দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রায়ই আত্মহত্যার খবর শিরোনাম হয়ে থাকে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশে গড়ে প্রতিদিন ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। আর পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে বছরে গড়ে ১০ হাজার মানুষ ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষপান করে আত্মহত্যা করে। এর বাইরেও ঘুমের ওষুধ সেবন, ছাদ কিংবা উঁচু স্থান থেকে লাফিয়ে পড়া কিংবা রেললাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যাও যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যার এসব খবর যদি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিবেশন করা না হয় তাহলে ওই খবরের কারণেও আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে থাকে। গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত ‘রেসপন্সিবল রিপোর্টিং অন সুইসাইড’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশে আত্মহত্যাকারীদের বেশিরভাগের বয়স ২১-৩০ বছরের মধ্যে। যাদের অধিকাংশই আবার নারী।
২০১৭ সালে সারা দেশে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১০ হাজার ২৫৬টি। ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার। ২০১৯ সালে সারা দেশে ১০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছে। আর ২০২০ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৩৬। আর সম্প্রতি প্রকাশিত আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।
অনুষ্ঠানে ‘আত্মহত্যার সংবাদ : কেমন হওয়া উচিত’- এ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, “প্রায় সময়েই সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয় ‘পরীক্ষায় ফেল করে আত্মহত্যা’, আর এ ধরনের শিরোনাম পরের বছরে পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্রটিকেই মূলত আত্মহত্যার উপায় বাতলে দেয়। কারণ, এই সংবাদের শিরোনামেই পরীক্ষায় ফেল করলে কী করতে হবে, সেটির একটি বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদটিতে আত্মহত্যার ঘটনায় সহমর্মিতা দেখাতে গিয়ে আত্মহত্যাকারীকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ‘নায়কোচিত’ ভূমিকায় রূপান্তর করা হয়। এমনকি এর ফল হয় ভয়াবহ।”
তিনি আরও বলেন, “আত্মহত্যা করলে ‘মৃত আমি’ অনেক সহমর্মিতা পাব, যা অনেকটা সামাজিক ন্যায়বিচারের বিকল্প হবে, এই বোধে ঘটতে পারে আরও নতুন আত্মহত্যা। সুতরাং আত্মহত্যা রোধে মিডিয়ার অনেক ভূমিকা রাখতে হবে।”
এই চিকিৎসক বলেন, ২০০৮ সালে হংকংয়ের মিডিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফু কে ডাব্লিও তার এক গবেষণাপত্রে উপস্থাপন করেন যে, হংকংয়ের চাইনিজ ও ইংরেজি ভাষায় প্রচারিত সংবাদপত্রগুলোতে আত্মহত্যার সংবাদগুলো প্রকাশ না করা বা প্রকাশ করলেও অত্যন্ত কম গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করায় সেদেশে আত্মহত্যার হার ও প্রবণতা কার্যকরীভাবে কমে গেছে।
ডা. হেলাল বলেন, “আত্মহত্যার সংবাদটি প্রথম পৃষ্ঠায় বা অন্যত্র খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রকাশ করা যাবে না। শিরোনামে এমন কোনো শব্দ বা বাক্যরীতি ব্যবহার করা উচিত নয় যা পাঠক বা দর্শককে উদ্দীপনার খোরাক দেয় আবার এমনভাবেও প্রকাশ করা যাবে না যে আত্মহত্যা একটি মামুলি স্বাভাবিক মৃত্যুমাত্র। যেমন ‘অপমান সইতে না পেরে রেললাইনে মাথা পেতে দিল অমুক’ বা ‘অভিমান করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন অমুক’ ইত্যাদি আলংকারিক বাক্যরীতির চাইতে কেবল সংক্ষিপ্ত শিরোনাম দেওয়া উচি’ ‘অমুকের আত্মহত্যা’।”
শিরোনামে ‘আত্মহত্যা’ শব্দ পরিহার করা উচিত : অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এনসিডি শাখার প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শহীদুল ইসলাম বলেন, “সারা বিশ্বেই আত্মহত্যা বেড়ে চলেছে। আমাদের দেশেও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। তবে আত্মহত্যা প্রতিরোধে মিডিয়াগুলো বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। আত্মহত্যার খবর প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পলিসি হলো শিরোনামে ‘আত্মহত্যা’ শব্দটি পরিহার করা। এটি হয়তো আমাদের গণমাধ্যমে হঠাৎ করেই সম্ভব না। তবে ধীরে ধীরে সেটি কমিয়ে আনতে হবে। সেক্ষেত্রে সাংবাদিকদেরই বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।”
