গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে পাওনা আদায়

সমঝোতার অভিযোগ, আইনজীবীর ব্যাংক হিসাব স্থগিত

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২২, ০৬:৪৪ এএম

চাকরিচ্যুত শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা আদায়ে গ্রামীণ টেলিকমের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. ইউনূসের সঙ্গে ‘আর্থিক-সমঝোতা’র অভিযোগ ওঠায় কর্মচারীদের আইনজীবী ইউসুফ আলীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ (স্থগিত) করা হয়েছে।

অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার বিএফআইইউ’র (বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আমার ৬টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে বলে আজ (গতকাল) সকালে ব্যাংক থেকে জানতে পেরেছি। এর মধ্যে আমার ব্যক্তিগত হিসাব ৩টি, যৌথ হিসাব ২টি ও একটি আমাদের চেম্বারের।’

ড. ইউনূসের সঙ্গে আঁতাত করে গ্রামীণ টেলিকম থেকে ১২ কোটি টাকা নিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের বঞ্চিত করে মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে বলে অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। শ্রমিক-কর্মচারীরা তাদের সমুদয় পাওনা যথাযথভাবে পাচ্ছেন কি না গত বৃহস্পতিবার এক আদেশে এ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জানতে চায় বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ। আগামী ২ আগস্ট গ্রামীণ টেলিকম ও শ্রমিক-কর্মচারী পক্ষের আইনজীবীদের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের কথা রয়েছে।

হাইকোর্ট বৃহস্পতিবার বিস্ময় ও উষ্মা প্রকাশ করে বাদীপক্ষের আইনজীবীর কাছে কৈফিয়ত চায়। একই সঙ্গে ১২ কোটি টাকার ফি নেওয়ার বিষয়ে উষ্মা প্রকাশ করে আদালত। হাইকোর্ট বলে, যদি আইন অনুযায়ী কিছু (উভয়পক্ষের বোঝাপড়া) না হয়ে থাকে তাহলে এটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। জবাবে ইউসুফ আলী বলেন, তিনি ফি নিয়েছেন। অর্থ নিয়ে আঁতাতের কথাকে গুজব ও বানোয়াট বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গতকাল আইনজীবী ইউসুফ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা সব নথি প্রস্তুত করে  পর্যবেক্ষণ করেছি। সেখানে ত্রুটি নেই। নির্ধারিত সময়েই হাইকোর্টে এটি জমা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু ফি নিয়েছি। ১৫০ জনের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী মামলা করেছেন। ধরুন একজন কর্মচারী সাড়ে চার কোটি টাকা পাবে। এর থেকে ৬ শতাংশের হিসাবে ২৪ লাখ টাকা আইনজীবী ও অন্যান্য খরচ বাবদ কোম্পানিকে দিয়েছেন। এভাবে সব কর্মচারীর দেওয়া মোট ২৫ কোটি টাকা কোম্পানি ট্রেড ইউনিয়নে জমা দিয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা আমার অ্যাকাউন্টে এসেছে। গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে আমি মামলা করেছি এটা আষাঢ়ে গল্প। ড. ইউনূসের কোম্পানি যথারীতি পুরো পাওনা টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছে।’

গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের উদ্দেশে ইউসুফ আলী বলেন, আমরা তথাকথিত সামাজিক ব্যবসায়ী ড. ইউনূসকে পরাজিত করে গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিকবন্ধুদের প্রাপ্য ন্যায্য পাওনা আদায় করে দিয়েছি। তিনি বলেন, ‘যে মুহূর্তে আমরা শোষিত ও বঞ্চিত শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়ে তথাকথিত শান্তিতে নোবেলজয়ীর বিরুদ্ধে নতুন মামলার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আছি সে মুহূর্তে আমাদের বিরুদ্ধে তার (ড. ইউনূস) সঙ্গে আঁতাতের গুজব রটানো কেবল ড. ইউনূসের দোসরদের কাজ হতে পারে। প্রফেসর ইউনূসকে আমরাই বাধ্য করেছি শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধ করতে। তিনি গত ৫ বছরে শ্রমিকদের বঞ্চিত করার কোনো চেষ্টার ত্রুটি করেননি। কিন্তু আমাদের দক্ষতা ও নিরলস প্রচেষ্টার কাছে তারা পরাজিত হয়েছে।’ 

গ্রামীণ টেলিকমে ছাঁটাই ও পাওনা নিয়ে শ্রমিক-কর্মচারী ও শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্ট ও শ্রম আদালতে শতাধিক মামলা হয়। পাওনা পরিশোধ না করায় গ্রামীণ টেলিকমের অবসায়ন চেয়ে গত ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন। শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা ৪৩৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হবেÑ উভয়পক্ষের এমন সমঝোতা হলে গত ২৪ মে মামলা প্রত্যাহার করে নেয় শ্রমিক-কর্মচারী পক্ষ। অতঃপর পাওনা পরিশোধ শুরু করে গ্রামীণ টেলিকম। বৃহস্পতিবার উভয়পক্ষের আইনজীবীরা হাইকোর্টের এ কোম্পানি বেঞ্চকে জানান, ইতিমধ্যে আপসনামা ও চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিক-কর্মচারীদের ৩৮০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। চারজন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করায় তাদের ক্ষেত্রে ওয়ারিশান সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। এছাড়া চারজন বিদেশে থাকায় তাদের সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়ন করা যায়নি।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত