ডিবিসির নির্বাহী প্রযোজক বারী নিজ গলায় নিজেই ছুরি চালান!

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২২, ০৭:৩৪ এএম

বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি নিউজের নির্বাহী প্রযোজক আব্দুল বারীর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনের কথা জানিয়ে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) বলেছে, নিজেই গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বারী এবং ব্যবহৃত ছুরিটি তিনি নিজেই কিনেছেন। এরপর তিনি নির্জন স্থান হিসেবে পুলিশ কনকর্ড প্লাজা সংলগ্ন হাতিরঝিলের সড়কের ঢালের ঝোপের পাশের জায়গা বেছে নেন এবং পেটে ছুরি চালান।

ডিবি বলেছে, পেটে ছুরিকাঘাতের পর বারী নিজ গলায় ছুরি দিয়ে পোঁচ দেন। রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করতে করতে হাতিরঝিলের পানিতে পড়ে যান। সেখান থেকে তিনি আবারও উঠে ঢালের পাড়ে এসে পড়ে যান। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে।

গত ৮ জুন সকালে পুলিশ কনকর্ড প্লাজা সংলগ্ন হাতিরঝিলের সড়কের ঢাল থেকে আব্দুল বারীর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছিল, পূর্বশত্রুতার জের ধরে এই হত্যাকা- সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে।

হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিবি, পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিশেন (পিবিআই) ও র‌্যাব গোয়েন্দা ইউনিট একযোগে কাজ করে। ডিবির গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি টিম মাঠে নামে। তারা মহাখালীতে আব্দুল বারীর মেস থেকে শুরু করে হাতিরঝিলের ঘটনাস্থল পর্যন্ত ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার প্রায় আড়াইশ ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে। এছাড়া বারীর সহকর্মী, তার পরিবারের সদস্য, মেসের কয়েকজন রুমমেট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুসহ প্রায় শতাধিক ব্যক্তির সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলে ডিবি।

পুলিশ বারীর রুমমেটদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা জানিয়েছিলেন ১ জুলাই বারী মেস ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। মেসে তল্লাশি করে কিছু চিকিৎসা সনদ উদ্ধার করা হয়। বারী একজন চর্ম ও যৌন রোগ চিকিৎসকের নিয়মিত রোগী ছিলেন। সমস্যাটি তার ছোটবেলা থেকেই ছিল বলে চিকিৎসক নিশ্চিত করেন। এরই মধ্যে ঈদের ছুটিতে বারীর বিয়েও ঠিক করেছিল তার পরিবার। পুলিশ বারীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে। ২০২১ সালের শেষের দিকে বারীর চোখে একটি বড় ধরনের অপারেশন হয়। এরপর থেকে দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা ছিল বারীর। এ নিয়ে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন।

ডিবির সংগৃহীত আড়াইশ সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এ রকম তথ্য পেয়েছেন। ফুটেজে দেখা গেছে, ঘটনার রাত ১০টা ১ মিনিটে মহাখালীর মেস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গুলশান-১ নম্বর গোলচত্বরে যান। সেখানে প্রথম দফায় চারটি দোকানে গিয়ে ফলকাটা ছুরির খোঁজ করেন। মনমতো হয়নি বলে তিনি ছুরি আর কিনেননি। এর কিছু সময় পর পাশের একটি খোলা রেস্টুরেন্ট থেকে মিষ্টি ও জিলাপি খান। তারপর তিনি আরেকটি দোকানে গিয়ে হলুদ বাঁটযুক্ত একটি ফলকাটা ছুরি ২০ টাকায় কেনেন। এরপর তিনি ছুরিটি পকেটে নিয়ে হেঁটে মহাখালীর দিকে রওনা হন। মহাখালীর গাউছুল আজম মসজিদের সামনের ফুটপাতে প্রায় ১০ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। এদিক-ওদিক তাকানোর পর তিনি আবারও গুলশান-১ এর দিকে হাঁটতে থাকেন। গুলশান-১ নম্বর ফুটপাত ধরে হেঁটে তিনি শুটিং ক্লাবের ফুটপাতের সামনে হাজির হন। একবার তিনি সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করেন। পরক্ষণে তিনি একই দিকের ফুটপাত ধরে হেঁটে রওনা দেন। পুলিশ-কনকর্ড প্লাজার সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজে সর্বশেষ তাকে রাস্তা অতিক্রম করতে দেখা গেছে, তখন সময় রাত সাড়ে ১১টা, ৭ জুন। তবে যে স্পটে তার লাশ পাওয়া গেছে সেখানে সিসি ক্যামেরা নেই। তার মোবাইলের কল রেকর্ড পর্যালোচনা করেও তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। কারণ তিনি খুব বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না।

ডিবির গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘মৃত্যু রহস্য উন্মোচন করতে আমরা আলামতগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছি। আমাদের পিবিআই ও র‌্যাবও সহায়তা করেছে। আব্দুল বারী সব সময় একাকিত্ববোধ করতেন। তার শারীরিকভাবে অক্ষমতার তথ্যও পাওয়া গেছে। তিনি তার সহকর্মী ও মেসমেটদের সঙ্গে খুব একটা কথাবার্তা বলতেন না।’

মশিউর রহামান বলেন, ‘বারীর মৃতদেহের ক্ষতের চিহ্ন দেখে আমরাও প্রথমে ভেবেছিলাম তাকে কেউ হত্যা করেছে। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখা গেছে, তিনি নিজেই হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি কিনেছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা ছুরিটি যে সেটিই তাও আমরা নিশ্চিত হয়েছি। মহাখালী থেকে একাই হেঁটে তিনি ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজগুলো আমরা বারীর সহকর্মীদের দেখিয়েছি। তারাও নিশ্চিত হয়েছেন যে বারী নিজেই ছুরিটি কিনেছিলেন। কিন্তু ঘটনাস্থলের কোনো ভিডিও ফুটেজ মেলেনি। তবে আমরা তদন্তে নিশ্চিত হয়েছি যে তার মৃত্যুর সঙ্গে কারও কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তিনি নিজেই তার গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন।’

পিবিআইয়ের প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘ডিবির তদন্তের সঙ্গে পিবিআই সহায়তা করেছে। পিবিআই তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্যের সঙ্গে ডিবির তদন্তের মিল রয়েছে। আমরাও মোটামুটি নিশ্চিত যে বারীর হত্যার সঙ্গে কারও কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত