মন্ত্রীপত্নীর ‘মহান’ কীর্তির পর

আপডেট : ১১ মে ২০২২, ১০:১৬ পিএম

মন্ত্রী মহোদয়দের সম্পর্কে আমাদের সবারই অল্পবিস্তর অভিজ্ঞতা আছে। একদম কাছে যেতে না পারলেও স্কুলে হয়তো মন্ত্রীকে দেখেছেন। হয়তো, মন্ত্রীর অপেক্ষায় কড়া রোদে কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। খুব ভাগ্যবান হলে, মন্ত্রীর গলায় মালাও পরিয়ে দিয়েছেন। সেটা আপনার বাবা-মায়ের কাছে অমূল্য স্মৃতি হয়ে আছে। আত্মীয়স্বজনের কাছে গল্প করেন, আমার ছেলে অমুক মন্ত্রীর গলায় মালা পরিয়ে দিয়েছিল। এত সুন্দর করে পরিয়েছিল যে মাননীয় মন্ত্রী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছেন, এই ছেলে এক দিন...।

তা আমারও কিছু অভিজ্ঞতা আছে। একবার আমাদের এক অনুষ্ঠানে প্রভাবশালী মন্ত্রীর প্রধান অতিথি হয়ে আসার কথা, কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে বিকেলে তার হঠাৎ মনে পড়ল, নির্বাচনী এলাকায় জরুরি সভা আছে। যেতেই হবে। ওদিকে আমাদের দর্শকরা সমবেত হয়ে গেছেন এরই মধ্যে। মন্ত্রীর কথা শুনবেন বলে। কী করা যায়! মন্ত্রী মহোদয় আমাদের অবস্থা বুঝে সম্ভাব্য কয়েকজন বিকল্পের সন্ধান দিলেন। কিন্তু তারাও তো মন্ত্রী। মাত্র এক ঘণ্টার নোটিসে কোথাও অতিথি হয়ে গেলে মন্ত্রিত্ব হালকা হওয়ার ঝুঁকি। দেখা গেল, প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো কাজ। আবার শরণাপন্ন হলাম আমাদের আসল মন্ত্রীর। কেউ রাজি নন শুনে বললেন, ‘বিটিভি যে যাবে সে কথা বলোনি?’

আমরা মাথা নাড়লাম।

তিনি হাসলেন। ‘যাও, বলো গিয়ে যে বিটিভির ক্যামেরা আসছে।’

তখন বিটিভি একমাত্র টিভি চ্যানেল। সেখানে কয়েক সেকেন্ড মুখ দেখাতে পারলেই সেই মুখ মানুষের কাছে স্থায়ী হয়ে যায়। তবু মন্ত্রীরা তো টিভিতে অভ্যস্ত। তাদের কাছে এটা কী আর ম্যাজিকের কাজ করবে! করল।

তখন যার পারিবারিক অনুষ্ঠান ছিল তিনি বললেন, ‘তোমরা যখন এত করে বলছো...’

যার নির্বাচনী এলাকায় না গেলেই নয় এ রকম একটা মিটিং ছিল তিনি বললেন, ‘বাচ্চা মানুষরা যখন এসেছ...’

সত্যি বললে একটু মুশকিলই হলো। বিটিভি সূত্রে সবাই আমাদের প্রতি এমন সদয় হয়ে গেলেন যে উল্টো উভয় সংকটে। সেটা কাটিয়ে পছন্দের মন্ত্রীকে আনা হলো অনুষ্ঠানে।

তিনি এলেন। বক্তৃতা শুরু করলেন। শ্রোতারা স্বাভাবিকভাবেই সামনে বসে কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় বক্তৃতার একটা লাইন বলেন সোজা তাদের দিকে তাকিয়ে, পরের লাইনের সময় তার চোখ বাইরের দিকে। তাকে অনুসরণ করতে গিয়ে দর্শকসারিও একবার সামনে তাকায় তো আরেকবার বাইরে। পুরো একটা ঘাড়ের ব্যায়ামের মতো অবস্থা। রহস্যভেদে একটু সময় লাগল। টিভি ক্যামেরাটা পাশের দিকের দরজার কাছে। তাতে ফ্রেম যেন ভালো আসে তাই চেহারা বারবার সেদিকে ঘোরাচ্ছেন। টিভির আটটার সংবাদটা দেখা হয়নি, তাই ছবিটা কেমন এসেছিল জানি না, তবে এটা জেনেছিলাম টিভি ক্যামেরা দিয়ে মন্ত্রীদের জয় করা চকলেট দিয়ে বাচ্চাদের জয় করার মতোই ব্যাপার।

কান্ড হলো আরও। আমাদের একটা স্যুভেনিরের মোড়ক উন্মোচনের কথা। মন্ত্রী মহোদয় মোড়কটা কাঁচি দিয়ে কাটবেন। কাটলেনও। কিন্তু কাটার সময় বইটার বদলে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ছিলেন বলে মোড়কের সঙ্গে সঙ্গে প্রথম পৃষ্ঠাও কেটে ফেললেন। সেই পৃষ্ঠা আবার পাশে রাখা স্ট্যান্ড ফ্যানের বাতাসের চাপে টুকরো টুকরো হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে গেল। টুকরো কাগজের হাত থেকে চোখ বাঁচাতে কাউকে কাউকে মুখ ঢাকতে হলো।

এটা নিশ্চয়ই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। মন্ত্রীমাত্রই এমন ক্যামেরামুখী নন। যেমন সব মন্ত্রীপত্নী নিশ্চয়ই রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর মতো ক্ষমতার চর্চাকারী নন। মন্ত্রী বলছেন, মাত্র কয়েক মাস বিয়ে হয়েছে বলে তিনি এখনো তার রাজনৈতিক চরিত্রকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। কিন্তু আমরা তো জানি, স্ত্রীরা তাদের স্বামীর রাজনৈতিক চরিত্র খুব সহজেই বুঝে যান।

এক নেতা ভোটে দাঁড়িয়ে দুই ভোট পেয়েছেন। খুব লজ্জার কথা। মুখ গোমড়া করে বাসায় ফিরতেই স্ত্রী ঝাঁপিয়ে পড়লেন তার ওপর, ‘বলো তুমি কোন মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছো?’

নেতার এমনিতেই মন খারাপ। কোথায় সহানুভূতি পাবেন, তার বদলে এই আক্রমণ।

বললেন, ‘এসব কী বলছো তুমি? আমার আবার সম্পর্ক থাকবে কেন?’

‘না থাকলে তুমি আরেকটা ভোট পেলে কী করে! আমি ভোট দিলাম, এমন আরেকজন অন্ধ ছাড়া কে তোমায় ভোট দেবে।’

গল্পের স্ত্রী স্বামীকে কত ভালো চিনতেন। আমাদের মন্ত্রীপত্নী চিনতেই পারলেন না। না চেনার কারণে কি না বিপদে পড়তে হলো বেচারা মন্ত্রীকে।

এমনিতে নুরুল ইসলাম সুজন পুরনো রাজনীতিক। হঠাৎ উড়ে এসে বসা কেউ নন বলে এমন ঘটনা একদমই অপ্রত্যাশিত। কিন্তু নতুন বিয়ে, নতুন শ্যালিকা এরা পুরনো মানুষকেও পুরোপুরি পথে নামানোর ব্যবস্থা করে দেয়। এতটাই যে, তিনি প্রথম দিন বলে দিলেন, এরা আমার আত্মীয় নন। তার মতো একজন মানুষ বুঝবেন না, এই যুগে এই অস্বীকারকে বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব। মাত্র এক দিনের মধ্যেই সত্য বেরোল। মন্ত্রী জানার আগেই পুরো দেশ জেনে গেল, এরা তার শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কের আত্মীয়। অতএব সব মানতে হলো। বিব্রত হতে হলো। ঘরের কথা পরকে জানানোর মতো করে নিজের স্ত্রীর অর্বাচীনতা নিয়ে টিভি ক্যামেরার সামনে দুটো অস্বস্তিকর কথা বলতে হলো।

স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিরোধে এক নেতা কর্মীকে কয়েক ঘা লাগিয়ে দিলেন। সঙ্গে ছিল তার ছেলে। সে-ও কিছু হম্বিতম্বি করেছিল, কিছু গালাগালও সম্ভবত। দেখা গেল, সেটাই বড় ইস্যু হয়ে গেছে প্রতিপক্ষদের কাছে। যত প্রতিবাদ সভা হলো, তাতে নেতার মারের চেয়ে ছেলের গালিই বড় হয়ে দেখা দিল। কেন? একবার মনে হয়েছিল, খুব সম্ভব নেতা ক্ষমতাবান বলে কেউ সাহস করে তার বিরুদ্ধে কিছু বলছে না। ছেলেটা ছোট বলে...। পরে বুঝলাম, নেতার প্রতি ভীতি নয়। কারণ অন্য। নেতা বা ক্ষমতাধর যারা মানুষ ধরেই নেয় তারা কিছু ক্ষমতা দেখাবে। এই অধিকারটুকু তারাই দিয়েছে। ছেলে বা স্ত্রীকে তো দেয়নি। এমপির চেয়ে আজও তাই এমপিপুত্রের বা আত্মীয়ের অপরাধে ক্ষোভের প্রকাশ হয় অনেক বেশি। আমাদের নেতাদের জীবনচরিত বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, বেশির ভাগ নেতাই জনপ্রিয়তা হারান আত্মীয়স্বজনের কুকীর্তিতে। যেকোনো এলাকার নেতা, এমপিদের সম্পর্কে খোঁজ নিন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শুনবেন, ‘উনি খারাপ না কিন্তু তার আত্মীয়স্বজনরা...’। ভাই বাহিনী, ভাতিজা কাহিনী এগুলো প্রায় এলাকার সাধারণ ছবি।

তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র একটা রোগ। এই রোগটা দিনে দিনে বেড়ে এখন দুরারোগ্য। মজার ব্যাপার হলো, যে উপজেলা আর পৌরসভাকে আমরা মনে করি, পরবর্তী নেতৃত্ব তৈরির পথসেই জায়গাগুলোতে পড়ে পরিবারতান্ত্রিকতার ছোবল। নিজে সাংসদ হওয়ার পর লক্ষ্য থাকে এই দুই জায়গা দখল। একবার চেনা এক নেতাকে ঘরোয়া আড্ডায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই চর্চায় দলের গ-ি ছোট হয়ে যায় কি না!

তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘এতে যে বর্তমান-ভবিষ্যৎ দুটোই ঠিক থাকে হে।’

‘কী রকম?’

‘ধরো এই দুটো জায়গায় নিজের আত্মীয়স্বজন থাকা মানে পরের সংসদ নির্বাচনে আর কেউ সেভাবে মনোনয়নের দাবি করতে পারবে না। তোমার জায়গা অক্ষুণœ থাকল।’

‘আর ভবিষ্যৎ কীভাবে?’

‘তুমি মরলেও তোমার পরিবারের কেউ একজন তোমার জায়গা নিল। তোমার অপকীর্তি বের হলো না। মৃত্যুর পরও মহান হয়ে রইলে।’

অনেক বছর ধরে এক দল ক্ষমতায়। বেশির ভাগ এলাকায় এক মানুষ। সেভাবে নির্বাচন হয় না বলে নিজেকে নিয়ে খুব ভাবতে হয় না। তারা এখন ভাবেন আত্মীয়দের নিয়ে। সরকারি পদ কাছের আত্মীয়স্বজনকে দিয়ে দখলের পর দূরের? দূরের আত্মীয়রাও বাদ পড়ছেন না। তারা পাচ্ছেন দলীয় কমিটির পদ। পুরো একটা পারিবারিক মই তৈরি হচ্ছে; একজনের পর আরেকজন। তারপর আরেকজন।

এই মইয়ে উঠতে উঠতে সবাই ভুলে যাচ্ছেন এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখতে নেই, এক গাছে সব বন্ধুকে নিয়ে চড়তে নেই। কারণ, ঝুড়িটা ভাঙলে, গাছটা ভূপাতিত হলে সবাই শেষ। সব শেষ।

আমাদের আলোচ্য মন্ত্রীপত্নী অবশ্য কোনো পদ বা কমিটিতে নেই। কে জানে, ক্ষমতা চর্চার এই ক্ষমতার কারণে হয়তো পুরস্কার পেয়ে গেলেন। তা হয়ে গেলে সুবিধাও আছে কিছু। তখন আর তার কোনো কাজে মন্ত্রীকে বিব্রত হতে হবে না। তিনি যা করবেন নিজের পরিচয়েই...

আবার এমনও তো করা যেতে পারে, কমিটি-টমিটিতে ঢোকানোর ঝামেলায় না গিয়ে, মন্ত্রীপত্নী-সাংসদপুত্র এদের জন্য মিনিস্টার লেডি, যুবকরাজ এসব পদ তৈরি হয়ে গেল।

তাদের অনেক পথ। অনেক উপায়। আমরাই শুধু নিরুপায়।

লেখক সাংবাদিক ও লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত