মুসলমানদের অতীত ছিল অত্যন্ত গৌরবময়। তারা এক সময় গোটা বিশ্ব শাসন করেছে। কিন্তু মুসলমানরা আজ বিশ্বজুড়ে চরম লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার শিকার। পদে পদে তারা নির্যাতিত, নিগৃহীত ও অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। কেন এই দুরবস্থা? এ প্রশ্নের উত্তরে মুসলিম চিন্তাবিদদের অনেকে নানা কারণ উল্লেখ করেছেন। তবে কবি-দার্শনিক আল্লামা ইকবাল একে দেখেছেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। তার মতে, মুসলিম জাতির অধঃপতনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো কোরআন থেকে দূরে সরে যাওয়া। এখন মুসলমানরা কোরআন তেলাওয়াত করলেও তা নিয়ে কোনো চিন্তা বা গবেষণা করে না। কোরআন বর্জিত এক কৃত্রিম, বস্তুবাদী ও অনুকরণশীল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা মুসলিম জাতি।
আল্লামা ইকবাল ছিলেন মুসলিম জাগরণের কবি। তার সাহিত্যজুড়ে কোরআনের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং মুসলিম উম্মাহকে কোরআনের দিকে ফিরিয়ে আনার আন্তরিক আহ্বান বারবার উচ্চারিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, কোরআনই মুসলমানের জীবনীশক্তি, কোরআনই আত্মপরিচয়ের ভিত্তি এবং কোরআনই সম্মান ও মর্যাদার উৎস। মুসলিম জাতির অতীত গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইকবাল ‘জওয়াবে শিকওয়া’ কাব্যগ্রন্থের ‘বাঙ্গে দারা’ কবিতায় লিখেছেন, ‘তারা সে যুগে সম্মানিত ছিল মুসলমান হয়ে, আর তোমরা অপদস্থ হয়েছ কোরআন ত্যাগ করে।’
এই পঙ্ক্তিতে ইকবাল মুসলিম ইতিহাসের গভীর বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, মুসলমানদের সম্মান ও প্রাধান্য কেবল তাদের সংখ্যা বা সামরিক শক্তির কারণে ছিল না। বরং তারা সম্মানিত হয়েছিল কোরআনের অনুসারী হওয়ার কারণে। তারা কোরআন নিয়ে চিন্তা করেছে, কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী নিজেদের গড়ে তুলেছে, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কোরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করেছে। ফলে তারা জ্ঞান, ন্যায়বিচারা ও মানবিকতার ক্ষেত্রে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছিল।
ইসলামের স্বর্ণযুগের দিকে তাকালে আমরা এর বাস্তব প্রমাণ দেখতে পাই। কোরআনের নির্দেশনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলমানরা জ্ঞানচর্চাকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তারা চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, ভূগোল ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছিল। তাদের গ্রন্থাগারগুলো ছিল মানবসভ্যতার সম্পদভাণ্ডার। এসব অর্জনের পেছনে ছিল কোরআনের সেই আহ্বান, যা মানুষকে চিন্তা করতে, গবেষণা করতে এবং সত্য অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করে।
কিন্তু যখন মুসলমানরা ধীরে ধীরে কোরআনের প্রকৃত শিক্ষা থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তখন তাদের পতনের সূচনা হলো। কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল, কিন্তু তার শিক্ষা জীবনে প্রতিফলিত হলো না। গবেষণা ও চিন্তাশীলতার পরিবর্তে স্থান নিল স্থবিরতা। ঐক্যের পরিবর্তে দেখা দিল বিভক্তি। ন্যায়বিচারের পরিবর্তে বিস্তার লাভ করল অবিচার। ফলে মুসলিম জাতি দুর্বল হয়ে পড়ল এবং অন্যদের আধিপত্যের শিকার হলো।
আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের প্রতি কোরআনের গভীরে প্রবেশ করার আহ্বান জানিয়ে ‘সিয়াসিয়াতে মাশরিক ও মাগরিব’ কাব্যগ্রন্থের ‘জরবে কালিম’ কবিতায় লিখেছেন, ‘কোরআনে ডুব দাও হে মুসলিম সম্প্রদায়, আল্লাহ তোমাকে চরিত্র ও কর্মের উৎকর্ষ দান করবেন।’
এখানে কোরআনে ডুব দেওয়ার অর্থ শুধু তেলাওয়াত করা নয়। বরং কোরআনের মর্মবাণী উপলব্ধি করা, তার শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করা।
আল্লামা ইকবাল সংগৃহীত