আশ্রয়কেন্দ্রে মিলছে না শিশুখাদ্য

আপডেট : ২২ জুন ২০২২, ০৪:০৪ এএম

উজানের ঢল ও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তাসহ উত্তরের প্রায় সব নদ-নদীর পানি বেড়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও গতকাল মঙ্গলবার আগের ২৪ ঘণ্টার চেয়ে কিছুটা নিচে নেমেছে।

উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে নিম্নাঞ্চল ও নদ-নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী চরাঞ্চলের মানুষ। বন্যার পানিতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে শতাধিক চর ও নদীসংলগ্ন জনপদ। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। বন্যাদুর্গত অনেক পরিবার নৌকা ও বাঁশের মাচায় আশ্রয় নিয়ে দিন পার করছে। আবার অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে পাকা সড়ক ও উঁচু বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। আশপাশের প্রায় সব জায়গা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে বন্যাদুর্গত এসব এলাকায়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বন্যাদুর্গত কিছু কিছু এলাকায় ত্রাণ সরবরাহ থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। বিশেষ করে শিশুদের ও গবাদি পশুর খাদ্য সংকটে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে বন্যার্তদের। বিস্তারিত সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলার প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্যে :

নেত্রকোনার প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও গতকাল আগের ২৪ ঘণ্টার চেয়ে কিছুটা নিচে নেমেছে। আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবারের প্যাকেট দেওয়া হলেও আশ্রিত শিশুদের জন্য নেই শিশুখাদ্য। মাছ ভেসে যাওয়ায় ১৫ হাজারের বেশি মাছচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নেত্রকোনা সদর থেকে মদন উপজেলায় যাতায়াতের ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের আটটি স্থান এখনো পানিতে ডুবে রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১০ উপজেলায় ৭৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ লাখ ৯ হাজার ৫৯০ পরিবারের ৫ লাখ ৪১ হাজার ৪০০ বন্যার্ত আশ্রয় নিয়েছে। ৪ হাজার ৯৫০ প্যাকেট শুকনো খাবারের বরাদ্দের মধ্যে গত কয়েক দিনে ২ হাজার ৬৫০ প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্রের ১৯ হাজার ৭৬৩ শিশুর জন্য নেই শিশুখাদ্য বরাদ্দ। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বে থাকা সমন্বয়কারীদের একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব রিফাত শারমিন বলেন, ‘শিশুখাদ্যের বিষয়ে অফিশিয়ালি কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শিশুখাদ্যের বিষয়টি নিয়ে আজ (গতকাল মঙ্গলবার) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আলোচনা করেছেন।’

কলমকান্দা উপজেলা শহর থেকে পানি নেমে গেলেও সেখানে অজ্ঞাতপরিচয় এক বয়স্ক নারীর লাশ উদ্ধার হয়েছে। কলমাকান্দা থানা পুলিশ জানায়, খারনৈ ইউনিয়নের গজারমারি এলাকায় খালে ভেসে ওই নারীর গলিত মৃতদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে। এলাকাবাসীর ধারণা, ওই নারী আদিবাসী হতে পারেন এবং বন্যায় কোথাও কবরস্থান ডুবে মাটি সরে অথবা সীমান্তের ওপার থেকে তার লাশ ভেসে আসতে পারে। মরদেহটি এক মাস আগের হবে বলে ধারণা পুলিশের।

কম্পিউটারের দোকানে ত্রাণের প্যাকেট : খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর ইউনিয়ন পরিষদের পাশে নাসির নামে এক ব্যক্তির কম্পিউটারের দোকান থেকে ১৬ প্যাকেট ত্রাণ উদ্ধার করেছে পুলিশ। খালিয়াজুরী থানার এসআই বিপ্লব মোহন্ত জানান, উদ্ধার করা ত্রাণের প্রতি প্যাকেট রয়েছে পাঁচ কেজি চাল, এক কেজি করে লবণ, ডাল ও চিনি, এক লিটার তেল এবং একশো গ্রাম ওজনের হলুদ, মরিচ ও ধনিয়ার প্যাকেট। খালিয়াজুরীর ইউএনও এএইচএম আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ত্রাণ উদ্ধারের বিষয়টি শুনেছি। বিষয়টি তদন্তাধীন। তবে আমার এখানে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে।’ শিশুখাদ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বরাদ্দ আসামাত্র বিতরণ করা হবে।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান কবীর জানান, প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর আয়তনের ২৫ হাজারের বেশি পুকুরের ১২ হাজার টন মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মাছচাষির সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি হবে।

লালমনিরহাটে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ চরমে : লালমনিরহাটে নদীর পানি আরও বেড়েছে । বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২০ হাজারের বেশি মানুষ। গত সোমবার থেকে চলাচলের রাস্তা ডুবে যাওয়ায় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবসহ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে পানিবন্দি এসব মানুষ।

গাইবান্ধায় পানিবন্দি ৫৭ হাজার মানুষ : গাইবান্ধার সব নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ইতিমধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে ঘাঘট নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। বিপদসীমা অতিক্রম করার কাছাকাছি রয়েছে তিস্তা নদীর পানিও। বন্যায় এ পর্যন্ত গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৩টি ইউনিয়নের ৫৭ হাজার ২৬৪ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৬০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ১৮টিতে প্রায় ১ হাজার ৯০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

এদিকে তিস্তা নদীর সুন্দরগঞ্জ উপজেলা, ব্রহ্মপুত্র নদের সদর উপজেলা এবং যমুনা নদীবেষ্টিত ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার অনেক এলাকা নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। ভাঙনকবলিত শতাধিক পরিবার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে নলকূপ, সবজি ও পাটসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল। ফলে বাজারে বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম বাড়তে শুরু করেছে। মানুষ সুপেয় পানির অভাবে কষ্ট পাচ্ছে।

বগুড়ায় ৪৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, পানিবন্দি ১৮ হাজার পরিবার : বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ১৮ হাজারের বেশি পরিবারের বাড়িঘরে ও ৪৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিন হাজার হেক্টর ক্ষেতের ফসল। বসতবাড়িতে পানি ওঠায় পরিবারের সদস্যসহ গবাদি পশু নিয়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে বন্যার্তরা। বন্যার পানিতে ১০ হাজার ২৫০টি নলকূপ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে ১১ হাজার গবাদিপশু। পশুখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

শাহজাদপুরে নৌকায় বসবাস বানভাসিদের : সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে যমুনাসহ সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি অনেক পরিবারের ঘরে চাল-ডাল নেই। অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে তারা।

পৌর সদরের পানিবন্দি লিখন, জাহিদুল, বিপ্লব ও হোসাইন জানান, গত কয়েক দিন ধরে পানিবন্দি থাকলেও ত্রাণ দেওয়া তো দূরের কথা, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কেউ কোনো খোঁজও নেয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শাহজাদপুরের ইউএনও তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ পর্যন্ত ৪০ প্যাকেট শুষ্ক খাবার প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ২০ টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে তা বিতরণ করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত