মিতালীর সঙ্গে এগিয়ে চলে সেই সব মেয়েরা

আপডেট : ১৯ জুন ২০২২, ১০:৩৭ পিএম

একবার, শুধু এই একটিবার কষ্ট করে উঠে দাঁড়ান। শেষবারের জন্য কুর্ণিশ করুন উপমহাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয়, ট্যালেন্টেড নারীকে। ব্যাট হাতে ধীরে ধীরে তিনি ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন। আর কখনো কোনো দিনই তিনি প্রিয় তিন নম্বর জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন না। কখনো তার বিদ্যুৎগতির কভার ড্রাইভ আছড়ে পড়বে না সীমানার বাইরে। ক্রিজ ছেড়ে শেষবারের মতো আসতে আসতে ঈষৎ থমকালেন। মুখে একচিলতে হাসি। সতীর্থদের দিকে ফিরে তাকালেন। তাদের অনেকেই তখন মুখ ফিরিয়ে চোখের জল লুকোতে ব্যস্ত। বিপক্ষ দলের সবাই হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন, দিনের পর দিন তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির পঞ্চান্ন কেজি ওজনের প্রায় জীবন্ত এক কিংবদন্তিকে।

শচিন টেন্ডুলকার, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, বিরাট কোহলি বা মোহাম্মদ আজহার উদ্দিন তিনি নন। তবুও ক্রিকেট যতদিন থাকবে ততদিন ভোরাই রাজ ও লীলা রাজের একমাত্র মেয়ে মিতালী রাজ থেকে যাবেন জনমনে। নিছক ক্রিকেটার হিসেবে নন। অথবা রেকর্ড ভাঙা-গড়া ছিল যার প্যাশন বা শখ, তার জন্যও নয়, তিনি থাকবেন উপমহাদেশের বহুচর্চিত পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ক্রিকেট বিশ্বেও পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যের মধ্যে অসাধারণ কৃতিত্বে এক অন্য ধরনের নারীবাদী লড়াইয়ের ক্যাপ্টেন হিসেবে। যে দেশে মিতালী জন্মেছেন সেখানে কয়েক বছর আগেও বিহার, উত্তর প্রদেশের বিস্তৃত এলাকায় ছিল ডোলি বা পালকি উঠানোর মতো কুৎসিত রীতি। পালকি করে বিয়ের পর নতুন কনে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার আগে তাকে জোর করে থাকতে বাধ্য করা হতো গ্রামের উঁচু জাতের সামন্ত প্রভুর সঙ্গে। তিনি ভোগ করার পরে সে শ্বশুরাল যাওয়ার অনুমতি পেত। মহারাষ্ট্রের সীমান্ত গড়চৌলিতে ছিল ব্লাউজ খুলানা। সামন্ত মাতব্বরদের সামনে খোলা বুক নিয়ে চলতে হতো বিবাহিতাদের। এ ‘নিয়ম’ না মানলে কঠিন শাস্তি পেতে হতো ওই মেয়েদের।

এসব না হয় কয়েক বছর আগের কথা। এখনো ধর্ষণ আজ প্রতিদিনের ঘটনা। এখানে খোদ শাসক নেতা অন্য ধর্মের নারীদের কবর থেকে তুলে রেপ করার নিদান দেন। গরমের দিনে রাত থাকতে মেয়েদের মাইলের পর মাইল হেঁটে শুকিয়ে যাওয়া নদীর বালি খুঁড়ে খাবারের জল আনতে হয়। বর্ষার দিনে শিশু খাবার না পেয়ে কাঁদলে মা মাটি থেকে বুনো আলু তার মুখে দেয়। যা অধিকাংশ বিষাক্ত। যা খেয়ে মায়ের কোলে শেষবারের মতো শিশু ঘুমিয়ে পড়ে। আর কখনো সে বায়না করে না খাবারের জন্য। বছরের পর বছর ভারতে পুরুষতান্ত্রিকতার আধিপত্য দেখে আসছি। হয়তো অন্যান্য দেশের ছবিও এক। কিন্তু আমি এই দেশটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। মণিপুরে থাংজম মনোরমাকে কীভাবে ধর্ষণ করা হয়েছিল তা আজও ভুলিনি। মনে আছে এরকমই এক বৃষ্টিভেজা জুলাই মাসে খুন হওয়ার পরে মণিপুরের এক গ্রামে মনোরমার মায়ের মুখোমুখি হওয়ার কথা। ক্যামেরার সামনে একবারের জন্যও তিনি মুখ খোলেননি। কিন্তু তার চোখমুখের যে গনগনে ক্রোধ তা কখনো ভুলব না। সেবার উত্তাল হয়ে উঠেছিল। আর এক শহীদ বেবিকার মায়ের বুকফাটা কান্না এখনো ভুলিনি। সোনি সোরির কথা কেউ কেউ নিশ্চিত জানেন। আদিবাসী স্কুল শিক্ষক সোনিকে মাওবাদী সন্দেহে দিনের পর দিন শারীরিক অত্যাচার করা হয়েছিল পুলিশ ক্যাম্পে।

