অনিয়ম-অসংগতির কারণে ‘অধিকারের’ নিবন্ধন বাতিল

আপডেট : ১৪ জুন ২০২২, ০২:০৪ এএম

আর্থিক অনিয়ম, বৈদেশিক অনুদানের অর্থ নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়াও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে আনা এবং নানা অসংগতির কারণে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘অধিকারের’ লাইসেন্স নবায়নের আবেদন নামঞ্জুর করেছে এনজিওবিষয়ক ব্যুরো। সরকারি এ সংস্থা বলছে, ‘অধিকার’ নামের সংস্থাটির কার্যক্রম পরিচালনাসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য, কর্মরত ব্যক্তি, চলমান প্রকল্পের তালিকা নিয়মিত এনজিওবিষয়ক ব্যুরোকে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারা গত ৭ বছরে তা করেনি।

গতকাল সোমবার সংস্থাটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতি ও সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ‘অধিকার’ ১৯৯৫ সালের ২৫ মার্চ এনজিও ব্যুরোর থেকে নিবন্ধন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় (রেজিস্ট্রেশন নম্বর-০৯২৪)। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি দেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি সংক্রান্ত বিষয়ে ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী ও পশ্চিমা দেশের দূতাবাসে পাঠিয়ে আসছে। এ ছাড়া সমসাময়িক বিভিন্ন আলোচিত ইস্যুতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে মন্তব্য ও বিবৃতি প্রদান করা হয়ে থাকে, যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে। সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে মন্তব্য ও বিবৃতি প্রদান করলেও অধিকারের প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও তথ্যের ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অধিকার সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এবং মূল কর্ণধার আদিলুর রহমান খান অক্টোবর ২০০১-মে ২০০৭ পর্যন্ত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অধিকার এনজিওটি বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেয় ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে ঢাকার মতিঝিলে হেফাজতের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে নিহতের তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। ওই বছর ১০ জুন অধিকার এ-সংক্রান্ত বিষয়ে এক ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফাইন্ডিং রিপোর্ট তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। যেখানে দাবি করা হয়, ওই সংঘর্ষে হেফাজতের ৬১ জন কর্মী-সমর্থক নিহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিভ্রান্তি দূর করতে তথ্য মন্ত্রণালয় তথ্য অধিকার আইনের অধীনে ‘অধিকার’-এর কাছে তালিকার বিস্তারিত তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশনা দিলেও তারা তা দিতে অনীহা প্রকাশ করে। এ ছাড়া এনজিও ব্যুরোকেও তারা গোপনীয়তার অজুহাতে ওই প্রতিবেদনের মূল তথ্যাদি পাঠায়নি। পরে ২০১৩ সালের ১০ আগস্ট ‘অধিকারের’ সাধারণ সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক নাসির উদ্দিন এলানের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে একটি মামলা করা হয়, যে মামলায় আদিলুর রহমান গ্রেপ্তার হয়ে পরে জামিন পান। ওই মামলার কার্যক্রম বর্তমানে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে চলমান।

সূত্র আরও জানায়, ‘অধিকার’-এর তরফ থেকে ২০১৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর এনজিওবিষয়ক ব্যুরোতে নিবন্ধন নবায়নের জন্য আবেদন জমা দেওয়া হয়। ‘বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবকমূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন’ অনুসারে যেকোনো এনজিও পুনরায় নিবন্ধন আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের সময় তাদের পূর্ববর্তী ১০ বছরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার ভিত্তিতে সেটি সন্তোষজনক কি না, তা নির্ধারণ করা হয়। অধিকারের আবেদনপত্র যাচাইকালে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়মসহ নানা অসংগতি পায় এনজিও ব্যুরো। এর পরিপ্রেক্ষিতে এনজিও ব্যুরো থেকে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা তলব করে একাধিক চিঠি ইস্যু করা হয়। ‘অধিকার’ ওই চিঠিগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যা না দেওয়ায় এনজিও ব্যুরো থেকে তাদের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি।

তারা আরও জানায়, লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই ‘অধিকার’ ৭ বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। যেকোনো এনজিওর কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য অর্থের উৎস, কার্যক্রমসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য, কর্মরত ব্যক্তি সংক্রান্ত তথ্য, চলমান প্রকল্পের তালিকা ইত্যাদি নিয়মিত এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর কাছে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকার ৭ বছরে তা করেনি। এ বিষয়ে একাধিকবার এনজিওবিষয়ক ব্যুরো থেকে লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হলেও আদালতে রিটের দোহাই দিয়ে তারা তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ রক্ষা ছাড়াই বেআইনিভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যে অধিকারপক্ষের আইনজীবী ধারাবাহিকভাবে আদালতে শুনানির তারিখ পরিবর্তন করে আসছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৫ জুন এনজিওবিষয়ক ব্যুরো থেকে সুনির্দিষ্ট কারণ এবং ব্যাখ্যা উল্লেখপূর্বক ‘অধিকার’ এনজিওটির নবায়ন আবেদন নামঞ্জুর করে চিঠি দেওয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত