বন্দর। গেল বছর করোনার শুরুতে নজিরবিহীন কন্টেইনার জটের শিকার হয়ে অনেকটা অচল হয়ে পড়ে বন্দর। পরবর্তীকালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বন্দরের গৃহীত পদক্ষেপে এ সংকট কাটাতে সক্ষম হয় বন্দর। যদিও তাতে বেশ ক’মাস সময় লেগে যায়। কন্টেইনার হ্যান্ডলিং, শিপমেন্ট, ডেলিভারি সবকিছুই চলছে স্বাভাবিক গতিতে। অন্যান্য বছর রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে কন্টেইনার জট সৃষ্টি হলেও এবার তা হবে না বলে আশা প্রকাশ করছেন বন্দর কর্মকর্তারা।