এসব তো না হয় গ্রামীণ ঘটনা। রেপটেপ তো চরম ব্যাপার। শহরের নিত্যদিনের পুরুষতন্ত্র বুঝতে পারি, হয়তো আমার মেয়ে আছে বলেই। আমি নিজে পুরুষ বলেও জানি আমরা সবাই কমবেশি চেতনে অবচেতনে ‘পুরুষ’। আমাদের ভাষায়, আচরণে সময় সময় তা বেরিয়ে আসে। উপমহাদেশে এমন একটাও স্ল্যাং নেই যা মেয়েদের প্রতি অসম্মান নয়। সঙ্গে পুরুষ না থাকলে এখনো অনেক জায়গায় একা একজন নারী ঘর ভাড়া পান না। সিঙ্গেল মাদার তো অনেক পরের কথা, ডিভোর্সি মেয়েদের নিয়েও আমাদের কৌতূহল কম নয়। আমার বোন অভিনেতা। ক্লাস নাইনে কী হতে চাও বলায় ও অ্যাকট্রেস হতে চায় শুনে ক্লাস টিচার ওকে শাস্তি দিয়েছিলেন। আমার মেয়ে হওয়ার সময় নার্স বলতে চাননি যে মেয়ে হয়েছে। পাছে আমি ও আমার স্ত্রী ভেঙে পড়ি ছেলে হয়নি শুনে। মেয়েটা যখন খুব ছোট্ট তখন একটা ব্যাট কিনে দেওয়ার বায়না করছিল। দোকানের ছেলেটি বলেছিল, তুই ব্যাট নিয়ে কী করবি! খেলনা নে। ব্যাট নেবে ‘ব্যাটা ছেলেরা’। মেয়ে অধ্যাপক। ছেলে ডাক্তার। বাড়িতে খাতির কিন্তু ডাক্তার ছেলের। আমাদের শাস্ত্রে বলা আছে যে মেয়েরা শৈশবে বাবার অধীন, পরে স্বামীর, শেষ বয়সে ছেলের। ‘নারী নরকের দ্বার’, ‘পথে নারী বিবর্জিতা’ এসব আমাদের মনের গভীরে ঢুকে আছে। এখানে ছেলেরা বিয়ে করে। মেয়েদের দেওয়া হয়। বিহারের গ্রামে গ্রামে এই কদিন আগেও মেয়ে জন্মালে কান্নার রোল উঠত। এখনো ছবিটা এক আছে। কিছু বদলেছে ওপর ওপর। কাপড় কাচা ছিল ধোপার কাজ। এখন আধুনিক ওয়াশিং মেশিনে মেয়েরা কাচে। বাজারে দোকান ছিল ছেলেদের একচেটিয়া। এখন শপিং মলের ভিড়ে মেয়েদের বেশি দেখা যায়। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে! প্রযুক্তি এসে নানাভাবে সংসারের জাঁতাকলে মেয়েদের অন্যভাবে বেঁধে দিচ্ছে। আমরা বাইরে থেকে ভাবছি মেয়েরা স্বাধীন। ভারতের অধিকাংশ জায়গায় আজও পুরুষরাই সংসারের যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেন। পঞ্চায়েতে মেয়েরা ভোটে জেতেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় ক্ষমতার চাবিকাঠি থাকে স্বামীর হাতে।

এরকম কঠিনতম মাটিতে এক একজন মিতালী রাজ যখন জন্ম নেন, তখন বুঝতে পারি কী কঠিন লড়াই করে মেয়েটাকে এগোতে হয়েছে। মিতালী রাজ তখন একা থাকেন না। তার পেছনে পেছনে গ্রাম-শহরের সমস্ত চোয়াল শক্ত করে সামনে এগোতে থাকা মেয়েরা। সেই দলে যেমন থাকেন স্বামীর অ্যাসিড ছোড়ার কারণে অর্ধেক মুখ ঝলসানো মেয়ে, কিংবা স্ত্রী চাকরি করতে যাবে শুনে হাতের কবজি কাটা মেয়েটি বা গণধর্ষণের পরেও মাথা উঁচু করে পরীক্ষায় দুর্দান্ত রেজাল্ট করা কিশোরীটি।  এই সব মেয়েরা যখন এগোতে থাকেন তখন ভেঙে না পড়লেও পুরুষতন্ত্র ভয় পায়। পেতে থাকে। এদেশে তাই যত সফল হোন না কেন মিতালী রাজেরা একটু আড়ালেই থাকেন। বিশ্ব ক্রিকেট মানচিত্রে ভারতকে বহু বহু খেতাব এনে দিলেও শচিন-সৌরভের মতো করপোরেট মিডিয়ার আলো মিতালীর দিকে পড়ে না। শচিনরা স্টার। মিতালী, ঝুলন গোস্বামীরা শুধুই কৃতি।

মিতালী ভারতের ক্যাপ্টেন হয়েছেন মাত্র একুশ বছর বয়সে। দশ বছর বয়সে মিতালী ক্রিকেট খেলা শুরু করেন দাদার উৎসাহে। সেকেন্দ্রাবাদ থেকে স্নাতক মিতালী ১৬ বছর বয়সে প্রথম ওয়ান ডে-তে নেমেই সেঞ্চুরি করেন। টেস্টে মিতালীর মোট রান ১০,৮৬৮। ১২টি টেস্ট খেলেছেন। ২৩২টি ওয়ান ডে। এবং ৮৯টি টি-টুয়েন্টি। মিতালী সম্বন্ধে বলা হয় যে ও শুধুমাত্র ছয় বলে প্রত্যেকটিতে ছয় মারা ছাড়া ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রিকেটের সব রেকর্ড গড়ে নিজেকে ইতিমধ্যেই জীবন্ত কিংবদন্তি করে তুলেছেন।

লেক ব্রেক বোলার হিসেবেও মিতালী আসাধারণ। শুনছি মিতালী রাজকে নিয়ে সিনেমা হতে চলেছে। হয়তো উপন্যাস লেখাও হবে। কী হবে, কী হবে না জানি না। এটুকু বলতে পারি যে, অনেক মানুষের আইকন আজ এই নিরহঙ্কারী তামিল মেয়েটি। অনেকে না চাইলেও ভারতের পুরুষ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি নিজের জায়গাও করে নিতে পেরেছেন মিতালী রাজ। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে মিতালীর মতো কভার ড্রাইভ কৈশোরে দেখেছি নবাব পতৌদি, ব্রীজেশ প্যাটেল ও গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথকে মারতে। পরে আজহার, শচিন ও কখনো সখনো সৌরভ গাঙ্গুলিকে মারতে। মিতালীকে বলা হয় মহিলা শচিন টেন্ডুলকার। মনে হয় না অসম্ভব ব্যক্তিত্বের মিতালী এই সম্বোধনে আপ্লুত হবেন। নিজের ইমেজ তিনি নিজেই গড়ে তুলেছেন। মিতালী মাঝেমধ্যে বিরাট কোহলির প্রশংসা করেছেন। অন্য কাউকে নিয়ে কখনো আদিখ্যেতা করেননি। তেইশ বছর ক্রিকেট খেলার পরে মিতালী রাজ খেলা থেকে অবসর নিলেন। একসময় স্বপ্ন দেখতেন ভারতনাট্যম শিল্পী হবেন। অসম্ভব পড়ুয়া মিতালী রাজ। ব্যাট করার আগে অবধি প্যাভিলিয়নে ওর হাতে থাকে কোনো না কোনো বই অত্যন্ত সিরিয়াস বিষয়ের ওপর।

জুন মাসের আট তারিখে তিনি শেষবারের মতো ক্রিজ ছেড়ে চলে আসার পর থেকে আজও অনেকের মন খারাপ। মিতালী তো শুধু খেলোয়াড় ছিলেন না। তিনি ছিলেন অন্ধকার থেকে নারীর উত্তরণের এক আলোকবর্তিকা। মিতালী রাজের সাফল্য মানেই পুরুষ আধিপত্যের বিরুদ্ধে একঝলক টাটকা বাতাস। মিতালী অবসর নিলেন। কিন্তু থেকে গেল তার চমকপ্রদ লড়াই। যা আগামী বহুকাল মেয়েদের বার্তা দেবে ওঠো। কঠিন পরিস্থিতিতেও মাথা না নুইয়ে সামনের দিকে তাকাও। জয় অনিবার্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত