যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ বছর আগে এক মামলায় যে রায়ে গর্ভপাতকে বৈধ করা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট তা পাল্টে দেওয়ার চিন্তা করছে; এমন এক নথি কয়েক সপ্তাহ আগে ফাঁস হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছিল দেশটিতে। গত শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ দশক আগেকার ‘রো বনাম ওয়েড’ নামে পরিচিত মামলার সেই যুগান্তকারী রায় সত্যিই পাল্টে দিল। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আদালত গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার বাতিল করে দিয়ে গর্ভপাতের অনুমোদন দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষমতা প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য মিসিসিপির রাজ্য সরকার গর্ভধারণের ১৫ সপ্তাহের পর গর্ভপাত নিষিদ্ধ করাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা এক মামলায় রাজ্য সরকারের পক্ষে রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা ১৯৭৩ সাল থেকে গর্ভপাতের যে সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করে আসছিলেন, তা কার্যত রহিত হয়ে যায়।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়, ‘১৯৭৩ সালের আইনে গর্ভধারণের পর ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহ সময়কালেও গর্ভপাত করার এখতিয়ার রাখা হয়েছে। এটি ভুল সিদ্ধান্ত। কারণ, সংবিধানে গর্ভপাতের অধিকারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা নেই। গর্ভপাতের অধিকার সংবিধানের আওতায় থাকতে পারে না এবং গর্ভপাত নিয়ন্ত্রণের অধিকার অবশ্যই মানুষের এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত করা উচিত।’
বিবিসি জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টে এখন রক্ষণশীল বিচারকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার রহিত করার পক্ষে মতামত দেন ছয়জন বিচারক, বিপক্ষে দেন তিনজন। ধারণা করা হচ্ছে, এই রায়ের পর অর্ধেকের বেশি অঙ্গরাজ্যে গর্ভপাত নিষিদ্ধ অথবা এটির ওপর নানারকম বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তাৎক্ষণিকভাবে গর্ভপাত নিষিদ্ধ হবে; ইতিমধ্যে এমন আইন পাস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি অঙ্গরাজ্য। এ-বিষয়ক এক বেসরকারি জরিপে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যুক্তরাষ্ট্রে সন্তানধারণে সক্ষম ৩ কোটি ৬০ লাখ নারী গর্ভপাতের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।
অবশ্য দেশটির দক্ষিণপন্থি ও ধর্মীয় রক্ষণশীলদের জন্য এই সিদ্ধান্ত অনেক বড় বিজয়। এই ঘরানার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী ১৯৭৩ সালে গর্ভপাতকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী দল রিপাবলিকান পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা ও দেশটির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন।
অন্যদিকে দেশটির সরকারি দল ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতারা নিন্দা জানিয়েছেন এ সিদ্ধান্তের। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সুপ্রিম কোর্টের এ রায়কে মৌলিক স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ বলে উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের (প্রতিনিধি পরিষদ) স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়কে ‘নির্মম’ উল্লেখ করে এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা এখন তাদের মায়েদের চেয়ে কম স্বাধীনতা ভোগ করছে।’ তবে যুক্তরাষ্ট্রের নারী অধিকার সংগঠন দ্য আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন এক টুইটে বলেছে, ‘আদালত কী বলেছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; কারণ, কাউকেই তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাচ্চা নিতে বাধ্য করা উচিত নয়। গর্ভপাত নারীদের অধিকার এবং এই অধিকার আদায়ের জন্য আমরা এর জন্য লড়াই বন্ধ করব না।’
এদিকে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে, তাকে ‘নিষ্ঠুর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। পাশাপাশি এই রায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ শুরু করতে অধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। হোয়াইট হাউজে দেওয়া এক ভাষণে বাইডেন বলেন, ‘আজকের দিনটি আমাদের ইতিহাসের একটি দুঃখের দিন। আদালত মানুষের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, যা আমরা আগে কখনো দেখিনি। এই রায় এতটাই নিষ্ঠুর যে এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একজন নারী ও তরুণীরা ধর্ষকদের সন্তানও জন্ম দিতে বাধ্য থাকবে।’
