এক বছরে সুইস ব্যাংকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ জমা করেছেন বাংলাদেশিরা। আর ২০২১ সাল পর্যন্ত জমা করা টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। এর আগের বছর ২০২০ সালে ছিল ৫ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
আসন্ন অর্থবছরের (২০২২-২৩) বাজেটে ৭ শতাংশ হারে কর দিয়ে বিদেশে পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার সুযোগ রাখা নিয়ে আলোচনার মধ্যে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের এ হিসাব পাওয়া গেল।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে, সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ। প্রতি ফ্রাঁ ৯৫ টাকা করে ধরলে দেশি মুদ্রায় হয় ৮ হাজার ২৭৫ কোটি। ঠিক এক বছর আগে, এই টাকার অঙ্ক ছিল ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্রাঁ বা ৫ হাজার ৩৪৭ কোটি। অর্থাৎ এক বছরেই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে ২ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা।
নির্দিষ্ট করে গ্রাহকের তথ্য প্রকাশ না করলেও ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার তথ্য তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করছে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক।
সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, যদি কোনো বাংলাদেশি নাগরিকত্ব গোপন রেখে অর্থ জমা রেখে থাকেন তবে ওই টাকা এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। গচ্ছিত রাখা সোনা বা মূল্যবান সামগ্রীর আর্থিক মূল্যমানও হিসাব করা হয়নি এ প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে এখন পর্যন্ত যে হিসাব পাওয়া যায়, তাতে ২০২১ সালেই বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি আমানত ছিল সুইস ব্যাংকে। ২০০২ সালের মাত্র ৩ কোটি ১০ লাখ ফ্রাঁ আমানত, দুই দশকে বেড়েছে প্রায় ৩০ গুণ। বৃদ্ধির হারও সবচেয়ে বেশি ছিল ২০২১ সালে।
সুইস ব্যাংকে রাখা টাকা পাচারের অর্থ এমন ধারণা প্রচলিত। এমন ধারণাও আছে যে, বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনের আগে অর্থ পাচার বাড়ে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। ওই বছর শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বেশি। ২০১৭ সাল শেষে জমার পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। একইভাবে ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের বছরে পাচার হয়েছে ২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ২০১৩ সাল শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। আগের বছর ২০১২ সাল শেষে জমার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা।
সারা বিশ্বের ধনীদের অর্থ, গোপনে গচ্ছিত রাখার জন্য বহুদিনের খ্যাতি সুইজারল্যান্ডের। কঠোরভাবে গ্রাহকদের নাম-পরিচয় গোপন রাখে সুইস ব্যাংকগুলো। যে কারণে প্রচলিত ধারণা, অবৈধ আয় আর কর ফাঁকি দিয়ে জমানো টাকা জমা রাখা হয় সুইস ব্যাংকে।
পাচার ঠেকাতে সরকারের নানা পদক্ষেপ : আদালতের নির্দেশনার পরও বাংলাদেশিদের অ্যাকাউন্টে সবচেয়ে বেশি টাকা জমা হয়েছে গত বছর। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির হিসাবে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে পাচার হয় ৭১ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ বেড়েছে। ২০২১ সালের শেষে দেশটির ব্যাংকগুলোতে মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ফ্রাঁ। আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে ৪ হাজার কোটি ফ্রাঁ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সুইজারল্যান্ডে গোপনীয়তা কমতে থাকায় অনেক ধনী এখন অবৈধ টাকা জমা রাখার জন্য ঝুঁকছেন লুক্সেমবার্গ, কেম্যান আইল্যান্ড, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড কিংবা বারমুডার মতো কর স্বর্গের দিকে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান কর্মকর্তা মাসুদ বিশ্বাস গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এখনো সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদন দেখার সময় পাইনি। কেবলই অফিস থেকে ফিরলাম। প্রতিবেদন না দেখে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’
তবে বিএফআইইউর সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশ থেকে ব্যবসাভিত্তিক অর্থ পাচার বেশি হয়। আমদানি-রপ্তানির মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে এ টাকা বিদেশে রেখে দেওয়া হয়। তাছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের টাকাও বিদেশে পাচার করার খবর পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনের আগেও টাকা পাচার বাড়তে দেখা যায়। ঠিক সে কারণেই হয়তো গত বছর সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়ে থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে জমা থাকা বাংলাদেশিদের সব টাকাই যে পাচার করা, ঠিক তা বলা যাবে না। এর মধ্যে অনেক প্রবাসীর বিদেশে বসে আয় করা টাকাও থাকতে পারে। তবে সুইজারল্যান্ডের আইনে ব্যাংক হিসাবধারীদের তথ্য গোপন রাখার বিষয়ে খুবই সুরক্ষা দেওয়া হয় বলেই অবৈধ টাকা সেখানে জমা করার প্রবণতা বেশি।
একদিকে সরকার পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আগামী বাজেটে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে। গত ৯ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশ থেকে নগদ টাকা মাত্র ৭ শতাংশ কর দিয়ে দেশে আনার সুযোগ দেন। বিদেশি থাকা সম্পত্তি আয়কর নথিতে দেখাতে ১৫ শতাংশ করের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেন।
তবে এ নিয়ে দেশের সচেতন মহল বিশেষ করে অর্থনীতির গবেষকরা প্রথম থেকেই সমালোচনা করে আসছেন। এ নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘পাচার করা অর্থ দেশে ফেরত আনার এ সুযোগ সবদিক থেকেই অগ্রহণযোগ্য। এতে যেমন সৎ ব্যবসায়ীরা সৎভাবে ব্যবসা করতে নিরুৎসাহিত হবেন, অন্যদিকে অসৎ ব্যবসায়ীরা আরও বেশি টাকা পাচারে উৎসাহিত হবেন। তাছাড়া যারা টাকা পাচার করেন, তারা টাকা দেশে আনার জন্য পাচার করেন না।’
