র্যাবের (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দোষারোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। সংসদীয় কমিটি বলেছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের আগে থেকে না জানার বিষয়টি অবশ্যই বড় ব্যর্থতা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কমিটির সদস্যরা সমালোচনা করেন এবং বাংলাদেশ কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা জানতে চান।
গতকাল বুধবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।শুধ র্যাব নয়, শ্রম আইন নিয়েও বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ রয়েছে বলে আলোচনা উঠেছে কমিটির বৈঠকে। কমিটির সদস্যরা বলেছেন, এ ছাড়া শ্রম আইন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও চাপ আছে। এ জন্য ইইউর জিএসপি সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্য কোনো দেশ বা সংস্থা থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে কি না, তা অবহিত করার পাশাপাশি আমেরিকা, ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশে অবস্থিত মিশনগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বেশ কিছু উন্নয়ন সহযোগী আইনপ্রণেতারা বাংলাদেশের কাছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, গুম, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকদের নামে মামলা ও রাজনৈতিক মামলা ইত্যাদি তথ্য চেয়েছেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য না পাওয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যথাসময়ে চিঠির জবাব দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, ‘বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোই লবিস্ট হিসেবে কাজ করে। আর দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেই দেশের আইনপ্রণেতাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ না হওয়ার কারণে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত লবিস্ট ফার্মগুলো কখনো কখনো বেশি প্রভাব বিস্তার করে। তাই সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহির প্রশ্ন রয়েছে বিধায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে বিদেশে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’
বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, র্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি কিছুটা সময়সাপেক্ষ হবে। তিনিও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথার সূত্র ধরে বলেন, ‘যথাসময়ে তথ্যগুলো পেলে এবং সেগুলো সংশ্লিষ্ট দেশ বা সংস্থাগুলোর কাছে উপস্থাপন করতে পারলে, বাংলাদেশকে এ ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হতো না।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অপপ্রচার মোকাবিলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মিশনগুলো আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।’
পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘সরকারবিরোধী একটি চক্র বিপুল অর্থের বিনিময়ে লবিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ভুল ও অসত্য তথ্য দিয়ে দেশের স্বার্থ পরিপন্থী কাজ করেই যাচ্ছে। এসব প্রতিহত করার লক্ষ্যে দূতাবাসগুলো কাজ করে গেলেও সেভাবে সফলতা আসেনি।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমেরিকা উইংয়ের ডিজি ফাইয়াজ মুরশিদ কাজী বলেন, ‘কভিডের কারণে বাইডেন সরকার আসার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা ওয়াশিংটন মিশনের সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনার সুযোগ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি কোনো ফোরামে উপস্থাপন না করে, খুব গোপনীয়ভাবে করেছে।’
বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, কমিটির সভাপতি মুহম্মদ ফারুক খান বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়ে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস আগে থেকে অবহিত না হওয়ার বিষয়টি বড় ব্যর্থতা বলে উল্লেখ করেন। তিনি মালয়েশিয়া ও লেবানন দূতাবাসের বিরুদ্ধে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগ তোলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ সব মিশনকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার পরামর্শ দেন।
এদিকে র্যাবের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে ফারুক খান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। সেখানে র্যাবের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর যেকোনো দেশে এ ধরনের প্রেক্ষাপটে একটি-দুটি ভুল হতেই পারে। মোটামুটি আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে র্যাব অনেক ভালো কাজ করছে। যদি কোনো ভুল করে থাকে, তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফ্যাক্ট অ্যান্ড ফিগার দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের যারা অংশ নিয়েছেন, আমাদের মনে হয়েছে তারা সন্তুষ্ট হয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘যেকোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করলে কখনো ভুল হতে পারে। আমাদের কথা হলো যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, সেটা আমরা শোধরাতে যা যা করা দরকার, তা করা হচ্ছে। পৃথিবীর ৫ হাজারের ব্যক্তি গুমের মধ্যে বাংলাদেশে ৫৬-৫৭ জন। আমাদের প্রতিবেশী দেশেও এই সংখ্যা অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রকে বলা হয়েছে, গুমের বিষয়ে স্পেসিফিক কোনো তথ্য দেওয়া হলে বাংলাদেশ সরকার সেটা দেখবে। এটাও বলা হয়েছে, যদি কোনো সমস্যা থাকে সেটা ইমপ্রুভ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোকে কাজে লাগানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা আগের বৈঠকে দুই দেশের কমন বন্ধু দেশগুলোকে কাজে লাগানোর কথা বলেছিলাম।’
কমিটির সদস্য নাহিম রাজ্জাক বলেন, ‘সরকারকে বিশ্ববাসীর কাছে বিতর্কিত করতে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিভিন্ন দেশে লবিস্ট নিয়োগ করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এই অপপ্রচার মোকাবিলায় বিদেশে অবস্থিত বিভিন্ন মিশন তথা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হচ্ছে।’
হাবিবে মিল্লাত বলেন, ‘বিরোধী দলগুলো বাংলাদেশের ভারমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য যেভাবে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, সেখানে মিশনগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়েছেন।’
বৈঠকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ফারুক খানের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ও মো. হাবিবে মিল্লাত অংশগ্রহণ করেন।
