জাদুঘরের অন্তর্নিহিত শক্তি

আপডেট : ১৭ জুন ২০২২, ১০:৫৭ পিএম

জাদুঘরের রয়েছে অসাধারণ এক শক্তি। আমাদের জাদুঘরগুলো অনেক পিছিয়ে রয়েছে উন্নত দেশগুলোর তুলনায়। বিশেষভাবে জাদুঘরের প্রদর্শনী ব্যবস্থা অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। জাদুঘরের প্রদর্শিত নিদর্শন তার অন্তর্নিহিত শক্তি নিয়ে বাঙ্গময় হয়ে উঠতে পারেনি। নিদর্শনের যে ঔন্দ্রজালিক শক্তি রয়েছে দর্শকের ভাবনার জগতে নাড়া দেওয়ার সেটি সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারেনি।

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম জাদুঘর স্থাপিত হয় ১৮১৪ সালে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির একতলা কক্ষে। শুরুর দিকে মানুষের মমি ও কঙ্কাল থাকায় এশিয়াটিক সোসাইটি জাদুঘর পরিচিত ছিল ‘মরা সোসাইটি’। অনেক সময়ই বলা হতো মরা জিনিসের সংগ্রহশালা। কারণ জাদুঘরে শুরুর দিকে অনেক ক্ষেত্রেই শুধু প্রত্ননিদর্শন রাখা হতো, ফলে তৎকালীন সমাজের মানুষ শিক্ষা ও এ-বিষয়ক জ্ঞানের অভাবে জাদুঘর বিষয়ে ততটা আগ্রহী হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে প্রথম জাদুঘর স্থাপিত হয়  ১৯১০ সালে বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটির উদ্যোগে, যেটি আমরা বরেন্দ্র জাদুঘর হিসেবে চিনি। এটি উপমহাদেশের অন্যতম একটি জাদুঘর। যখন ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ সংঘটিত হয়, তখন পূর্ববঙ্গের জনসাধারণের মন পেতে লর্ড কার্জন ঢাকায় আজকের কার্জন হলে একটি সভায় ঢাকার সিভিল সোসাইটির সঙ্গে মতবিনিময় করেন। উপস্থিত সিভিল সোসাইটি নেতৃত্ব তিনটি দাবি উত্থাপন করে, যেগুলোর মধ্যে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়, পাবলিক লাইব্রেরি ও জাদুঘর স্থাপন। ব্রিটিশ অনারারি মুদ্রাতাত্ত্বিক এইচ ই স্ট্যাপলটন পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আসাম মুদ্রাভান্ডার সংরক্ষণের জন্য জাদুঘরের কথা ভাবেন এবং ভাইসরয়কে এ বিষয়ে চিঠি লেখেন। চিঠি চালাচালি ও ঢাকার সিভিল সোসাইটির দাবির পথ ধরে ১৯১৩ সালের ৭ আগস্ট পুরনো সচিবালয় বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি কক্ষে জাদুঘর স্থাপিত হয়। পরে এ জাদুঘরটি ঢাকার নিমতলীতে স্থানান্তরিত হয় ১৯১৫ সালে জুলাই মাসে। পরবর্তী সময়ের পথপরিক্রমায় বর্তমান শাহবাগে ঢাকা জাদুঘরটি সরে আসে এবং ১৯৮৩ সালের ১৭ নভেম্বরে বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়।

মোটা দাগে জাদুঘর সম্পর্কে আমরা একটু জেনে নিলাম। খেয়াল করলে দেখা যাবে তৎকালীন ঢাকার সিভিল সোসাইটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বুঝতে পেরেছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক লাইব্রেরির পাশাপাশি একটি জাদুঘর অনগ্রসর সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে আর সেজন্যই এ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি করেছিল কারমাইকেলের সামনে। বিশ শতকের একেবারে গোড়ায় ঢাকার সিভিল সোসাইটি বুঝতে পারলেও আমার মনে হয় বর্তমান সিভিল সোসাইটি কিংবা শিক্ষিত সম্প্রদায় জাদুঘরের প্রতি নিষ্পৃহ। উনিশ শতকে এশিয়াটিক সোসাইটি জাদুঘরের প্রতি অনগ্রসর সমাজের যে নিষ্পৃহ ভাবটি ছিল প্রায় দুশ বছর পরও সেটি খুব একটি পরিবর্তিত হয়নি। বিভিন্ন সময় জাদুঘরে পরিচালিত দর্শক জরিপ থেকে জানা যায়, জাদুঘরে আমরা যাদের স্বল্পশিক্ষিত কিংবা তথাকথিত অশিক্ষিত তকমা দিই তারাই বেশি পরিদর্শন করেন তাদের কৌতূহলের কারণে।  আমরা জাদুঘরগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছি সমাজ থেকে। প্রদর্শিত নিদর্শনগুলোকে রেখেছি প্রাণহীন অবস্থায়। একই প্রদর্শনী চলছে যুগ যুগ ধরে। ফলে দর্শক হারিয়েছে আকর্ষণ।

আন্তর্জাতিক জাদুঘর সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব মিউজিয়ামস (আইকম) নামে পরিচিত। তারা এবারের জাদুঘর দিবসের স্লোগান নির্ধারণ করেছে ‘পাওয়ার অব মিউজিয়াম’। কিন্তু কেন? জাদুঘরের একটি প্রচন্ড শক্তি রয়েছে সমাজকে পথ দেখানো কিংবা সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে। আমরা যদি একটি প্রত্নবস্তু যেমন প্রাগৈতিহাসিক পাথরের হাতিয়ার কথাই চিন্তা করি তাহলে শুধু একটি পাথরের খন্ড দেখব না, দেখব এর পেছনের চিত্র। এই পাথরের হাতিয়ার কীভাবে আমাদের প্রাগৈতিহাসিক পূর্বপুরুষদের সংগ্রামী জীবন, পরিবেশের প্রতিকূলতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে টিকে থাকার কৌশলকে তুলে ধরে। একটি হাতিয়ারকে যদি জাদুঘর সেভাবে উপস্থাপন করতে পারে তাহলে এটি কথা বলতে শুরু করবে, দর্শককে একটি শক্তিশালী মেসেজ দেবে প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে। সে পরিবেশ কেমন ছিল, যে পরিবেশে মানুষ ছিল প্রকৃতিরই অংশ। সে নিজেকে বর্তমানের ন্যায় প্রাণিজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেনি, পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে শুধু নিজের লাভটি বোঝেনি। আর এ কারণে বর্তমানের ন্যায় প্রাগৈতিহাসিক মানুষের ওপর বিরূপ হয়ে ওঠেনি প্রকৃতি। সৃষ্টি হয়নি গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের। একটি পাথরের হাতিয়ারকে অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যম ব্যবহার করে বাঙ্গময় করে তুলতে পারলেই সেটি দর্শকের সঙ্গে ইন্টারেক্টিভ হয়ে উঠবে, দর্শক আকৃষ্ট হবে। এ ক্ষেত্রে আফ্রিকান অথবা ব্রাজিলের আমাজনের কোনো আদিবাসী গোষ্ঠী কীভাবে পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করে জীবনধারণ করে তার অডিও-ভিজ্যুয়াল সাপোর্ট থাকতে পারে। পাশাপাশি প্রাগৈতিহাসিক পরিবেশকে ডিওরোমার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলে পাথরের হাতিয়ার দিয়ে মানুষ কীভাবে নানা ধরনের কাজ করত, সেটিকে ফুটিয়ে তোলা যেতে পারে। তাহলে সেটি একজন দর্শকের কাছে সহজে বোধগম্য ও অর্থবহ হয়ে উঠবে প্রদর্শনী।

বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি যদি আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে তরুণরা দেশকে প্রযুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাচ্চারা গেমিংয়ের নেশা থেকে বের হয়ে আসবে। এ ক্ষেত্রে জাদুঘর পালন করতে পারে অসাধারণ ভূমিকা এবং নতুন নতুন প্রদর্শনীসহ স্কুল-কলেজের ছাত্রদের জন্য বিজ্ঞানবিষয়ক প্রজেক্ট নিতে পারে। তাদের আধুনিক টেকনোলজির সঙ্গে ইন্টারেক্টিভ ওয়েতে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। রোবট যদি প্রদর্শনীতে থাকে এবং সেগুলো যদি স্কুলের বাচ্চাদের সঙ্গে ইন্টারেক্টিভভাবে ভাববিনিময় করে, হ্যালো বলে ওঠে, তাহলে স্কুলশিশুটির মনে যে আকর্ষণ তৈরি হবে, তা হয়তো তাকে ভবিষ্যতে রোবোটিকসের বিষয়ে আগ্রহী করে তুলবে। তারা বিজ্ঞান বিষয়ে ভাববে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে চিন্তা করবে, খুঁজে দেখার চেষ্টা করবে তার সমাধানের পথ। জাদুঘরের সঙ্গে বর্তমান যুগের জাদুঘর শুধু মরা সোসাইটি না বরং সব সমসাময়িক বিষয়কেই অ্যাড্রেস করে।

আধুনিক বিশে^ও জাদুঘর কতটা সমাজ-সংশ্লিষ্ট তার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন : ফ্রান্সের একটি প্রাসাদ জাদুঘরে ফুটবলার রোনালদোর জমকালো বিয়ের আয়োজনটি সম্পন্ন হয়েছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমা দুনিয়ায় জাদুঘর তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে সমাজে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। আর আমাদের দেশে জাদুঘরে কখোন বা কর প্রশাসনের লোক কবিতা লিখে জাদুঘর পরিচালনা করে ফলে, সেই কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি জাদুঘরের ন্যায় মরা সোসাইটি হয়েই রয়ে গেছে দর্শকের কাছে। কিন্তু এ বছরের প্রতিপাদ্যের ন্যায় জাদুঘরের অন্তর্নিহিত শক্তিকে  দর্শকের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়, জাপান ও চীন থেকে জাদুঘর ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত