স্বপ্নের পদ্মা সেতুর আশপাশের এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হবে আগামী সপ্তাহেই। এ নিয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। সেতু উদ্বোধনের দিন থেকেই পাঁচ স্তরের নিরাপত্তার আওতায় আনা হবে দুই পাড়ের পুরো এলাকা। ইতিমধ্যে দুই পাড়ে ‘পদ্মা সেতু উত্তর’ ও ‘পদ্মা সেতু দক্ষিণ’ নামে নতুন দুুটি থানার নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। থানাগুলো তদারকি করবেন দুজন সহকারী পুলিশ সুপার। ২৪ ঘণ্টাই নদীতে স্পিডবোট দিয়ে টহল দেবে নৌ পুলিশ। তাছাড়া থাকবে হাইওয়ে পুলিশও। পুলিশ ও সাদা পোশাকধারী পুলিশ সদস্যদের তদারকি করবে সেনাবাহিনী। যেকোনো গুজব ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর নজরদারি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেতু এলাকায় সন্দেহভাজন কাউকে পেলেই তাকে আটক করে জেরা করবে পুলিশ।
গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির বৈঠকে পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। পদ্মার দুই পাড়ে নিরাপত্তার বিষয়ে বেশ কিছু নির্দেশনাও দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধনকে সামনে রেখে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হচ্ছে। সেতু ঘিরে যাতে কোনো অপশক্তি তৎপর হতে না পারে সেই বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে। আজকের (গতকাল) বৈঠকে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এ নিয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তার ছক আঁকছে।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২৫ জুন বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বপ্নপূরণ হতে চলেছে দেশবাসীর বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার বাসিন্দাদের। এ উপলক্ষে জনসভার আয়োজন করা হয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই জনসভায় অন্তত ১৫ লাখ মানুষ উপস্থিত থাকবে। জনসভা ও নিরাপত্তা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা। সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে পুলিশসহ সবকটি সংস্থার পক্ষ থেকে। পুলিশ সদর দপ্তরে আইজিপির নেতৃত্বে বৈঠক করেছেন ঊর্ধ্বতনরা। পুলিশের পক্ষ থেকে সেতুর নিরাপত্তায় দুই পাড়ে থানার পাশাপাশি নৌপথেও পাহারা বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুই পাড়ে দুটি থানার কাজ শেষ হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই থানাগুলোর বিষয়ে গেজেট আকারে প্রকাশ করার কথা রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু ঘিরে ২০১৮ সাল থেকেই নিরাপত্তার ছক আঁকা হয়েছে। দুই পাশে দুটি নতুন থানা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং প্রান্তের থানাটির নাম “পদ্মা সেতু উত্তর থানা” ও শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্ট প্রান্তটির নাম হচ্ছে “পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানা”। শুধু সেতু নয়, দুই পাড়ের মানুষের নিরাপত্তা দেবে থানা দুটি। প্রায় ৩২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে চারতলা ভবন দুটি নির্মাণ করেছে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ। একজন সহকারী পুলিশ সুপারসহ ৪০ জন করে পুলিশ সদস্য থাকবেন প্রতিটি থানায়। সংযোগ সড়কের টোলপ্লাজার পাশে থানা ভবনের অবকাঠামো নির্মাণ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। সেতুর দুই প্রান্তেই দুটি করে ইউনিয়ন এ থানা দুটির অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। লৌহজংয়ের মাওয়া প্রান্তের থানার আওতায় থাকবে মেদেনীম-ল ও কুমারভোগ ইউনিয়ন। জাজিরা পয়েন্টের থানার আওতায় থাকবে পূর্ব নাওডোবা ও পশ্চিম নাওডোবা ইউনিয়ন।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সেতু উদ্বোধন হওয়ার এক সপ্তাহে আগেই নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হবে পুরো এলাকা। উদ্বোধনের দিন থেকেই থাকবে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি থানা পুুলিশ, নৌ ও হাইওয়ে পুলিশ এবং সাদা পোশাকধারী পুলিশ থাকবে নিরাপত্তায়। ২৪ ঘণ্টাই নদীতে টহল দেবে নৌ পুলিশ। এজন্য চারটি অত্যাধুনিক স্পিডবোট কেনা হয়েছে। যারা স্পিডবোটগুলো চালাবেন তাদের আলাদাভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আজ (গতকাল) নিরাপত্তাসংক্রান্ত কমিটির বৈঠকেও নিরাপত্তা নিয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের অন্য এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু নিয়ে দেশ-বিদেশে কোনো অপশক্তি কাজ করছে কি না তা নজরদারি করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। দেশের ভেতর থেকেও কেউ এ ধরনের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে। অপপ্রচারকারীদের বিষয়ে সতর্ক আছে প্রশাসন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও কড়া নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। তাছাড়া গুজব ঠেকাতে কাজ করছে পুলিশের সাইবার ইউনিট।’
শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার এসএম আশরাফুজ্জামান জানিয়েছেন, নতুন থানার জন্য জনবল অনুমোদন হয়েছে। মাওয়া প্রান্তের নতুন থানা ভবনটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ১৬ কোটি ৪৮ লাখ, জাজিরা প্রান্তে ১৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। থানায় ব্যবহৃত সামগ্রী আনা হয়েছে।
