কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের চর গুঁজিমারি অতিক্রম করছে আমাদের নৌকা। বোটের ইঞ্জিনের ঘুটঘুট শব্দ বানভাসিদের চরে পৌঁছতেই একদল মানুষ দৌড়ে এলো নৌকার দিকে। তাদের ধারণা রিলিফের নৌকা। ওদের মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। একজন বৃদ্ধ প্রাণপণে সাঁতরে নৌকার কাছাকাছি এলেন। তিনি জানালেন, প্রায় ৩ দিন কুমড়া সিদ্ধ আর চিঁড়া খেয়ে আছেন। গরম ভাত এক লোকমাও তার কপালে জোটেনি। সাংবাদিকের নৌকা শুনে বিরূপ মন্তব্য করলেন বৃদ্ধ। বললেন, ‘ফটোক তুল্লে কি হামার প্যাট ভইরবে!’ হতাশ হয়ে ফিরে গেলেন ত্রাণের আশায় থাকা একদল নারী-পুরুষ। কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল হাই সরকার জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত ৯ উপজেলার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৩৮ টন চাল, ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, শিশুখাদ্য এবং গো-খাদ্য কেনার জন্য ১৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এছাড়াও ত্রাণকাজ পরিচালনার জন্য ২৬৫ টন চাল ও ৬ লাখ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই বরাদ্দের সামান্য কিছু বিতরণ হলেও অধিকাংশ এখন পর্যন্ত বানভাসিদের মধ্যে বিতরণ শুরু হয়নি। তাই ক্ষুধার্ত মানুষজন নৌকার শব্দ পেলেই খাদ্য-সাহায্যের আশায় ছুটে আসছেন নদীতীরে।
একই উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের মেকুরের আলগার চরে গিয়ে দেখা যায়, জব্বার আলী (৬৫), মহুর উদ্দিন (৪০), কাশেম আলী (৪৫) ও আমজাদের বাড়ির অর্ধেক পানির নিচে। আশামণি বেওয়া একদিন আগে পান্তা বানিয়ে রেখেছিলেন। হাঁড়ি বের করলে দেখা গেল, তাতে ভাতের চেয়ে পানিই বেশি।
কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের খেওয়ার চরের মমেনা বেগমের অবস্থা আরও খারাপ। গত দু’দিনে এক মুঠো ভাত জোটেনি তার। বাড়িঘর ছেড়ে এখন বসবাস নৌকায়। এমন অবস্থা বেশ কিছু পরিবারের বলে জানালেন এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর। তিনি জানান, ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে যাওয়ায় মানুষজন রান্না করতে পারছেন না। খাদ্য সংকটে রয়েছেন এলাকার খেওয়ার চর, পোড়ার চর, কলাকাটা ঝুনকার চরের বিপুল সংখ্যক বানভাসি মানুষ। এসব পরিবারে শুকনো খাবার জরুরি ভিত্তিতে দেওয়া দরকার।
সরেজমিনে দেখা যায়, বানভাসি মানুষজনের তুলে রাখা মিষ্টি কুমড়া, কাউনের চাল ও চিনাবাদাম জাতীয় খাবার শিকায় তোলা আছে। আসল সংকট তাদের পানযোগ্য পানি, শুকনো খড়ি এবং রান্না করা খাবারের।
উলিপুরের হাতিয়া ও চিলমারীর ফকিরেরহাটের মাঝি ও মাছ ব্যবসায়ী মন্টু মিয়ার ভাষ্যমতে, নদীতে বানের পানি বেড়ে গেলে জালে মাছ ওঠে না। তাই মৎস্যজীবীদের অনেকেই এখন কর্মহীন দিন কাটাচ্ছেন।
নৌকার ইঞ্জিন চালু করছিলেন উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের গাঙচিলের চরের আক্কাস আলী (৫৫)। নৌকায় একদল নারী-পুরুষ। তারা যাচ্ছেন জাহাজের আলগার চরে। সেখানে নাকি কারা রিলিফ দেবেÑ এমনটা শুনেছেন এলাকার মানুষজন। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে একটু খাদ্য পাওয়ার আশার উড়ো খবরেরও গুরুত্ব অনেক। নৌকার ইঞ্জিন চালু হলো একরাশ কালো ধোঁয়া তুলে। সেই ধোঁয়ায় নিমেষে মিলিয়ে গেল একদল ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ।
