সরকারের ৩৫৫ কোটি টাকা পাওনা মওকুফ চায় এসইসি

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২২, ০১:৪৯ এএম

স্থানীয়ভাবে ‘সি চেক’ (ভারী রক্ষণাবেক্ষণ) করাকে কেন্দ্র করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে ২০১৬ সালে বন্ধ হয়ে যায় বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় এয়ারলাইনস ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ (বিডি) লিমিটেড। দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকা এই এয়ারলাইনসটি নতুন করে চালুর উদোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেবিচকের বিপুল পরিমাণের পাওনা ও চলতি মূলধন সংকট। এমন পরিস্থিতিতে ইউনাইটেড এয়ারকে পুনরুজ্জীবিত করতে এয়ারলাইনসটির কাছে সরকারের পাওনা মওকুফের অনুরোধ জানিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)।

বর্তমানে ইউনাইটেড এয়ারের কাছে বেবিচকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩৫৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে সারচার্জ ২৯২ কোটি টাকা। গত ২৯ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিবকে দেওয়া এক চিঠিতে কোম্পানিটির কাছে বেবিচকের পাওনা মওকুফের অনুরোধ জানান এসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। এর আগে গত বুধবার এয়ারলাইনসটির আবেদনের প্রেক্ষিতে বেবিচকও বকেয়া মওকুফের প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করেছে। এদিকে ইউনাইটেড এয়ারসহ দেশের বিভিন্ন এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলোর কাছে সরকারের পাওনা পরিশোধের ব্যর্থতায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়ে বেবিচকে চিঠি পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

২০০৭ সালের জুলাইয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। ২০১২ সালে দেশি-বিদেশি মোট ৩৬টি রুটে ইউনাইটেডের ফ্লাইট কার্যক্রম চালু ছিল। বেবিচকের সঙ্গে বিবাদের কারণে ২০১৪ সাল থেকেই ইউনাইটেড এয়ারের উড়োজাহাজগুলো গ্রাউন্ডেড হতে থাকে। ২০১৫ সালের শেষ দিকে সচল উড়োজাহাজের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। আর ২০১৬ সালের ৫ মার্চ থেকে ইউনাইটেড এয়ারের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মীরা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যান। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৬ সালে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আবারও চালুর উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ। তবে বেবিচক অনাপত্তিপত্র না দেওয়ায় সে প্রক্রিয়াও থমকে যায়। ফলে ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে এয়ারলাইনসটির কার্যক্রম। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ১০টি উড়োজাহাজের সবগুলোই গ্রাউন্ডেড হয়ে আছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বন্ধ থাকা বিভিন্ন কোম্পানিকে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে এসইসি। কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও সে সময়কার পরিচালকদের বাদ দিয়ে এভিয়েশন ব্যবসায় অভিজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমকে চেয়ারম্যান করে ৮ জন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয় কমিশন। নতুন পরিচালনা পর্ষদ এয়ারলাইনসটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ওয়াহিদুল আলমের নেতৃত্বে থাকা পর্ষদ কোম্পানিটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে বিভিন্ন পরিকল্পনার পাশাপাশি বেবিচকের সঙ্গে আলোচনায় বসে। পরবর্তীকালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে বেবিচকে পরিকল্পনা প্রতিবেদন জমা দেয় তারা। পাশাপাশি ইউনাইটেড এয়ারের কাছে বেবিচকের পাওনা মওকুফের আবেদনও জানায়। তাদের এ আবেদনটি মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করেছে বেবিচক।

এমন পরিস্থিতিতে এসইসি চেয়ারম্যান অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিবকে ইউনাইটেড এয়ারের কাছে বেবিচকের পাওনা পুরোপুরি মওকুফ কিংবা কিস্তিতে পরিশোধের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেন।

চিঠিতে এসইসি চেয়ারম্যান জানান, ইউনাইটেড এয়ারের ১ লাখ ৬০ হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগকৃত অর্থ সুরক্ষিত করার স্বার্থে এবং এয়ারলাইনসটি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে কমিশন ইতিমধ্যে ৮ সদস্যের স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে। নতুন পর্ষদের সঙ্গে বেবিচকের সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাওনা টাকার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেটের (এওসি) জন্য আবেদন করতে পারবে। বর্তমানে কোম্পানিটির কাছে বেবিচকের পাওনা রয়েছে ৩৫৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে মূল পাওনা ৫৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আর ভ্যাট ও আয়কর মিলিয়ে ৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ২৯২ কোটি টাকা সারচার্জ হিসেবে পাওনা রয়েছে।

এসইসি জানিয়েছে, নতুন পর্ষদ এয়ারলাইনসটি চালুর জন্য উড়োজাহাজগুলোর কারিগরি মূল্যায়ন করেছে এবং একটি ব্যবসায়িক প্ল্যান তৈরি করেছে। বিগত পাঁচ বছরের না করা আর্থিক অডিটের কাজ চলছে। এমতাবস্থায় বিপুলসংখ্যক শেয়ারহোল্ডারের স্বার্থ বিবেচনায় বেবিচকের পাওনা পুরোপুরি মওকুফ করা যেতে পারে। যদি সব বকেয়া মওকুফ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সারচার্জ মওকুফ করে মূল পাওনা ১০ বছরর কিস্তিতে পরিশোধ করার অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানান এসইসি চেয়ারম্যান। উড্ডয়ন আরম্ভ করার এক বছর পর থেকে কিস্তি পরিশোধ করার সময়সীমা শুরুর অনুরোধ জানানো হয়েছে। উচ্চ হারে সারচার্জ নেওয়ার নজির বিশ্বের কোথাও নেই বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন শিবলী রুবাইয়াত। 

উল্লেখ্য, বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইনসটিকে ২০১৬ সালের ১ জুন নতুন করে সাতটি উড়োজাহাজ সংগ্রহের জন্য ৪০১ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমতি দেয় এসইসি। এজন্য সিঙ্গাপুর ও মালায়েশিয়াভিত্তিক তিন কোম্পানির বিমান সরবরাহের বিপরীতে অভিহিত মূল্য ১০ টাকা দরে মোট ৪০ কোটি শেয়ার নেওয়ার কথা ছিল। তবে এসইসির অনুমোদন প্রাপ্তির তিন বছরেও বেবিচকের অনাপত্তিপত্র না পাওয়া ও কোম্পানিটির শেয়ারের সর্বনিম্ন দরের কারণে বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। শেয়ার মূল্য কমে যাওয়ায় শেয়ারের পরিবর্তে নগদ অর্থে উড়োজাহাজ সরবরাহে নতুন করে শর্ত দেয় কোম্পানিগুলো।

কোম্পানিটি বন্ধ থাকায় বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়াও ভেস্তে যায়। ২০১৭ সালের ১৬ জুন বন্ড ইস্যু করে কোম্পানিটিকে ২২৪ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমতি দেয় এসইসি। রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) পিছিয়ে আসায় বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে কোনো অর্থই সংগ্রহ করতে পারেনি ইউনাইটেড এয়ার।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত