স্বপ্নজয়ের পদ্মা সেতুর নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ০৬:১০ এএম

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজতর করার লক্ষ্যে দেশের বৃহৎ নদীসমূহের ওপর দিয়ে সেতু নির্মাণ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় পদ্মা বহুমুখী সেতুর নির্মাণের দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তার সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের মেধা, প্রজ্ঞা, সততা এবং নির্ভরশীলতার প্রতিফলন রেখেছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন দিবালোকের মতো বাস্তবতা। সেতুটির নির্মাণের সময় যেমন সেনাবাহিনী সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে তেমনি পরবর্তীকালেও সম্পৃক্ত থাকবে। যমুনা নদীর ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতুর নিরাপত্তাকল্পে যেভাবে যমুনা পাড়ে গড়ে উঠেছে বঙ্গবন্ধু সেনানিবাস, সেভাবেই পদ্মার উভয় পাড়ে তৈরি হয়েছে শেখ রাসেল সেনানিবাস (মাওয়া-জাজিরা)। পদ্মা সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেতু কর্র্তৃপক্ষ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে চুক্তি : জাতীয় নিরাপত্তা ও আর্থসামাজিক মূল্যায়নে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি বাংলাদেশের এই পর্যন্ত সর্ববৃহৎ ভৌত অবকাঠামো। এই সেতুর সঙ্গে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জাতি হিসেবে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প প্রভাসিত। এ পরিপ্রেক্ষিতে পদ্মা সেতুর ওপর নির্মাণকালীন এবং নির্মাণ-পরবর্তী যেকোনো ঝুঁকি বা হুমকি জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচ্য। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে শুধু সংযোগই করবে না, এটি এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ককে যুক্ত করবে। অন্যদিকে পায়রা ও মোংলা বন্দরসহ দক্ষিণের সব উৎপাদনশীল কলকারখানা, সংস্থা, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ জাতীয় অর্থনীতি উন্নয়নে অভাবনীয় ভূমিকা রাখবে। কাজেই বাংলাদেশের অহংকার এবং জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের বাহক এই বৃহৎ প্রকল্পের ওপর নির্মাণকালীন এবং নির্মাণ-পরবর্তী নাশকতা পরিকল্পনার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া সমীচীন হবে না। প্রকল্পের শুরু থেকেই প্রকল্প কাজে নিয়োজিত দেশি-বিদেশি (সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৯৬ জন বিদেশি নাগরিক একই সময়ে ছিলেন) গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষতিসাধন, প্রকল্প এলাকার ভেতর শ্রমিক অসন্তোষ, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অতিমূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী ও সরঞ্জামাদি পাচার অথবা ক্ষতিসাধন, সেতুসংলগ্ন অথবা নদী শাসন এলাকা হতে অবৈধ বালু উত্তোলন, ব্রিজের পিলারে নৌযানসমূহের ধাক্কা, প্রকল্প এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে মাদকের প্রভাব ইত্যাদি সম্ভাব্য ঘটনাসমূহ প্রকল্পের ওপর প্রত্যক্ষ হুমকি ছিল। এর পাশাপাশি পদ্মা সেতু প্রকল্প এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, প্রকল্পের মালামাল পরিবহনে যানজট এবং অবৈধ চাঁদা আদায়, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, শীতকালে নদীর নাব্য হারানোর মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাও পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজকে বিঘ্নিত করার সম্ভাবনা ছিল।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বাংলাদেশ সেতু কর্র্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে এ নিয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি মোতাবেক সেনাবাহিনী কর্র্তৃক সম্পাদিত নিরাপত্তার দায়িত্বসমূহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এখানে তুলে ধরা হলো

১. মাওয়া-জাজিরা ও নদীপথে নিরাপত্তা : মাওয়া প্রান্তে অবস্থিত পদাতিক ব্যাটালিয়নটি মাওয়া প্রান্তে ১নং পিলার হতে ধলেশ্বরী ব্রিজ পর্যন্ত ৭৭ বর্গকিলোমিটার এবং জাজিরা প্রান্তের পদাতিক ব্যাটালিয়ন পদ্মা ব্রিজের ৪১নং পিলার হতে পাচ্চর পর্যন্ত ১৩২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দিনে ও রাতে সার্বক্ষণিক সরাসরি নজরদারির মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসছে। অন্যদিকে রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন সেতুর পূর্বে এবং পশ্চিমে ৬ কিলোমিটার নদীপথের নিরাপত্তা বিধান করে আসছে।

২. শ্রমিক অসন্তোষ দমন : ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে খাবারের মান উন্নয়ন, সঠিক সময়ে বেতনভাতা প্রদান, নামাজের বিরতিসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। সেতু কর্র্তৃপক্ষ ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে নয়টি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা দমন করা হয়েছে।

৩. শ্রমিকদের নিরাপত্তা : পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান, চিকিৎসা সহায়তা এবং বাংলাদেশ সেতু কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কভিড ভ্যাকসিন দেওয়ার উদ্যোগ নেয় সেনাবাহিনী। এছাড়াও প্রকল্পের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কাজের সময় যাতে কোনো শ্রমিক সেফটি গিয়ার্সের অভাবে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার সম্মুখীন না হয় এ বিষয়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

৪. অগ্নিনির্বাপণ : প্রকল্প এলাকায় অগ্নিকাণ্ড রোধকল্পে নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণসামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রকল্প এলাকা ও তৎসংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং বড় ধরনের ক্ষতিসাধন থেকে জান ও মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

৫. নির্মাণসামগ্রী পাচার রোধ : সেনাসদস্যরা পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ছোট-বড় অসংখ্য পাচারকারী (রড, লোহার অ্যাঙ্গেল, ব্যাটারি, ক্রেনের তার এবং তৈল চুরি) আটক করে এবং তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। এর মাধ্যমে প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষতি পরিহার করা সম্ভব হয়।

৬. অবৈধ প্রবেশকারীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ : মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে স্থলপথ ও নদীপথে (মূল সেতু বরাবর চ্যানেল শুরুর পূর্ব পর্যন্ত) প্রয়োজনীয় জনবলসহ টহল পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধভাবে দেশি-বিদেশি প্রবেশকারীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড।

৭. অবৈধ বালু উত্তোলন এবং পদ্মা সেতুর ক্ষতি রোধ : জেলা প্রশাসন, সেতু কর্র্তৃপক্ষ ও পুলিশের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয়পূর্বক পদ্মা বহুমুখী সেতু এলাকায় নদীপথে প্রভাব বিস্তারসহ বালু উত্তোলন, নদীতে ড্রেজিং, পাইলিং, নোঙর করা ও প্রকল্প এলাকায় অবৈধ প্রবেশ রোধকল্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

৮. মাদক নিয়ন্ত্রণ : সেনাবাহিনীর টহল ও নিরাপত্তা জোরদারের মাধ্যমে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় মাদক কারবার সমূলে উৎপাটন করেছে সেনাবাহিনী।

৯. উদ্ধারকার্য : পদ্মা সেতুর কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের যেকোনো দুর্ঘটনায় উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে হাসপাতালে প্রেরণ এবং চিকিৎসা কার্যক্রম নিশ্চিত করছে সেনাবাহিনী।

১০. ইমার্জেন্সি রেসপন্স দল : মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু প্রকল্পের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও জনবলসহ ইমার্র্জেন্সি রেসপন্স দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

১১. ট্রাফিক ও যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ : পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকার ভেতরে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে জাজিরা ও মাওয়ায় সেতুসংলগ্ন অ্যাপ্রোচ রোড ও সার্ভিস এরিয়া এবং ঢাকা হতে মাওয়া ও জাজিরা হতে ভাঙ্গা পর্যন্ত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেছে।

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মানুষের একটি স্বপ্নের নাম জাতির সমৃদ্ধির প্রতীক। এ ধরনের একটি স্থাপনা রক্ষা করা আমাদের সবার পবিত্র দায়িত্ব। পদ্মা সেতুর সার্বিক নিরাপত্তায় পেশাদার ও দেশপ্রেমী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা তাই একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এছাড়াও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রজেক্টের কাজ এখনো চলমান রয়েছে। এই প্রবন্ধে পদ্মা সেতু নির্মাণাধীন সময়কালীন নিরাপত্তার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পদ্মা সেতু উদ্বোধন ও পদ্মা সেতুর নিরাপত্তার দায়িত্বে বাংলাদেশের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সেনাবাহিনীর ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দৃঢ়প্রত্যয়ী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত