রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সরকারের মুনাফা বেড়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে যেখানে সরকারের নিট লোকসান ছিল ২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। সেখানে পরবর্তী নয় বছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থা মুনাফায় এসেছে। চলতি অর্থবছরের মে পর্যন্ত সরকারের মুনাফা ২ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। সরকারের ৪৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লোকসানে আছে ১১টি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।
২০১২-১৩ অর্থবছরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট লোকসান ছিল ২ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা। তবে এরপর বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ, নতুন বিনিয়োগ, সেবামূল্য বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উদ্যোগে রাষ্ট্রায়ত্ত কিছু সংস্থা লোকসান থেকে বেরিয়ে এসেছে। এ কারণেই সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত মুনাফা বেড়েছে। গত ৯ বছরে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ বিদ্যুতায়ন বোর্ড লোকসান থেকে মুনাফায় ফিরেছে।
অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের সরকারের সর্বোচ্চ মুনাফা এনে দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আর সরকারের সবচেয়ে বেশি লোকসানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সরকারের সর্বোচ্চ বিনিয়োগী খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ খাত।
তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, বিটিআরসির চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত নিট মুনাফা এনে দিয়েছে ২ হাজার ৬৫১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুনাফায় রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। একই সময়ে এ প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা ১ হাজার ২৬৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে নিট লোকসানের শীর্ষে থাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নিট লোকসান ১ হাজার ৮৯৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
জানা গেছে, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৭টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বছরের অধিকাংশ সময় অলস বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ১৩ হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা বিপিডিবিকে; যা আগের বছরের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি।
এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সরকারি কোষাগারে লভ্যাংশ জমার পরিমাণও কমেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কোষাগারে মোট মুনাফা জমা হয়েছিল ১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। কিন্তু পরের অর্থবছর ২০২০-২১ থেকেই তা কমতে শুরু করেছে। করোনার প্রভাবে এ বছর কোষাগারে জমা হয় ১ হাজার ২৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কোষাগারে লভ্যাংশ জমা দিয়েছে ১ হাজার ২৮৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
জানা গেছে, অব্যবস্থাপনা, মনিটরিংয়ের অভাব, অদক্ষ ও অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ, দুর্নীতি, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অভাবে সরকারি সংস্থাগুলোর লোকসানের পরিমাণ কমানো যাচ্ছে না। বছরের পর বছর এসব সংস্থার জন্য রাখতে হচ্ছে বিশেষ বরাদ্দ। ফলে প্রতিবছর বাড়ছে ভর্তুকির পরিমাণ, চাপ পড়ছে বার্ষিক বাজেটে। পাশাপাশি এসব সংস্থার কাছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ রয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা, যে ঋণের তথ্য মেলানোই এখন কঠিন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকার চলতি অর্থবছর মোট ১৬টি রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ১ হাজার ৪৩৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪৬০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দিতে হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ৫২২ কোটি টাকা। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনকে ৪৮০ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনকে ১৯৭ কোটি টাকা ভর্র্তুকি দিয়েছে সরকার।
এ ছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের ১৩১টি স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ৭৫১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩০ রাষ্ট্রীয় সংস্থার কাছ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ রয়েছে ৪৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত এসব বাণিজ্যিক ব্যাংকের সর্বোচ্চ ঋণ রয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে। এ সংস্থার কাছে ব্যাংকগুলো পায় ৮ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। এরপরই রয়েছে বিএডিসি ৮ হাজার ৩৫৬ কোটি ৬৬ লাখ, বিসিআইসি ৭ হাজার ৯৯৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, বাংলাদেশ চিনি খাদ্য শিল্প করপোরেশন ৭ হাজার ৪৭৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের মোট সম্পদের ওপর পরিচালন মুনাফার হার ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এটি ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ দশমিক ১৭ শতাংশে উপনীত হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পরিচালন রাজস্বের ওপর নিট মুনাফার হার ছিল ৬ দশমিক ২১ শতাংশ। এটি ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইক্যুইটির ওপর লভ্যাংশের হার ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে দশমিক ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সম্পদের টার্নওভার বা লেনদেন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের সম্পদের ব্যবহারের দক্ষতা দশমিক ৩১ শতাংশ, ২০১৯-২০ অর্থবছরে যা ছিল দশমিক ৩০ শতাংশ।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় বলা হয়, উৎপাদন ব্যয়ের নিরিখে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মূল্য সংযোজনের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৩৫ কোটি ৯ লাখ টাকা। এটি ২০২০-২১ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৬৯০ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
