মোংলা এখন সবচেয়ে কাছের বন্দর

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ১২:০৮ এএম

পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় রাজধানী ঢাকা থেকে এখন সবচেয়ে কাছের সমুদ্রবন্দর হবে মোংলা। আগে রাজধানী থেকে মোংলা সমুদ্রবন্দর যেতে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ পারি দিতে হতো। এখন পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় তা ১৭০ কিলোমিটারে নেমে আসবে। যাত্রা পথ ও সময় সাশ্রয় হওয়ায় মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক দেশের শিল্প-বাণিজ্যের সম্ভাবনার নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। আগামীতে দেশের অর্থনীতিতে মোংলা বন্দর হবে নতুন এক ‘অর্থনৈতিক কেন্দ্র’। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে খুলে যাবে অর্থনীতির নতুন দুয়ার।

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ঢাকার দূরত্ব ২৬৪ কিলোমিটার। তবে এ পথে যানজট ও গাড়ীর চাপ বেশি থাকায়আমদানি-রপ্তানি পণ্য আনা-নেওয়ায় অনেক বেশি সময় নস্ট হয়।  আর দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা থেকে ঢাকার দূরত্ব ২৭০ কিলোমিটার। এ হিসেবে পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় রাজধানীর সবচেয়ে কাছের সমুদ্রবন্দর হতে চলেছে মোংলা। সময় ও পরিবহন ব্যয় বিবেচনায় সাশ্রয়ী বন্দর হিসেবে মোংলার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

পদ্মা সেতুর পাশাপাশি খুলনা-মোংলা রেলসেতু এবং রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানিকারকরা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থেই মোংলা বন্দর ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। যে কারণে মোংলা বন্দর নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের। এরই মধ্যে এ বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে শুরু করেছে নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা।

মোংলা বন্দর-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর মোংলা বন্দর থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনে সময় লাগবে মাত্র তিন ঘণ্টা, যা আগে লাগত ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা। এখন তাদের সময় বাঁচবে ছয় ঘণ্টা। আর মোংলা বন্দর থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরিবহনে সময় লাগত ১৪ ঘণ্টা। সেতুর কারণে তা কমে এখন হবে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। এখানেও সময় বাঁচবে ছয় ঘণ্টা। সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের সময় সাশ্রয় হবে ১২ ঘণ্টা, যা ব্যবসার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা এনে দেওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে লাভবানও হবেন তারা।

সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে মোংলা বন্দর কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসা পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মোংলা অর্থনীতিতে কী ভূমিকা রাখবে তার নানা দিক তুলে ধরেন।

মোংলা বন্দরের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘বহু প্রতীক্ষিত পদ্ম সেতুর সঙ্গে বন্দরের ভবিষ্যৎ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মোংলা বন্দর প্রতিষ্ঠার ৭০ বছরের ইতিহাসে গত অর্থবছরে সর্বোচ্চসংখ্যক জাহাজ আগমনে রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড হয়েছে। তিনি জানান, বন্দরের উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চলছে। ইনারবারে ২৩ কিলোমিটার ক্যাপিটাল ড্রেজিং কাজ হচ্ছে। এরই মধ্যে বন্দরের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় দুটি নতুন জেটি নির্মিত হচ্ছে। জেটি নির্মাণ ও ড্রেজিংয়ের কাজ পাশাপাশি চলছে। আশা করছি আগামী বছরের জুনের মধ্যে ড্রেজিং ও জেটি নির্মাণকাজ শেষ হবে। সেই সঙ্গে আরও কিছু বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।’

বন্দর চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘বন্দরের উন্নয়নে ৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তিন বছরের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হলে মোংলা বন্দরটি অন্যমাত্রায় চলে যাবে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অন্য সমুদ্র বন্দরের চেয়ে আরও কাছে অবস্থান করবে। এরই মধ্যে আমদানি-রপ্তানিকারকরা বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমরা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছি। বন্দরের উন্নয়নে অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি শেষ হয়েছে আরও কিছুর কাজ চলমান রয়েছে। এগুলো শেষ হলে বন্দরের সক্ষমতা দেড় থেকে দুই গুণ বৃদ্ধি পাবে। কার্গো, কনটেইনার এবং গাড়ি আমদানি বেশি হবে।’

মোহাম্মদ মুসা বলেন ‘নদীর নাব্যতা কম থাকায় বর্তমানে সাত ফুট গভীরতার জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারে। তবে ২৩ কিলোমিটার অংশের ক্যাপিটাল ড্রেজিং কাজ শেষ হলে এ বন্দরে ৯ ফুট গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারবে।’

পদ্ম সেতুর সঙ্গে বর্তমানে মোংলা বন্দরের যোগাযোগের যে মহাসড়ক রয়েছে তার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রয়োজন উল্লেখ করে মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘মোংলা বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ শুরু হবে। রেলের কাজও শেষের দিকে। রেল ও সড়কের কাজ সম্পন্ন হলে, মাল্টিমডেল ট্রান্সপোর্টেশন বন্দরের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হবে।’

আগামীতে বন্দরের কার্যক্রম আরও বেগবান হবে জানিয়ে মোংলা বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘মোংলা হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইকোনমিক হাব। বন্দর এলাকায় ১৪টি এলপিজি ফ্যাক্টরি আছে, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি আছে, ইপিজেড আছে। ইকোনমিক জোন হয়েছে। বন্দর এলাকা শিল্প এলাকায় পরিণত হয়েছে। পোশাকশিল্পের ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ আমাদের বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হলে এ বন্দর হবে সাশ্রয়ী।’

এ প্রসঙ্গে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, বাগেরহাটে মোংলা বন্দর ও ইপিজেড রয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হলে এখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। বাগেরহাটের খুলনা-মোংলা যে মহাসড়কটি রয়েছে তার দুই পাশের অধিকাংশ জমি কেনাবেচা হয়ে গেছে। এখানে অনেকগুলো পর্যটন হোটেল-মোটেল, শিল্প-কলকারখানা স্থাপন হবে। এখানকার লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এতে করে বাগেরহাটের অর্থনৈতিক উন্নতি আরও বেগবান হবে।’

বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও মোংলা কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শেখ লিয়াকত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, মোংলা বন্দর দিয়ে এখন সবচেয়ে বেশি আমদানি হচ্ছে গাড়ি। প্রতি মাসে তিন থেকে চার হাজার রিকন্ডিশন্ড গাড়ি এখান থেকে আমদানি করছেন আমদানিকারকরা। এখন পদ্মা সেতু চালু হলে পোশাক কারখানার মালিকরাও এ বন্দর দিয়ে বিদেশে পোশাক রপ্তানি করতে পারবেন।’

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে সুন্দরবনে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়বে। পর্যটকদের চাপ সামাল দিতে সুন্দরবনের করমজলের মতো আরও নতুন চারটি ট্যুরিস্ট স্পট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

মোংলা বন্দরকে ঘিরে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত