সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এত আইন কেন? স্বাধীন মতপ্রকাশের বিরুদ্ধে এত আইন কেন? এমন প্রশ্ন রেখে দেশের মুদ্রিত সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের নেতারা বলেছেন, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের পাশাপাশি সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হরণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করে তোলার জন্য অতীতেও বিভিন্ন আইন কার্যকর ছিল। এর সঙ্গে আগে থেকেই ক্রিয়াশীল তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ডেটা সুরক্ষা আইন, গণমাধ্যমকর্মী আইন, ওটিটি নীতিমালার মতো নানা আইন ও নীতিমালা সংযুক্ত হয়েছে কিংবা হতে যাচ্ছে।
গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস : ডিজিটাল নজরদারিতে সাংবাদিকতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় নেতারা এসব কথা বলেন।
গত ৩ মে পালিত হয় বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘ডিজিটাল নজরদারিতে সাংবাদিকতা’। ঈদের ছুটি থাকায় দিবসটি উপলক্ষে গতকাল আলোচনা সভা করে সম্পাদক পরিষদ।
পরিষদের নেতারা বলছেন, এসব আইন ও নীতিমালা নামে ভিন্ন হলেও এগুলোর যে পরিধি, তাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব আইনের মাধ্যমে একটি ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হরণ করার পাশাপাশি এসব আইন খোদ সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এভাবে গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশ হবে না। গণতন্ত্রকে ব্যাহত করার এ প্রক্রিয়াটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। এ অবস্থায় এই ‘অবরুদ্ধ’ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংঘবদ্ধভাবে একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই শুরুর আহ্বান জানান তারা।
সম্পাদক পরিষদের নেতারা আরও বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ডিজিটাল অপরাধ নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে এ আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ হচ্ছে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর। মুক্ত সাংবাদিকতা একটি দেশের মেরুদণ্ড। অথচ আইনের মাধ্যমে সেটি দমিয়ে রাখতে সংবাদকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকতা পেশা বিকশিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ আইনের অন্তত ২০ জায়গায় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যার ১৪টিই জামিন অযোগ্য। একজন সাংবাদিক হিসেবে কী অপরাধে অপরাধী যে আপনাকে জামিনও দেওয়া যাবে না? গত চার বছর সুস্পষ্টভাবে এ আইনের প্রয়োগ দেখা গেছে। এর প্রয়োগ হচ্ছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতা ও রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে। আমরা মনে করি, আইনটি আমাদের সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশ ও পেশাগত বিকাশের ক্ষেত্রে সাংঘাতিক অন্তরায়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বহুবার বলেছি, এ আইনে একটি ধারা যোগ করলেই হয় যে আইনটি সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে না। আমাদের এ দাবি মানা হয়নি। এখন এ আইনের সুষ্ঠু সংশোধন না হলে এটি বাতিলের দাবির দিকে যেতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এত আইন কেন? পুরনো-নতুন আইনের নাম ভিন্ন হলেও প্রয়োগের যে পরিধি তা ঘুরেফিরে মতপ্রকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এগুলো সৃষ্টিশীল কাজের প্রতিবন্ধক। আমরা কী করি, যার জন্য এত আইন দিয়ে আমাদের হাত-পা বেঁধে দিতে হবে? আমার একটি সহজ বক্তব্য, গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশ হবে না।’
বণিক বার্তা সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ, সম্পাদক পরিষদের সহসভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবির, সম্পাদক পরিষদের সহসভাপতি ও ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, সম্পাদক পরিষদের কোষাধ্যক্ষ ও মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, আজকের পত্রিকা সম্পাদক গোলাম রহমান, বিএফইউজে একাংশের সভাপতি ওমর ফারুক, বিএফইউজে একাংশের সভাপতি এম আবদুল্লাহ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশের সভাপতি কাদের গণি চৌধুরী, একাংশের সাধারণ সস্পাদক আকতার হোসেন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠু প্রমুখ।
