জুলাইয়ের দ্বিতীয়ার্ধে ফের বন্যার ঝুঁকিতে সিলেট-রংপুর

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২২, ০৬:৩৬ এএম

স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার ধকল কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে সিলেট-সুনামগঞ্জসহ দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ। গত মাসে উজানে থেকে নেমে আসা ঢল আর অতিভারী বর্ষণে প্লাবিত হয় দেশের ১৮ জেলার বিভিন্ন এলাকা। এর মধ্যে গত মে মাসেও এক দফা বন্যার কবলে পড়ে সিলেট বিভাগের মানুষ। দুই দফার বন্যায় গতকাল রবিবার সিলেট বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডায়রিয়াসহ বন্যাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ৭৩১ জন। বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার সড়ক, বিধ্বস্ত হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ হাজারের মতো বাড়িঘর। প্রত্যক্ষভাবে বন্যার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে অর্ধ কোটির বেশি মানুষ। সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় বানভাসি এসব মানুষ যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তখন দুই সপ্তাহের মধ্যেই আরেক দফা বন্যার ঝুঁকির কথা শোনাচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। দ্বিতীয় দফার বন্যার শুরুতেই অবশ্য বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জুলাই মাসে একাধিক দফায় বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছিল।

গতকাল দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে, জুলাই মাসের দ্বিতীয়ার্ধে ভারী বৃষ্টির কারণে দেশের উত্তরের রংপুর, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটি ঢাকার ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রে ও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নিয়মিত বৈঠক করে। অধিদপ্তরের পরিচালক ও বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান মো. আজিজুর রহমানের সভাপতিত্ব বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। আজিজুর রহমান বলেন, জুলাই মাসের প্রথমার্ধে দেশের প্রধান নদ-নদীসমূহে স্বাভাবিক প্রবাহ বিরাজমান থাকতে পারে। মাসের দ্বিতীয়ার্ধে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মৌসুমি ভারী বৃষ্টিপাতজনিত কারণে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

চলতি মাসে সামগ্রিকভাবে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে জানিয়ে পরিচালক বলেন, এ মাসে বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুটি বর্ষাকালীন লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি মৌসুমি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। জুলাই মাসে দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে এক থেকে দুদিন বিজলি চমকানোসহ মাঝারি ধরনের বজ্রঝড় হতে পারে। এ ছাড়াও সারা দেশে দুই থেকে তিন দিন বিজলি চমকানোসহ হালকা বজ্রঝড় হতে পারে। এ মাসে দেশে বিচ্ছিন্নভাবে মৃদু (৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এ মাসে দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।

চলতি মাসের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জুন মাসে সারা দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এবং ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে কম এবং চট্টগ্রাম বিভাগে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। জুন মাসে দৈনিক সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ৩০৪ মিলিমিটার সিলেটে (১৮ জুন) রেকর্ড করা হয়।

তবে এই দুই সপ্তাহের মধ্যে বন্যার শঙ্কা নেই। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে উজানের অববাহিকাগুলোর অনেক স্থানে ভারী বৃষ্টিপাত হলেও তিস্তা ছাড়া কোনো নদীর পানি বাড়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে এই কয়েক দিন দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে জানানো হয়, আগামী ২ সপ্তাহে বিশেষ করে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে উজানের অববাহিকাগুলোর অনেক স্থানে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটার সম্ভাবনা কম। এই সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলাসহ অন্য প্রধান নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বিরাজমান থাকতে পারে। এই সময়ে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে এই সময়ে উজানের হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গে স্বল্পমেয়াদি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রেক্ষিতে তিস্তা নদীর পানি সময়বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুইয়া বলেন, আমাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দুই সপ্তাহ যেসব নদীর পানি কমছে তা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে সিলেটসহ বেশিরভাগ এলাকার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। তবে উজানে কিছু বৃষ্টি হতে পারে। এতে তিস্তার পানি বাড়তে পারে। তখন দেশের অভ্যন্তরে ভারী বর্ষণ হলে কিছু কিছু এলাকা প্লাবিত হতে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার পরিবার পাবে ১০ হাজার করে টাকা

সিলেট থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় সিলেট জেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্রথম দফায় ৫ হাজার পরিবার পাবে ১০ হাজার টাকা করে। যাদের ঘরবাড়ি ভেঙেছে, তারা এই টাকা পাবে। পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যরাও এ ধরনের সহায়তা পাবে। প্রথম দফায় ৫ হাজার পরিবারকে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ৫ কোটি টাকা অনুদানের চেক ইতিমধ্যে সিলেট জেলা প্রশাসনে পৌঁছেছে। গতকাল রবিবার সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আজ সোমবার থেকেই টাকা বিতরণ শুরু হবে। বন্যায় যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের এই টাকা দেওয়া হবে।

গত ১৫ জুন থেকে সিলেটে বন্যা দেখা দেয়। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সিলেট জেলার প্রায় ৪১ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৫ লাখ পরিবারের ৩০ লাখ মানুষ পানিবন্দি ছিল। বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো অনেকে বাড়িঘরে ফিরতে পারেনি। কারও ঘর ভেঙেছে, কারও বাড়িতে এখনো পানি। 

সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক জানান, বর্তমানে ৩৫ হাজার ৬৮৫ জন মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে। জেলায় মোট ৬৫৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ লাখ ৩০ হাজার ৬৩২ জন লোক আশ্রয় গ্রহণ নিয়েছিল। বেশিরভাগ মানুষ নিজের বাড়িতে ফিরলেও রবিবার পর্যন্ত ৪১৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার মানুষ অবস্থান করছিল। এ ছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ৩১ হাজার ৯৭টি গবাদিপশু নিয়ে এসেছিল বন্যাকবলিতরা। বর্তমানে ৫৩০টি গবাদিপশু আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত