দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা করোনার প্রকোপে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়েছে। দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি প্রকট হয়েছে। করোনা মহামারীকালে দেশের আর্থিক খাত কিছুটা চাপে পড়লেও সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে অর্থনীতির চাকা আবার সচল হতে শুরু করে। এরই মধ্যে চলতি বছরের শুরুর দিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ব নতুন করে মহামন্দার কবলে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশে দুই বছর ধরে ভোগ্যপণ্যসহ জিনিসপত্রের দাম অল্প অল্প করে বাড়লেও গত তিন মাসে তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর মধ্যে বড় ধাক্কা এসেছে ভোজ্য তেল সয়াবিনের ওপর। ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মতো বেড়েছে চাল, ডাল, আটা, ময়দা, দুধসহ প্রায় প্রতিটি ভোগ্যপণ্যের দাম। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে শুধু আমদানিনির্ভরই নয়, দেশে উৎপাদিত পণ্যের দামও বাড়ছে। সর্বশেষ গত রবিবার এক লাফে ডলারের দাম ৮০ পয়সা বাড়ায় সবার মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার ব্যয় সংকোচন নীতির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
করোনার কারণে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা ও খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করে আসছে গত বছরের শুরু থেকে। এখন নতুন করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘ রূপ নেওয়ায় মন্দা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা মূল্যস্ফীতিতে হিমশিম খাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার মতো যেসব দেশ বিদেশি ঋণনির্ভর বড় বড় প্রকল্প নিয়েছে সেসব দেশে আতঙ্ক বাড়ছে। ছোট দেশ ছাড়াও বড় দেশগুলোও বৈশ্বিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির চাপে ব্যয় সংকোচন নীতিতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দু-তিন দিনের মধ্যে জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কীভাবে ব্যয় সংকোচন করা যায় সেজন্য তাদের একটা কৌশল ঠিক করতে বলা হয়েছে। এরপর এ ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য মতে, সরকার ব্যয় কমানো এবং সম্পদ সংরক্ষণের খাতগুলো দেখছে। আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কারণ এ দুটি খাত দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ব্যয় কমানোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে আমদানিনির্ভর বড় এবং কম প্রয়োজনীয় প্রকল্পের কাজ আপাতত বন্ধ রাখা। এ ছাড়া আমদানিনির্ভর প্রয়োজনীয় প্রকল্পের কাজের গতি কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ব্যয় কমাতে সরকারি খরচে বিদেশ সফরও আপাতত বন্ধ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গত দুদিন ধরেই ব্যয় সংকোচন নীতি নিয়ে বৈঠক হচ্ছে। সেই বৈঠকে আসছে অর্থবছরের বাজেটে ব্যয় কমানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন বা পে-স্কেল ঘোষণা না করা, বিলাসবহুল পণ্যের আমদানির গতি কমাতে কৌশল নির্ধারণ, বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবাহ ঠিক রাখতে করণীয় নির্ধারণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। শুধু সরকারি পর্যায়েই নয়, বেসরকারি পর্যায়েও ব্যয় কমানোর কৌশল ঠিক করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে অতিমাত্রায় বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা কমিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গত মঙ্গলবার বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ও গতকাল বিচারকদের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা এসেছে।
এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এমপি ও বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদেরও মিতব্যয়ী ও সাশ্রয়ী হওয়া এবং জনগণের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন।
সরকারের এ ব্যয় সংকোচন নীতির উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, আরও আগে এটা করা গেলে বেশি ভালো হতো। যেকোনোভাবেই ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, গত দুদিনে ডলারের যে দাম বেড়েছে তা খুব সমস্যার নয়। তবে ডলার ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেলে বিপদ আসতে পারে। পাশাপাশি আগামী বাজেটে কৃষি, খাদ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত পণ্যে ভর্তুকি বাড়ানোর সুপারিশ করেন।
অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। উন্নয়ন ব্যয়ে সাশ্রয়ী হতে হবে। রাজস্ব আদায়ের চিরাচরিত দুর্বলতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এমনিতেই কভিডে বৈদেশিক ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্পের কারণে সরকারের সুদ পরিশোধের দায় বেড়েছে, এটা আরও বাড়বে। রাজস্ব আয়ের একটা বড় ও ক্রমবর্ধমান অংশ চলে যাচ্ছে দেশি ও বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি অবশ্যই দরকার।’ এ অর্থনীতিবিদ রাজস্ব সংগ্রহে জোরদার পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্ব পণ্যবাজারে কিছু পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য হলো, এর বেশির ভাগ পণ্যই বাংলাদেশের জন্য খুব প্রয়োজনীয় আমদানি পণ্য। বিশ্ববাজারে জ¦ালানি তেলের দামে এর প্রভাব পড়েছে। দেশের বাজার যেভাবে অস্থির হয়ে পড়েছে, সরকার এটি সামাল দিতে পারছে না। এর মধ্যে রাসায়নিক সার ও গম বেশি দামে আমদানি করা যাবে কি না তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।’
অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, ‘সরকারের ব্যয় কমানোর এ ঘোষণা অবশ্যই ইতিবাচক। আর ডলারের দাম এখন যা বেড়েছে তাতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কেউ যেন এ সুযোগে ডলার মজুদ না করে সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি কারণ হলো, এভাবে দাম ঊর্ধ্বমুখী হলে রেমিট্যান্স আসার প্রবাহ কমবে। বিদেশ থেকে টাকা পাঠাতে তারা ডলারের বাজারের দিকে নজর রাখবে। আর ডলারের বাজারে কোনো সিন্ডিকেট যেন গেড়ে না বসে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শুধু সরকারি কর্মকর্তাদেরই নয়, বিদেশ সফরের লাগাম টেনে ধরতে হবে সব ক্ষেত্রে। অনেকেই দু-এক মাস পরপরই ঘুরতে যান। এখানে নিয়ম করে দিতে হবে বছরে কতবার বিদেশ ভ্রমণ করা যাবে। বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত বাজেটেও ব্যয় সংকোচনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা এবং অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি বন্ধ করতে হবে। খাদ্য আমদানির বিকল্প নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করতে হবে।’
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলমান প্রকল্পগুলো সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা করা হচ্ছে। অগ্রাধিকার কয়েকটি প্রকল্প ছাড়া বাকি কাজ বন্ধ রাখা হচ্ছে। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, ব্যয় কমাতে এরই মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। প্রকল্পগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানান, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ সাশ্রয় করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্য আমদানিতে এলসি মার্জিন আরোপ করা হয়েছে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ। অতি প্রয়োজনীয় খাত ছাড়া রিজার্ভ থেকে ডলারের জোগান বন্ধ করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত, আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করা হয়েছে। বেসরকারি খাতেও বৈদেশিক মুদ্রাছাড় কম করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ পর্যাপ্ত ডলার না থাকায় ব্যাংকগুলো ব্যক্তি খাতে যেমন ডলার দিতে পারছে না, তেমনি নতুন এলসি খোলাও কমিয়ে দিয়েছে। আগের এলসির দেনাও শোধ করছে চড়া দামে ডলার কিনে।
অর্থ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন বাজেটে খাদ্যের ওপর ভর্তুকি বাড়ছে। খাদ্যে ভর্তুকি ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের হিসাবে চলতি অর্থবছরে খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৩২ লাখ ৫৬ হাজার টন। সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগ বলছে, প্রতি বছরই ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, কৃষি ও জ্বালানি খাতে বর্ধিত হারে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ ছিল ৪০ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে ১২ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা বাড়ানো হয়।
অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী বাজেটের আকার হবে ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ এ তিন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, যা বাজেটের ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ তিন খাতে ব্যয় ধরা আছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বাজেটের আকার ও বিভিন্ন সূচক নিয়ে বাজেট ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ কমিটির বৈঠক হয়ে গেছে। বাজেটে আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭.৫ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের ৭.২ শতাংশের থেকে কিছুটা বেশি। আসছে বছরের বাজেটের আকার বরাবরের মতো হারে বৃদ্ধি না পেলেও ঘাটতি থাকছে আড়াই লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫.৫ শতাংশ।
সরকারের ব্যয় কমানোর নীতির সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘আসন্ন অর্থবছরের বাজেটের তথ্যগুলো এখনো পুরোপুরি পাইনি। দেখা যাচ্ছে পুরো বাজেটের আকার চলতি বছরের তুলনায় ১২ শতাংশের বেশি বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও সে তুলনায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোর (এডিপি) আকার কম বাড়বে বলে মনে হচ্ছে (বাজেট ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ কমিটির বৈঠকের তথ্য অনুসারে ৯ শতাংশের কম বৃদ্ধি হবে)। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম তো বাড়ছে। এ বাস্তবতায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার আরও বড় হওয়া দরকার বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এটা মানতে হবে, এ ক্ষেত্রে কিছুটা সংকোচনের পথে সরকারকে হাঁটতে হচ্ছে। এছাড়া বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কাটছাঁট করার উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে এ কথা বলা যায় যে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির তুলনামূলক কম প্রবৃদ্ধি নিয়ে আদতে খুব বেশি ভাবিত হওয়ার কিছু নেই। আর এটাও তো সবারই জানা, আমাদের উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোর ব্যয় যে প্রায়ই বাস্তবায়নে সময় বেশি লাগার কারণে বেড়ে যাচ্ছে। তাই তা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সরকার ব্যাপক সচেষ্ট রয়েছে। এ বাস্তবতায় উন্নয়ন বরাদ্দের কিছুটা লাগাম টেনে ধরা দরকার। এবারের এডিপিতে সেটাই খানিকটা ঘটেছে।’
