ধান উৎপাদনে একসময় স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চল। তীব্র পানি সংকটের কারণে ধান চাষ বাদ দিয়ে আপেল চাষে ঝোঁকেন ওই অঞ্চলের কৃষকরা। শুরুতে তারা লাভের মুখ দেখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে আপেল উৎপাদনও এখন হুমকির মুখে পড়েছে। রেহাই পাচ্ছে না জাফরান শিল্পও। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
হুমকির মুখে প্রকৃতি
ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর। এর উত্তরাঞ্চলের বারামুল্লা জেলার উপজেলা পাট্টান। খুব বেশি দিন আগের কথা নয় যখন এই উপজেলায় মাইলের পর মাইল ধানক্ষেত চোখে পড়ত। গ্রামবাসী সেখানে প্রচুর ধান ফলাত। ধান উৎপাদনে কাশ্মীরের পাট্টান উপজেলা ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই উপজেলারই এক গ্রামের নাম শিরপোরা। পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই গ্রামে ঢোকার সরু পথের দুধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে উইলো ও পপলারগাছ। শিরপোরা গ্রামে উইলো-পপলার ছাড়াও দেখা যায় প্রচুর আপেল বাগান। কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলে বেশির ভাগ মানুষের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অবস্থা মধ্যম মানের, খুব বেশি ভালো বা খুব বেশি খারাপ নয়। কিছু পরিবার জীবিকার জন্য সরকারি চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করলেও বেশির ভাগ পরিবার ফল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এখানকার কৃষকদের গড়ে আধা একর জমি রয়েছে। খুব বেশি খারাপ না থাকলেও বারামুল্লা উপজেলার বাসিন্দাদের কয়েক দশক ধরে অপ্রত্যাশিত নানা দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। এখানকার মনোমুগ্ধকর প্রকৃতির অস্তিত্ব নানা কারণে হুমকির মুখে। একদিকে ক্রমবর্ধমান নির্মাণশিল্পের আগ্রাসী রূপ আর অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন কাশ্মীরের কৃষকদের দিশেহারা করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভুগতে হচ্ছে এই অঞ্চলের আপেলচাষিদের। পাশাপাশি রেললাইন বসাতে শিরপোরা গ্রামে পাহাড় কাটার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে পরিবেশের ভারসাম্য, যা আবার বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ত্বরান্বিত করেছে।
বিলুপ্ত ধানক্ষেত
পঞ্চাশের দশকে ‘লাঙল যার, জমি তার’ নীতি জম্মু ও কাশ্মীরের কৃষকদের জীবনে মঙ্গল বয়ে আনে। এর মাধ্যমে তারা যে জমি চাষ করতেন তার মালিক হন। জমির মালিকানা পাওয়ার কারণে নব্বই দশক পর্যন্ত কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়, সচ্ছলতার মুখ দেখেন তারা। অবশ্য তাদের জীবনে সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলে পানিসংকট দেখা দেয়। পর্যাপ্ত পানির অভাবে চাষাবাদ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাষের জন্য পানি ২০০০ সালের দিকে আর অবশিষ্ট ছিল না। যে নদী কৃষকদের ঘর ও জমিতে পানি সরবরাহ করত, তা ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। ওই বছর পাট্টান উপজেলার প্রায় ৭০ শতাংশ গ্রামবাসী তাদের ধানক্ষেত আপেল বাগানে পরিণত করে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পরের বছর বাকিরাও তাদের জমিতে আপেলগাছ লাগান। কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলের একসময়ের দিগন্তবিস্তৃত ধানক্ষেত ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। ধানক্ষেতে আপেল চাষ করলেও কৃষকরা পানির অভাব থেকে রেহাই পাননি। একপর্যায়ে খাবার পানিরও সংকট দেখা দেয়। খাবার পানির সরবরাহ নির্বিঘœ রাখতে পাইপ বসানো হলেও সেচকাজের জন্য পানি পাওয়া দুরূহই থেকে যায়।
শিরপোরা গ্রামের হেডম্যান ৩৯ বছর বয়সী তারিক আহমেদ তান্ত্রে। তিনি বলেন, ‘নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর এখানে পানিসংকট তীব্র হয়। ধান চাষ করে লোকসান গুনতে হতো কৃষকদের। তাই শিরপোরা গ্রামের সবাই ধান চাষ বাদ দিয়ে আপেল চাষ করার সিদ্ধান্ত নেন। জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জীবনের অনেক কিছু পাল্টে দিয়েছে। তিন দশক আগেও আমরা ধানচাষি ছিলাম। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে চোখের নিমিষেই আমরা আপেলচাষি হয়ে গেলাম।’
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে জম্মু ও কাশ্মীরে ভূমি সংস্কার আইনপ্রণয়নের পরপরই সেখানে আপেল উৎপাদন শুরু হয়। সে সময় আপেল চাষ কেবল উত্তর কাশ্মীরের বারামুল্লা জেলার সোপর শহরে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৫২ সালের দিকে সেখানে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আপেল উৎপন্ন হতো। ষাটের দশকে কাশ্মীর উপত্যকা প্রতি বছর প্রায় ৪৮ হাজার টন আপেল উৎপাদন করে। এসব আপেল সাধারণত স্থানীয়রাই খেতেন, বাইরের রাজ্যে রপ্তানি হতো না। ১৯৬২ সালে কাশ্মীর রাজ্যের হর্টিকালচার বিভাগ ও শের-ই-কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচার, সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এসকেইউএএসটি) আপেলচাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া শুরু করে। একপর্যায়ে এসকেইউএএসটি আপেলের উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করলে এটির ফলন বেড়ে যায়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০-২১ সালে কাশ্মীরে ৩ লাখ ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে আপেল চাষ হয় আর এসব জমি থেকে ওই অর্থবছরে ১৯.৮৫ লাখ টন আপেল উৎপাদন হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
চলতি বছরের মে মাসে কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলে ভ্যাপসা গরমের মধ্যেও অনেক তরুণের গায়ে ফেরান (লম্বা এই পোশাক কাশ্মীরিরা সাধারণত শীতকালে পরেন) দেখা যায়। গরমকালেও ফেরান পরার কারণ জানতে চাইলে এক তরুণ জানান, আবহাওয়ার ওপর আস্থা নেই। যেকোনো মুহূর্তে শীত পড়তে পারে। তাই ফেরান পরে থাকতে হয়। শুকিয়ে যাওয়া নদীর দিকে তাকিয়ে তারিক আহমেদ বলেন, ‘আমাদের গ্রামে এই নদী ছিল একসময় পানির প্রধান উৎস। চোখের সামনে এটিকে ধীরে ধীরে মরতে দেখেছি। ধান চাষে প্রচুর পানির দরকার। আপেল চাষে ধানের মতো পানির প্রয়োজন পড়ে না। তাই ধান বাদ দিয়ে আপেল চাষের সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রামবাসী বুদ্ধির পরিচয় দেয়।’
গ্রামের অন্য সবার মতো তারিকও লাল সুস্বাদু আপেলের গাছ তার জমিতে লাগান। আগে চাষাবাদ কঠিন ছিল না। খুব বেশি কীটনাশকের প্রয়োজন পড়ত না। এখন অবশ্য অনেক কীটনাশক দিতে হয়। প্রতি বছর মার্চ মাসে কুঁড়ি দেখা দেওয়ার আগে আপেলগাছে কীটপতঙ্গ প্রতিরোধী তেল স্প্রে করেন তারিক। আর গ্রীষ্মকালে ছত্রাকের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কয়েকবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করেন তিনি। তিন দশক আগে শিরপোরার পার্শ্ববর্তী গ্রাম জানগাম, মামোসা ও নেহালপোরাতেও আপেল ফলানো হতো। নেহালপোরা গ্রামে তারিকের বাবার চার কানাল (জমির একক) জমি ছিল। সেখানে আপেল উৎপাদন করা হতো। ১৯৯৬ সালে আপেলের পাতা শুকিয়ে যেতে শুরু করলে তারিকের বাবা বাগানটি বিক্রি করে দেন।
শিরপোরায় ধানক্ষেত আপেল বাগানে পরিণত করার বছরখানেক পর গ্রামবাসীর মুখে হাসি ফোটে। আপেল উৎপাদনের প্রথম বছর তারিক স্থানীয় এক মসজিদে ৭০ বাক্স আপেল দান করেন। তার দোতলা বাড়ির পেছনে ৬.৪ একর জমিতে ভালো মানের পর্যাপ্ত পরিমাণে আপেল ফলতে থাকে। তবে ২০১৪ সালের দিকে হঠাৎ তারিকের বাগানে আপেল উৎপাদন কমতে শুরু করে। ফসল বাঁচাতে গ্রামবাসীসহ তিনিও কীটনাশক স্প্রে করেন। তারিক বলেন, ‘আমাদের জমির পরিমাণ কমছে। এক দশক আগেও প্রত্যেকের আরও অনেক জমি ছিল। জমি কমলেও আমাদের পরিবার বড় হচ্ছে। আপেলগাছ থেকে কত উপার্জন করছি তার চেয়ে এটিকে টিকিয়ে রাখাই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন ফসল উৎপাদন অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে।’ তারিকের সঙ্গে একমত পোষণ করেন গ্রামের ৮৫ বছর বয়সী বাসিন্দা গুলাম আহমেদ তান্ত্রে। তারিক ও গুলাম বাগানের ঘন পাতার এক গাছ দেখিয়ে বলেন, ‘এই গাছ থেকে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বাক্স আপেল পাওয়া যায় কিন্তু গত সপ্তাহের শিলাবৃষ্টি এটির ৯০ শতাংশ আপেল নষ্ট করে দেয়।’ আরেক আপেলচাষি মোহাম্মদ রফিক জানান, গত বছর বিশেষজ্ঞের
কথামতো আপেল বাগানে কীটনাশক স্প্রে করেন তিনি। এ বছর কোনো গাছে আপেল হয়নি। গাছের পাতাও শুকিয়ে গেছে।
আপেল উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে তারিক জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করলেও রফিক অবশ্য তা মনে করেন না। তার মতে, বাজারের ভেজাল সার ও কীটনাশকের কারণে আপেল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রফিক বলেন, ‘বাজারে গেলে অনেক ধরনের কীটনাশক পাওয়া যায়। কোনটি আসল আর কোনটি নকল, তা লোকসানের আগ পর্যন্ত কেউ জানেন না।’ বয়োজ্যেষ্ঠ গুলাম অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, ‘জীবনে ৮০টির বেশি বসন্ত দেখেছি। এখনকার মতো আবহাওয়া পরিবর্তনের ঘটনা আগে কখনো দেখিনি। আজ প্রচণ্ড গরম তো কাল শিলাবৃষ্টি। পরের দিন ঝাড়ো হাওয়া তো তার পরের দিন রোদ। এরপর দেখা গেল তীব্র শীত। আবহাওয়ার এমন মতিগতি একজন কৃষক কীভাবে বুঝবেন? আমরা কী করব, কিছুই জানি না। কেবল আল্লাহ আমাদের এই দশা থেকে রক্ষা করতে পারেন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলে আপেল উৎপাদন যদি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে, তাহলে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটির অর্থনীতি বিপন্ন হয়ে পড়বে। জম্মু ও কাশ্মীরে এরই মধ্যে খাদ্যঘাটতি দেখা দিয়েছে। আপেল উৎপাদনে সংকট চলতে থাকলে এই শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে। ভারতে মোট আপেল উৎপাদনের ৭৮ শতাংশ আসে কাশ্মীর থেকে। বছরে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টন আপেল এখানে উৎপাদন হয়। আপেলশিল্প কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত। এই খাতে ৩৫ লাখ মানুষ কাজ করে।
খাদ্যঘাটতি
২০১৩-১৪ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে ৯.৯ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়, যা ছিল চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, খাদ্যঘাটতি মেটাতে জম্মু ও কাশ্মীরকে প্রায় ৭.৫১ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে। ভারত সরকার মনে করে, ভৌগোলিক ও জলবায়ু পরিস্থিতি কাশ্মীরের খাদ্যঘাটতির প্রধান কারণ। এ ছাড়া কৃষিজমি আপেল উৎপাদনসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহারের কারণেও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটিতে খাদ্যঘাটতি দেখা দেয়। ২০০৮ সালে ‘উপত্যকায় ক্ষুধা’ শিরোনামের এক গবেষণাপত্রে বলা হয়, জম্মু ও কাশ্মীরে খাদ্যঘাটতি খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। নব্বই দশকের শুরুতেও ওই অঞ্চল উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন করত। ওই দশকের মাঝামাঝি সময়ে খাদ্যঘাটতি দেখা দেয়। ২০০০-০১ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে খাদ্যঘাটতি ৩৫ শতাংশ ছিল, যা পরে আরও বাড়ে। শিরপোরা গ্রামের লোকজন খাদ্যঘাটতির মতো বড় ইস্যু নিয়ে চিন্তিত নন। স্থানীয় খাবারের দোকান ও বাজার থেকে তারা রেশন পেয়ে থাকেন। তবে আপেল উৎপাদনে ভাটা পড়া তাদের ভাবাচ্ছে। গুলাম আহমেদ বলেন, ‘আপেল ফলাতে না পারলে আমাদের জমি অনুর্বর হয়ে পড়বে।’
কেবল কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলেই নয়, একই পরিস্থিতি দেখা গেছে এর দক্ষিণাঞ্চলেও। আপেল চাষ করে তিন বছর ধরে লোকসান গুনছেন দক্ষিণ কাশ্মীরের শোপিয়ান জেলার হীরাপোরা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল হামিদ গণি। তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের চেয়ে তুষারপাত আগে হওয়ায় এখন অনেক লোকসান হচ্ছে। এক বাক্স আপেল সাধারণত ১ হাজার থেকে ১২০০ রুপিতে বিক্রি করি কিন্তু তুষারপাতের কারণে ফসল ভালো না হওয়ায় সেসব ৪০০-৫০০ রুপিতে বিক্রি করতে হচ্ছে।’ ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলে তিন বছর ধরে আগে তুষারপাত হচ্ছে। গত বছরের অক্টোবরে অপ্রত্যাশিত তুষারপাতে আপেল বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রায় ৪০ শতাংশ আপেল সে সময় নষ্ট হয়ে যায়। আবহাওয়ার এমন বৈরী অবস্থাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে কাশ্মীর কর্র্তৃপক্ষ। আবদুল হামিদ বলেন, ‘শিলাবৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়ার মতো অস্বাভাবিক আবহাওয়া কাশ্মীরে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১০-১৫ বছর আগেও এমন পরিস্থিতি ছিল না। আগে আপেল সংগ্রহের পর বরফ পড়ত, এখন আপেল সংগ্রহের সময়ই বরফ পড়তে শুরু করে। ফসলের যখন রোদ দরকার তখন বৃষ্টি পড়ে; আবার উল্টোটাও ঘটে।’ আবদুল হামিদের সঙ্গে একমত হন জম্মু ও কাশ্মীরের আবহাওয়া বিভাগের পরিচালক সোনাম লোটাস। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্বের অন্য অঞ্চলের মতো জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখেও দেখা যাচ্ছে। কৃষকরা যাতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারেন, এজন্য তাদের আবহাওয়ার সঠিক আপডেট দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
বিপন্ন জাফরানও
একদিকে যেমন বেশি তুষারপাত কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলের শোপিয়ান জেলার কৃষকদের দুর্ভোগে ফেলেছে, অন্যদিকে একই অঞ্চলের পামপোর এলাকার কৃষক কম বৃষ্টিপাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ এলাকায় উৎপন্ন হয় বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলা জাফরান। এটিও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না। গত দশকে পামপোর এলাকায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় জাফরান উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হন সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে জাফরান চাষ করা প্রায় তিন হাজার কৃষক। বিশ্বে হাতেগোনা যে কটি দেশ জাফরান উৎপাদন করে, তার মধ্যে ভারত অন্যতম। দেশটির বেশির ভাগ জাফরানই কাশ্মীরে উৎপাদন হয়। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে এ মসলার চাহিদা ব্যাপক। তবে গত কয়েক বছরে কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টি কম হওয়ায় ইরানসহ অন্যান্য দেশ থেকে ভারতকে জাফরান আমদানি করতে হচ্ছে। ভারতের বাজারে এখন যে জাফরান পাওয়া যাচ্ছে, তার মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ আসে কাশ্মীর থেকে। জাফরানচাষি আবুল মজিদ বলেন, ‘খরা আমাদের অনেক জাফরান বীজের ক্ষতি করেছে। সেচ ছাড়া জাফরান চাষ করা যায় না। আমিসহ কাশ্মীরের সব জাফরানচাষি এখন সেচ কূপ স্থাপনের চিন্তা করছি। এতে উৎপাদন বাড়তে পারে।’
কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান শাকিল রামশু বলেন, ‘ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মারাত্মক কারণ এখানে আমরা এশিয়ার ওয়াটার টাওয়ারের ওপর বসে আছি। জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখে হিমবাহ গলতে শুরু করেছে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি বিরূপ প্রভাবের একটি। প্রতি বছর একটি হিমবাহের ঘনত্ব প্রায় এক মিটার করে কমছে। জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া না হলে এ অঞ্চলে ভয়াবহ পানিসংকট দেখা দেবে। পাকিস্তানে ভাটিতে থাকা সিন্ধু নদীর পাড়ে বাস করা লোকজন এরই মধ্যে পানিসংকটে ভুগছে। আমাদের এখানেও যেকোনো সময় এ সংকট প্রবল আকারে দেখা দেবে। গবেষণা বলছে, ২০৫০ সালের পর আমরা পানির চাহিদা মেটাতে অনেকাংশে ব্যর্থ হব।’
