হিন্দু-ফ্যাসিবাদী প্রতিষ্ঠান হয়ে যাচ্ছে ভারত

আপডেট : ২৯ জুন ২০২২, ১০:৪১ পিএম

কয়েক মাস ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দ্বারা শাসিত রাজ্যগুলোতে কর্র্তৃপক্ষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সন্দেহে মুসলমানদের বাড়ি, দোকান এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া শুরু করেছে। এই রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীরা তাদের নির্বাচনী প্রচারে গর্বভরে এই নীতিটি তুলে ধরেছেন।

আমার মনে হয়েছে এটি একটি গভীর ত্রুটিপূর্ণ ও ভঙ্গুর গণতন্ত্রের প্রকাশ্য এবং বেপরোয়াভাবে একটি অপরাধী, হিন্দু-ফ্যাসিবাদী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হওয়ার মুহূর্তটিকে চিহ্নিত করে, যার পেছনে রয়েছে ব্যাপক জনসমর্থন। আমরা দৃশ্যত এখন হিন্দুধর্মীয় ব্যক্তিত্বের লেবাসধারী গু-াদের দ্বারা শাসিত হচ্ছি। তাদের নীতি অনুযায়ী মুসলমানরা এক নম্বর গণশত্রু।

অতীতে ভারতে মুসলিমদের সাজা দেওয়া হয়েছে হত্যা, মারধর, পরিকল্পিত খুন, হেফাজতে হত্যা, সাজানো পুলিশ ‘এনকাউন্টার’ এবং মিথ্যা অজুহাতে কারারুদ্ধ করে। তাদের বাড়িঘর এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া এই তালিকায় যোগ করা একটি নতুন এবং অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র মাত্র।

মিডিয়ায় যেভাবে এ ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত, প্রচারিত হয়েছে তাতে মনে হয়েছে বুলডোজারটির পেছনে রয়েছে প্রতিশোধ নেওয়ার এক ধরনের ঐশ্বরিক শক্তি। ‘শত্রুকে চূর্ণ করতে’ ব্যবহৃত বিশাল ধাতব নখরওয়ালা এ ভয়ংকর যন্ত্রটি দানব হত্যায় ব্যস্ত এক পৌরাণিক ঈশ্বরের যান্ত্রিক, কমিক-স্ট্রিপ সংস্করণ হিসেবে চিত্রিত হচ্ছে। এটি যেন নতুন, প্রতিশোধে উন্মুখ হিন্দুজাতির মন্ত্র হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তার সাম্প্রতিক ভারত সফরের সময় একটি বুলডোজারের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন। তিনি ঠিক কী করছেন এবং এর মাধ্যমে কাকে সমর্থন করছেন তা জনসন জানতেন না এটা বিশ্বাস করা কঠিন। তা ছাড়া কেন একজন সরকারপ্রধান রাষ্ট্রীয় সফরের সময় বুলডোজারের পাশে ছবি তোলার মতো উদ্ভট কিছু করবেন?

সরকারি কর্র্তৃপক্ষ তাদের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলছে, তারা মুসলমানদের টার্গেট করছে না এবং শুধু অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনা ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এটা পৌর কর্র্তৃপক্ষের অবৈধ স্থাপনা অপসারণ কর্মসূচি মাত্র। এটা স্পষ্ট যে, এই যুক্তিটা কাউকে বোঝানোর জন্য দেওয়া হয়নি। এটা বলা হচ্ছে নিছক তামাশা করা ও আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য। সরকারি কর্র্তৃপক্ষ এবং বেশির ভাগ ভারতীয় জানেন প্রতিটি ভারতীয় শহরের বেশির ভাগ নির্মাণই হয় অবৈধ বা আধা বৈধভাবে। বিনা নোটিসে, কোনো আপিল বা শুনানির সুযোগ ছাড়াই নিছক শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে মুসলিমদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া একযোগে অনেক কিছু অর্জন করে।

বুলডোজার যুগের আগে মুসলমানদের শাস্তি দেওয়া হতো হামলাকারী গণবাহিনী এবং পুলিশের মাধ্যমে। তারা হয় শাস্তিতে অংশ নিত বা মুখ ফিরিয়ে থাকত। ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ায় শুধু পুলিশ নয়, থাকছে পৌর কর্র্তৃপক্ষ, মিডিয়া ও আদালত। মিডিয়াকে অবশ্যই উপস্থিত থেকে ‘দানব-হত্যা’র দৃশ্য সম্প্রচার করতে হবে। আর আদালতকে হস্তক্ষেপ না করে মুখ ফিরিয়ে থাকতে হবে। এসবের মাধ্যমে মুসলমানদের বোঝানো হচ্ছে : তোমরা একা। কোনো সাহায্য আসবে না। কোনো আপিল-আদালত নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যা এই পুরনো গণতন্ত্রের ‘চেক এবং ব্যালেন্সের’ অংশ ছিল তা এখন তোমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সম্পদ প্রায় কখনোই এভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয় না। উদাহরণস্বরূপ ১৬ জুন, বিজেপি সরকারের নতুন সেনা নিয়োগ নীতিতে ক্ষুব্ধ কয়েক হাজার যুবক উত্তর ভারতজুড়ে হিংসাত্মক তাণ্ডব চালায়। তারা ট্রেন ও যানবাহন জ্বালিয়ে দিয়েছে, রাস্তা অবরোধ করেছে এবং এক শহরে বিজেপি অফিসও পুড়িয়ে দিয়েছে। তাদের অধিকাংশই অমুসলিম। তাই তাদের বাড়িঘর ও পরিবার নিরাপদ থাকবে। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের দুটি সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি দৃঢ়ভাবে দেখিয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের ভোটের প্রয়োজন নেই। সুতরাং, কার্যত আমরা এক ধরনের ভোটাধিকার হরণের মুখোমুখি। এর প্রভাবগুলো হবে বিপজ্জনক। কারণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলে আপনার আর কোনো গুরুত্ব থাকবে না। আপনি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবেন। আপনি ব্যবহৃত হবেন ও অন্যায়ের শিকার হবেন এটাই আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি।

বিজেপির উচ্চপদস্থ নেতারা প্রকাশ্যে মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র সবকিছুকে অবমাননা করার পরেও দলটি তার মূল সমর্থন ভিত্তির সমর্থন হারায়নি বা তাদের তরফে অর্থপূর্ণ সমালোচনার সম্মুখীন হয়নি।

ওইসব অবমাননার প্রতিক্রিয়ায় ভারতের মুসলমানদের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য প্রতিবাদ হয়েছে। প্রতিবাদগুলো বোধগম্য, কারণ ব্যাপক সহিংসতা এবং নৃশংসতার পরিপ্রেক্ষিতেই তা হয়েছে। তবে অনিবার্যভাবে প্রতিবাদকারীদের মধ্যে কেউ কেউ ধর্ম অবমাননা (ব্লাসফেমি) আইনের আহ্বানও জানিয়েছে। বিজেপি সম্ভবত খুশি মনেই এ আইন পাস করতে চাইবে। কারণ তখন হিন্দু জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে প্রায় সব মন্তব্যও সেই আইনের অধীনে অপরাধী হতে পারে। এটি কার্যকরভাবেই সব সমালোচনাকে স্তব্ধ করবে। নিশ্চুপ করে দেবে ভারত যে রাজনৈতিক ও আদর্শিক গহ্বরে পতিত হচ্ছে সে সম্পর্কে সব বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনাকেও। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলেমিনসহ (এআইএমআইএম) অন্যান্য কিছু প্রতিবাদকারী ধর্ম অবমাননায় ফাঁসি দেওয়া ও শিরেদ করারও আহ্বান জানিয়েছে। এতে এই মুসলমানদের সম্পর্কে হিন্দু ডানপন্থিদের জোরেশোরে তুলে ধরা ভাবমূর্তিই পোক্ত হয়। উঁচু দেয়ালের দুপাশ থেকে এই অবমাননা ও প্রাণনাশের হুমকির ঝড়ের মধ্যে কোনো সুষ্ঠু সংলাপ সম্ভব নয় বলেই মনে হয়।

মুসলিমদের প্রতিবাদের পর যে মেরুকরণ হয়েছে তা বরং বিজেপির প্রতি সমর্থন বাড়িয়েছে। অবমাননাকর মন্তব্যকারী মুখপাত্রকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে দলীয় কর্মীরা প্রকাশ্যেই তার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলেই মনে হচ্ছে।

আজ ভারতে, আমরা রাজনৈতিক ‘পোড়ামাটি নীতি’ ধরনের পরিস্থিতিতে বাস করছি। গড়ে তুলতে বছরের পর বছর লেগেছে এমন প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এটা হতবুদ্ধি করে দেয়। নতুন প্রজন্মের তরুণরা সম্পূর্ণভাবে মগজ ধোলাই হয়ে বড় হচ্ছে। দেশের ইতিহাস বা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। প্রায় ৪০০ টিভি চ্যানেল, অগুনতি ওয়েবসাইট এবং সংবাদপত্রের সমন্বয়ে গঠিত একটি মিডিয়ার সাহায্যে ক্ষমতাসীনরা নিরন্তর গোঁড়ামি এবং বিদ্বেষের ঢাক বাজিয়ে চলেছে। হিন্দু-মুসলিম উভয় দিকের ঘৃণা ছড়ানো চিরাচরিত চরিত্রগুলো এতে উসকানি দিয়ে যাচ্ছে।

হিন্দু ডানপন্থি দলের ক্যাডারদের মধ্যে একটি নতুন, আক্রমণাত্মক অতি-ডান অংশ একটি অস্থিরতা প্রদর্শন করছে। তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য মোদি সরকার ক্রমেই বেশি করে চাপের মুখে পড়ছে। কারণ এরাই বিজেপির মূল সমর্থন ভিত্তি। সোশ্যাল মিডিয়ায় মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালানোর জন্য খোলামেলা আহ্বান দেখা এখন নিয়মিত ঘটনা। আমরা যেখানে পৌঁছে গেছি সেখান থেকে ফেরা সম্ভব নয়। আমরা যারা এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি তাদের এবং বিশেষ করে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়কে এখন যা ভাবতে হবে তা হচ্ছে, কীভাবে আমরা এ থেকে বাঁচতে পারি? কীভাবে আমরা এটা ঠেকাতে পারি? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ আজ ভারতে যতই শান্তিপূর্ণ হোক, প্রতিরোধকেও সন্ত্রাসবাদের মতো জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আলজাজিরা অনলাইন থেকে রূপান্তর : আবু ইউসুফ

লেখক ভারতের প্রখ্যাত লেখক, আন্দোলনকর্মী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত