ইসলামি পরিভাষায় দান বা সদকা বলতে বোঝানো হয় ‘বিনিময়ে না চেয়ে শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়তে কাউকে কিছু দেওয়া।’ শরিয়তে দান দুই ভাগে বিভক্ত। একটি এমন দান, যা বিশেষ কিছু শর্তে মুসলিম ব্যক্তির বিশেষ কিছু সম্পদে ফরজ হয়। যেমন জাকাত। অন্যটি মুসলিমকে তা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু তার ওপর অপরিহার্য নয়। এমন দানই হলো দান-সদকা। ইসলামে জাকাত ও ওশরের পরিমাণ নির্ধারিত কিন্তু সদকার ব্যাপারে কোনো সীমা-বাঁধা নেই। উদ্দেশ্য দানের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে এর মাধ্যমে সব অভাবী যেন সুবিধা পায়, আর দাতা অফুরন্ত কল্যাণের অধিকারী হয়।
সব ভালো কাজের পুরস্কার সমান নয়, হওয়ার কথাও নয়। আর দান করতে অনেক বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয় বিধায় সাধারণ ভালো কাজের চেয়ে দানের পুরস্কার অনেক গুণ বেশি। আবার জীবন মানুষের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান বিধায় কেউ শহীদ হলে ঋণ ছাড়া অন্যসব গোনাহ মাফ করে জান্নাতে প্রবেশের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সুতরাং যে কাজে যত বেশি ত্যাগ স্বীকার সে কাজে তত পুরস্কার, কাজের পরিমাণ যাই হোক না কেন। দানের পূর্বশর্ত হলো মানুষের প্রতি সহনশীল হওয়া।
উত্তম দানের শর্তাবলি : দান হতে হবে নিজের প্রিয় জিনিসের। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের প্রিয় জিনিসের দান খরচ করা ছাড়া কখনোই তোমরা প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারবে না।’ সুরা আলে ইমরান : ৯২
কোরআনে কারিমের অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা ব্যয় করো উত্তম বস্তু, তোমরা যা অর্জন করেছো এবং আমি জমিন থেকে তোমাদের জন্য যা উৎপন্ন করেছি তা থেকে এবং নিকৃষ্ট বস্তুর ইচ্ছা করো না যে, তা থেকে তোমরা ব্যয় করবে। অথচ চোখ বন্ধ করা ছাড়া তোমরা নিজেরাও তা গ্রহণ করো না। আর নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, সপ্রশংসিত।’ সুরা বাকারা : ২৬৭
ইসলামের শিক্ষা হলো দান হতে হবে শর্তহীন এবং শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে। কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে, ‘আর যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও নিজদের সুদৃঢ় রাখার লক্ষ্যে সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা উঁচু ভূমিতে অবস্থিত বাগানের মতো, যাতে পড়েছে প্রবল বৃষ্টি। ফলে তা দ্বিগুণ ফল-ফলাদি উৎপন্ন করেছে। আর যদি তাতে প্রবল বৃষ্টি নাও পড়ে, তবে হালকা বৃষ্টিই যথেষ্ট। আর আল্লাহ তোমরা যা আমল করো, সে ব্যাপারে সম্যকদ্রষ্টা।’ সুরা বাকারা : ২৬৫
বর্ণিত আয়াতে প্রবল বৃষ্টিপাত বলতে এমন দান-খয়রাতকে বোঝানো হয়েছে, যার পেছনে থাকে চরম কল্যাণ আকাক্সক্ষা ও পূর্ণ সদিচ্ছা। আর হালকা বৃষ্টিপাত বলতে কল্যাণ আকাক্সক্ষার তীব্রতাবিহীন দান-খয়রাতকে বোঝানো হয়েছে। ইসলাম মতে, দান হতে হবে শয়তানের প্ররোচনামুক্ত ভেজালহীন। ‘শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় (দান করার ক্ষেত্রে) এবং অশ্লীল কাজের আদেশ করে। আর আল্লাহ তোমাদের তার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ সুরা বাকারা : ২৬৮
দান করতে হবে দানের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দানযোগ্য ব্যক্তিকে। এখানে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি কারা। প্রথম অগ্রাধিকারযোগ্য ব্যক্তি একবারেই নিঃস্ব, উপার্জন ক্ষমতাহীন, যার সাহায্য করার মতো আর কেউ নেই এমন ব্যক্তি। আর অগ্রাধিকারযোগ্য ব্যক্তি হলো উপার্জনের শক্তি-সামর্থ্য সবই আছে কিন্তু দ্বীন বা মানবতার জন্য কাজ করতে গিয়ে উপার্জনের জন্য সময় দিতে পারে না।
যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মানবিক শিক্ষা-চিকিৎসার খরচ চালাতে অসমর্থ তারাও অগ্রাধিকারযোগ্য। একসময় সামর্থ্যবান ছিল কিন্তু সংগত কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কিংবা সফরকালীন সাময়িক সময়ের জন্য টাকা ফুরিয়ে গেছে এমন ব্যক্তিও দানের যোগ্য।
দান হতে হবে সময়োপযোগী ও মৃত্যুর আগে। কারণ মৃত্যুর সময় আসার পর কাউকেই এক রত্তি পরিমাণ অবকাশ দেওয়া হবে না। ‘আর আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করো, তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগে। কেননা তখন সে বলবে, হে আমার রব, যদি আপনি আমাকে আরও কিছুকাল পর্যন্ত অবকাশ দিতেন, তাহলে আমি দান-সদকা করতাম। আর সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ সুরা মুনাফিকুন : ১০
সর্বোত্তম দান কোনটি : প্রশ্ন হতে পারে, কোন কাজটি আল্লাহর কাছে সৎকাজ হিসেবে গণ্য। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসের পাশাপাশি সহিহ নিয়ত এবং আল্লাহ ও রাসুলের দেওয়া নিয়ম মেনে সর্বাত্মক চেষ্টায় রত যেকোনো পরিমাণ আল্লাহ ঘোষিত কাজকেই সৎকাজ বোঝায়। ইসলামে সৎকাজের পুরস্কার পেতে প্রয়োজনীয় শর্ত মেনে যেকোনো ব্যক্তি যখন এমনভাবে দান করে যে অন্য কেউ টের পায় না, তখন পরিমাণ যাই হোক না কেন, তা-ই সর্বোত্তম দান হিসেবে গণ্য হবে। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘আপনার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আপনি নিজে ত্যাগ করে দান করবেন, আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি করবেন, সদকা করবেন, আর এই সদকা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সদকা।’
জীবিত ব্যক্তি কী কী দান করতে পারে : জীবিতাবস্থায় ব্যক্তির দানকে আমরা চার ভাগে ভাগ করতে পারি। জ্ঞান দান, অর্থসম্পদ দান, উত্তম জীবনাদর্শ দান ও উত্তম বংশধারা বা সন্তানসন্ততি দান। প্রত্যেক জীবিত ব্যক্তি জীবিতাবস্থায় চাইলেই পৃথিবীবাসীকে চারটির চারটিই অথবা যেকোনো একটি দান করে ধন্য হতে পারে।
মৃত ব্যক্তি জীবিতকে কোনো কিছু দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। তবে তারা নিজেরা উত্তম প্রতিফল কিয়ামত পর্যন্ত পেতে থাকেন যদি মৃত্যুকালে উত্তম আদর্শ ও আদর্শবান সন্তান রেখে যান অথবা অর্থসম্পদ দান করে যান বা এমন জ্ঞানভাণ্ডার রেখে যান, যার ফল সুদূরপ্রসারী।
সর্বোত্তম মানবিক কাজ : সাদকায়ে জারিয়া আরবি শব্দ। সদকা শব্দের অর্থ দান করা এবং জারিয়া অর্থ প্রবহমান, সদাস্থায়ী প্রভৃতি। সাদকায়ে জারিয়া হলো এমন দান যার কার্যকারিতা কখনো শেষ হবে না এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ এই পৃথিবীতে যত দিন এর কার্যক্রম থাকবে, তত দিন পর্যন্ত কবরে শুয়ে শুয়ে সদকাকারী ব্যক্তি এর সওয়াব পেতে থাকবে। বিধায় প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সাদকায়ে জারিয়ার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা।
সাদকায়ে জারিয়া স্থায়ী ও অবিনিময়যোগ্য দান। এর অন্যতম উদ্দেশ্য সামাজিক ও সামষ্টিক পরোপকার। পরোপকার সাধারণত দুভাবে করা যায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো কিছু করলে বৃহত্তরভাবে পরোপকার করা যায়। যেমন : কেউ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করল আর কেউ শুধু একজন রোগীকে সেবা দিল। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালের মাধ্যমে এ রকম বহু রোগীর সেবা করা সম্ভব।