অধ্যক্ষ হেনস্তায় পদ গেল আ.লীগ নেতা শিক্ষকের

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২২, ০১:৩৩ এএম

নড়াইল সদরের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা দেওয়ার ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিছালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ওই কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আকতার হোসেন টিংকুকে দলীয় পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট অচিন চক্রবর্ত্তী এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই সঙ্গে আগামী তিন দিনের মধ্যে তাকে লিখিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে শিক্ষক হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার দেশজুড়ে সমাবেশ করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। এছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করে।

আকতার হোসেন টিংকুকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতির চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আপনাকে (আকতার হোসেন) কারণ দর্শানোর নোটিস প্রদান করা যাচ্ছে যে, গত ১৮ জুন মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের এক ছাত্রের মোবাইলে (ফেসবুক) স্ট্যাটাস নিয়ে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। আপনি (আকতার হোসেন) উক্ত কলেজের একজন শিক্ষক এবং ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় আপনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আপনার উপস্থিতিতে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরিয়ে বের করে আনা হয়; যা নিন্দনীয়, শিক্ষক সমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করার শামিল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় খবরে আপনাকে জড়িত করে সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। সে কারণে আপনি এ দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। আমরা মনে করি আপনি, সভাপতি হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।’

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘উপরোক্ত কারণে আপনাকে এই পত্র পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে লিখিত কারণ দর্শাতে বলা গেল। আজ (৩০ জুন) থেকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া গেল। ইউনিয়নের সহসভাপতি মশিয়ার রহমানকে দায়িত্ব দেয়া গেল।’

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে আকতার হোসেন টিংকু জানিয়েছেন, তিনি ওই ঘটনায় জড়িত নন; বরং তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু একটি পক্ষ উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাকে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়াচ্ছে।

এদিকে অধ্যক্ষ হেনস্তার ঘটনায় জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ৩০ জুন দেওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে আজ শনিবার নির্ধারণ করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জুবায়ের হোসেন চৌধুরী। অন্যদিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রিয়াজুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত দলের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিনও আজ শনিবার নির্ধারণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সাময়িক বহিষ্কৃত মুখপাত্র নূপুর শর্মাকে ‘সমর্থন জানিয়ে’ ফেইসবুকে পোস্ট দেন মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের এক ছাত্র। ওই ছাত্রের বিরুদ্ধে ‘ব্যবস্থা গ্রহণে দেরি করার’ অজুহাতে গত ১৮ জুন কয়েক শ পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতেই কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়।

দেশজুড়ে প্রতিবাদ অব্যাহত: শিক্ষক হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার দেশব্যাপী সমাবেশ করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। এ ছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করে।

ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক চত্বর, মিরপুর ২ নম্বর সেক্টরের ন্যাশনাল বাংলা স্কুল প্রাঙ্গণ ও দনিয়া ফুটওভার ব্রিজ এলাকা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশাল, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলা শহরেও জোটের ব্যানারে প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করা হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একের পর এক শিক্ষকদের ওপর হামলা হচ্ছে। আজও (গতকাল) জুমার নামাজের পর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক রতন সিদ্দিকীর বাড়িতে উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠী হামলা করেছে। যে শিক্ষকদের ওপর হামলা হচ্ছে, তারা বেশিরভাগই হিন্দুসম্প্রদায়ের লোক। এটা পরিষ্কার যে একটা ধর্মীয় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে এবং বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এসব ঘটছে। সরকারকে কঠোরভাবে এই উগ্রবাদীদের প্রতিহত করতে হবে। নইলে স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হুমকির মুখে পড়বে।’

দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে প্রতিবাদী কর্মসূচি অব্যহত থাকবে বলেও জানান গোলাম কুদ্দুছ।

শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে গতকাল বিকেলে ‘বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা রুখে দাঁড়াও’ স্লোগান নিয়ে এবং শিক্ষক হত্যা-নিপীড়নের বিচার দাবিতে সমাবেশ করে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ’। এই আয়োজনে প্রতিবাদী নাটক, গান, আবৃত্তি পরিবেশন করেন শিল্পীরা।

শাহবাগে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিবাদ সমাবেশ করে সারা দেশে সংখ্যালঘু শিক্ষক হত্যা এবং নির্যাতনের বিচার দাবি জানিয়েছে। এ সময় বক্তারা বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে সাম্প্রদায়িকগোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করছে আওয়ামী লীগ সরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত