বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু চীনের তানিয়াং-খুনশান

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২২, ১০:৪৫ পিএম

২০১১ সালের ৩০ জুন বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সেতু তানিয়াং-খুনশান উদ্বোধন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় চীন। দেশটির সবচেয়ে বড় শহর সাংহাই ও জিয়াংসু প্রদেশের নানচিং শহরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এই সেতু নির্মাণে ব্যয় হয় ৮৫০ কোটি ডলার। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

দীর্ঘতম সেতু

চীনের তানিয়াং-খুনশান সেতু বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সেতু। এটির দৈর্ঘ্য ১৬৪.৮ কিলোমিটার। তানিয়াং-খুনশান সেতু চীনের সবচেয়ে বড় শহর ও বৈশ্বিক বাণিজ্যকেন্দ্র সাংহাই ও পূর্বাঞ্চলীয় জিয়াংসু প্রদেশের নানচিং শহরকে যুক্ত করেছে। এই সেতু নির্মাণে কাজ করে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক। তানিয়াং-খুনশান নির্মাণে সময় লাগে চার বছর। খরচ হয় সাড়ে ৮০০ কোটি ডলার। নির্মাণব্যয় পুরোটাই বহন করে চীনা সরকার। তানিয়াং-খুনশান সেতুর একটি অংশ চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুজো শহরে অবস্থিত অপার সৌন্দর্যের ইয়াংচেং হ্রদের ওপর দিয়ে গেছে। হ্রদটিতে সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ কিলোমিটার। হ্রদটির ওপর সেতুটির অবস্থান মুগ্ধ করে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের। তানিয়াং-খুনশান সেতুর রয়েছে দুই হাজার পিলার। এই বিশাল সেতু নির্মাণে ব্যবহার করা হয় সাড়ে চার লাখ টন স্টিল, যা এটিকে অনেক বেশি মজবুত করে। মজবুত হওয়ায় টাইফুন, রিখটার স্কেলে আট মাত্রার ভূমিকম্পসহ বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ তানিয়াং-খুনশান সেতুর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এমনকি তিন লাখ টন ওজনের নৌযান চলাচল করলে যে প্রভাব পড়ে নদীতে, তাও সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে সেতুটির। তানিয়াং-খুনশান সেতুতে রয়েছে পেইচিং-সাংহাই হাই স্পিড রেলপথ। যেহেতু এই সেতুর ওপর দিয়ে উচ্চ গতির ট্রেন চলাচল করে, তাই এটির নকশাও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে করেন প্রকৌশলীরা। সেতুর ওপর দিয়ে সর্বোচ্চ ঘণ্টায় আড়াইশ কিলোমিটার থেকে সাড়ে তিনশ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করতে পারে। অবশ্য ব্যস্ত সময়ে এই সেতু দিয়ে ঘণ্টায় ৩৮০ কিলোমিটার গতিতেও ট্রেন চলাচল করে।

নির্মাণ প্রতিষ্ঠান

চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) বিশ্বের এই দীর্ঘতম সেতুর নকশা করে। সিআরবিসি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইঞ্জিনিয়ারিং ও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় সিআরবিসির প্রায় ৬০টি কার্যালয় রয়েছে। মূলত সেতু, হাইওয়ে, টানেল, বন্দর নির্মাণ করে থাকে এই কোম্পানি। কেবল তানিয়াং-খুনশান সেতুই নয়, সিআরবিসির বেশিরভাগ প্রকল্প সম্মানজনক পুরস্কার লাভের পাশাপাশি রেকর্ডও গড়ে। ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সুরামাদু সেতু নির্মাণ করে সিআরবিসি। এ ছাড়া চীনে বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে উঁচু সেতু সুটং ইয়াংসি রিভার সেতু নির্মাণের দায়িত্বে ছিল ওই কোম্পানি। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স পুরকৌশলে অসামান্য অবদান রাখার জন্য সিআরবিসিকে সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত করে। 

নকশা

চীনের বৃহত্তর ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অংশ চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) মূলত তানিয়াং-খুনশান সেতুর নকশা করে। সেতু নির্মাণে যুক্ত প্রকৌশলীদের নাম চীন সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি। চীনজুড়ে অনেক অবকাঠামো প্রকল্প নির্মাণ করে চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। সেতু, টানেল, রেলপথসহ অন্যান্য পরিবহন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে তাদের। তানিয়াং-খুনশান সেতুর বিস্ময়কর দৈর্ঘ্য ছাড়াও এটি নির্মাণে প্রকৌশলীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল কয়েক মাইল দীর্ঘ ভূখণ্ডের ওপর একক কোনো কাঠামো দাঁড় করানো। পুরো সেতুতে উচ্চ গতির ট্রেনের পাশাপাশি কয়েকটি অঞ্চলে কার ও ট্রাক চলাচলের জন্য তানিয়াং-খুনশান সেতু শক্তিশালী করে নির্মাণের প্রয়োজন ছিল।  

ইতিহাস

তানিয়াং-খুনশান সেতুর আগে বৈশ্বিক বাণিজ্যকেন্দ্র সাংহাই থেকে পূর্বাঞ্চলীয় জিয়াংসু প্রদেশের নানচিং শহরে যেতে সাড়ে চার ঘণ্টার বেশি সময় লাগত। সেতুটি নির্মাণের পর এই দূরত্ব পাড়ি দিতে এখন সময় লাগে মাত্র দুই ঘণ্টা। এজন্য ওই অঞ্চলের মানুষ তানিয়াং-খুনশান সেতুর কাছে ঋণী। এটি নির্মাণে সাড়ে ৮০০ কোটি ডলার লাগলেও নানচিং ও সাংহাইয়ের মধ্যে উচ্চ গতির রেলপথ তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছিল চীন সরকারের। এ ছাড়া তানিয়াং-খুনশান সেতুর কারণে রাজধানী পেইচিংয়ে যাতায়াতও অনেক সহজ হয়ে যায়। 

নির্মাণ

তানিয়াং-খুনশান সেতুর মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে যথেষ্ট মেধার দরকার ছিল। নির্ধারিত  সময়েই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। ২০১০ সালে নভেম্বরের মধ্যে সেতু পুরোপুরি নির্মাণ করা হয়। পরের বছরের জুন মাসে এটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। সেতু নির্মাণে সব মিলে যুক্ত ছিল এক লাখ মানুষ। সেতুটি এমন শক্তিশালী করে নির্মাণ করা হয় যে, কোনো নৌযান এটিতে আঘাত করলেও সেতুর কোনো ক্ষতি হবে না। অনেকে মনে করেন, সেতু নির্মাণে অন্যতম চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল ইয়াংচেং হ্রদের ওপর ৫.৬ মাইল দীর্ঘ তানিয়াং-খুনশান নির্মাণ করা। হ্রদজুড়ে সেতুটির ভার বহনে দুই হাজার পিলার বসানো হয়। চীনের ইয়াংজে নদী গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ভাঙা তানিয়াং-খুনশান সেতুর দক্ষিণে অবস্থিত। তানিয়াং-খুনশান একটি ভায়াডাক্ট সেতু। এটি চীনের তানিয়ান, সুজো, চ্যাংঝাউ উক্সি ও কুনশি শহরকে স্পর্শ করেছে। তানিয়াং-খুনশান সেতুর ইয়াংচেং হ্রদের অংশে সাড়ে ৯ হাজার কংক্রিট পাইলিং ও সাড়ে চার লাখ টন স্টিল ব্যবহার করা হয়। এই সেতুতে প্রচুর পরিমাণে স্টিলের কেবল ব্যবহার করা হয়। এটির লাংফাং-কিংজিয়ান অংশ ১১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। তানিয়াং-খুনশান সেতুর এই অংশ দৈর্ঘ্যরে দিক থেকে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম। ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিভিন্ন ধরনের মাটির ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হয় তানিয়াং-খুনশান সেতু। সেতুর জায়গায় মাটি শক্ত নয়, বরং বন্যার পানির কারণে বেশ নরম। এ কারণে সেতুটির ভিত শক্তিশালী করার জন্য বিশেষ জোর দেওয়া হয়।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রেল পরিবহনের ওপর চাপ অনেক বেড়ে গেলে চীনের বিভিন্ন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নেয়, সব ধরনের সম্ভাব্য আকৃতির সেতু নির্মাণ করে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। তাদের এই সিদ্ধান্তকে সেতুর ক্ষেত্রে এক ধরনের বিপ্লব হিসেবে দেখা হয়। সে সময় চীনের পাহাড়ি ও বিস্তৃত জমিতে কয়েকশ সেতু নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। এত এত সেতু নির্মাণের পর চীন সরকার সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক তানিয়াং-খুনশান সেতু নির্মাণে হাত দেয়। খাল, নদী, নিচু ধানী জমি, হ্রদ ও অসমান ভূমির ওপর এই সেতু নির্মাণে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয় প্রকৌশলীদের। ১৬৪.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ তানিয়াং-খুনশান সেতুর ভূমি থেকে গড় উচ্চতা ১০০ ফুট। নির্মাণ শেষে এটি বিশ্বের অন্য সব দীর্ঘ সেতুর রেকর্ড সহজে ভাঙে। এটির রেলের অংশ  লাংফাং কিংজিয়াং নামে পরিচিত, যার দৈর্ঘ্য ১১৪ কিলোমিটার।   

ব্যয়বহুল অন্যান্য সেতু

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে টাওয়ার সেতু বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল সেতু হিসেবে পরিচিত। ১৮৯৪ সালের ৩০ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেতু চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ৫০টি নকশার মধ্যে হোরাস জোনস ও উলফ ব্যারি নামে দুই স্থপতির নকশা বাছাই করা হয়। টাওয়ার সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৮৮৪ সালে। এটি নির্মাণে ব্যয় হয় ১১ লাখ ৮৪ হাজার পাউন্ড। লন্ডনের টেমস নদীর ওপর টাওয়ার সেতু নির্মাণ করা হয়।   যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যের কুপার সেতু ২০০৫ সালে উদ্বোধন করা হয়। দেখতে অসাধারণ এই সেতু নির্মাণে খরচ হয় ৮৩৬.৯ মিলিয়ন ডলার। অবশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কুপার সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল বিপজ্জনক হয়ে পড়ে।  

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে হাডসন নদীর ওপর জর্জ ওয়াশিংটন সেতু বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম সেতু। ১৯৩১ সালে এটির নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় চার বছর পর। জর্জ ওয়াশিংটন সেতু নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ব্যয় হয় ১.১ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল সেতু হিসেবে বিবেচনা করা হয় চীনের সিং মা সেতুকে। এটি হংকংয়ের সিং ইয়ের সঙ্গে মা ওয়ান দ্বীপের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। সিং মা সেতুর দৈর্ঘ্য ১.৩৭ কিলোমিটার। ২০০০ সালে এই সেতুর উদ্বোধন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ফ্রান্সিসকো শহরে অবস্থিত বিশ্বের আরেক ব্যয়বহুল সেতু অকল্যান্ড বে সেতু। এটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৬.৪ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালে অকল্যান্ড বে সেতুর নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়। একই শহরের গোল্ডেন গেট সেতু ব্যয়বহুল সেতুর তালিকায় রয়েছে। এটি তৈরি করতে ৭০৪.৯ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। ১৯৩৭ সালে গোল্ডেন গেটের নির্মাণ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৬৪ সালে। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু সাসপেনশন সেতু বিবেচনা করা হয়। গোল্ডেন গেটে বাইসাইকেল চালানো অনেকের কাছে বেশ লোভনীয়।            

দীর্ঘতম অন্যান্য সেতু

তানিয়াং-খুনশানের পর বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু তাইওয়ানের চ্যাংহুয়া-কোহসিয়াং ভায়াডাক্ট সেতু। তানিয়াং-খুনশানের চেয়ে এটি দৈর্ঘ্যে প্রায় সাত কিলোমিটার ছোট। চ্যাংহুয়া-কোহসিয়াং ভায়াডাক্ট সেতু ১৫৭.৩১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। তাইওয়ান হাই-স্পিড রেললাইনের প্রধান অংশ এটি। ২০০৭ সালে এই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়।       

চীনের কাংদে গ্র্যান্ড সেতু বিশ্বের চতুর্থ দীর্ঘতম সেতু হলেও রেলপথে এটি বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম সেতু। ২০১০ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া এই সেতু তানিয়াং-খুনশান সেতুর মতো পেইচিং-সাংহাই হাই-স্পিড রেলওয়ের অংশ। কাংদে গ্র্যান্ড সেতুর নকশা এমনভাবে করা হয়যাতে এটি ভূমিকম্প সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। এটির দৈর্ঘ্য ১ লাখ ১৫ হাজার ৯০০ মিটার। পিলার রয়েছে মোট ৩ হাজার ৯২টি। চীনেই অবস্থিত বিশ্বের চতুর্থ দীর্ঘতম তিয়ানজিং গ্র্যান্ড সেতু। ১ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ মিটার দীর্ঘ এই সেতু লাংফাং ও কিংজিয়ানকে যুক্ত করেছে। ২০০৬ সালে এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০১০ সালে। ২০১১ সালে তিয়ানজিং গ্র্যান্ড সেতু উদ্বোধন করা হয়। দীর্ঘতম সেতুর তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে চীনের ওয়েনান ওয়েহে গ্র্যান্ড সেতু। ৭৯ হাজার ৭৩২ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর নির্মাণকাজ ২০০৮ সালে শেষ হয়। জিয়ান হাই-স্পিড রেলওয়ের অংশ এই সেতু।      

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত