কেউ তলোয়ার নিয়ে দাঁড়ালে রাইফেল দিয়ে প্রতিরোধ করুন

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২২, ০৫:২০ এএম

নির্বাচনের সময় কেউ যদি তলোয়ার নিয়ে দাঁড়ায় তাহলে প্রতিপক্ষকে রাইফেল নিয়ে প্রতিরোধ করতে বলেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের প্রথম দিন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) সঙ্গে সংলাপে এ কথা বলেন তিনি। তবে বিকেলে বাংলাদেশ কংগ্রেসের সঙ্গে সংলাপে ওই প্রসঙ্গটি এড়িয়ে শুধু লিখিত বক্তব্যে সংলাপ শেষ করেন সিইসি।

সংলাপে সিইসি ছাড়াও চার নির্বাচন কমিশনার, কমিশন সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এদিকে আজ সোমবার চারটি দলের সঙ্গে ইসির সংলাপ হবে। দলগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট), খেলাফত মজলিশ ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। এছাড়া বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশসহ দুটি দল সংলাপের নির্ধারিত সময় পরিবর্তন চেয়ে ইসিতে আবেদন করেছে বলে জানা গেছে।

সংলাপে দলগুলোর উদ্দেশে সিইসি বলেন, ‘আমরা সহিংসতা বন্ধ করতে পারব না। আপনাদেরও (রাজনৈতিক দলের) দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ খেলোয়াড় কিন্তু আপনারা। আপনারা মাঠে খেলবেন, আমরা রেফারি। আমাদের অনেক ক্ষমতা আছে। ক্ষমতা কিন্তু কম না, ক্ষমতা প্রয়োগ করব। আমি আপনাদের স্পষ্ট করে জানাতে চাচ্ছি, ’১৪ সালের নির্বাচন আমাদের ওপর চাপাবেন না, ’১৮ সালের নির্বাচনের দায় আমাদের ওপর চাপাবেন না। আমরা আমাদের নির্বাচনের দায় বহন করব। নির্বাচনটাকে অংশগ্রহণমূলক করতে আমরা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করব এবং নিরপেক্ষ করতে। সব দল সহযোগিতা না করলে আমরা সেখানে ব্যর্থ হয়ে যাব। আপনাদের সমন্বিত প্রয়াস থাকবে, কেউ যদি তলোয়ার নিয়ে দাঁড়ায়, আপনাকে রাইফেল বা আরেকটি তলোয়ার নিয়ে দাঁড়াতে হবে। আপনি যদি দৌড় দেন, তাহলে আমি কী করব? কাজেই আমরা সাহায্য করব। পুলিশের ওপর, সরকারের ওপর আমাদের কমান্ড থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি বারবার বলেছি, রাজনৈতিক দল আর সরকার এক নয়। প্রধানমন্ত্রী উনি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। কিন্তু যখন তিনি প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি সরকারপ্রধান, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নয়, এটি বুঝতে হবে। আমরা সরকারের সাহায্য চাইব। সরকার যদি সহায়তা না করে, তাহলে নির্বাচনের পরিণতি খুবই ভয়াবহ হতে পারে।’

স্বাগত বক্তব্যে সিইসি বলেন, ‘ইতিপূর্বে আমরা বহুবার বলেছি, যেসব রাজনৈতিক দল বিশেষত প্রধানতম দলগুলোর নির্বাচনে অংশ নেওয়া খুবই প্রয়োজন। কোনো দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে অবশ্যই বাধ্য করতে পারব না। তবে সব দলকে কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে আমরা বারবার আহ্বান করে যাব। আমাদের সে প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকেও আপনাদের মাধ্যমে সব দলকে আহ্বান জানাচ্ছি সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতা না থাকলে জনমতের সঠিক প্রতিফলন হয় না। পক্ষ-প্রতিপক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঠপর্যায়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সম্ভাব্য অনিয়ম, কারচুপি, দুর্নীতি, অর্থ, শক্তির বৈভব ও পেশিশক্তির প্রয়োগ ও প্রভাব বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। নির্বাচন কমিশন সবার অংশগ্রহণ, সহযোগিতা ও সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করতে চায়। অন্যথায় অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে আমাদের প্রয়াস যতই আন্তরিক হোক, ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। সেটা কাম্য নয়।’

সকাল সাড়ে ১০টায় এনডিএম, দুপুর ১২টায় বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) এবং দুপুর আড়াইটায় বাংলাদেশ কংগ্রেসের সঙ্গে ইসির সংলাপ হয়। বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) সংলাপে অংশ নেয়নি। এ সংলাপ ধারাবাহিকভাবে ৩১ জুলাই পর্যন্ত চলবে। সংলাপে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ কংগ্রেস ১৬ দফা, এনডিএম ১৩ দফা এবং বিএনএফের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনিশ্চিত দাবি করে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

১৩ প্রস্তাব এনডিএমের : জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একাধিক দিনে ভোটগ্রহণ, নির্বাহী বিভাগ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ না দেওয়াসহ তিন ধাপে ১৩টি প্রস্তাব করেছে এনডিএম। ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি’, ‘নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা সংস্কার’ ও ‘নির্বাচনকালীন সময়’ এ তিন শিরোনামে এসব প্রস্তাব করে দলটি।

প্রস্তাবগুলো হচ্ছে ১. রাজনৈতিক দলগুলো মিছিল-মিটিং করাসহ অবাধ রাজনৈতিক চর্চা করতে পারছে কি না সেই বিষয়ে তদারকি করা এবং এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা; ২. একাধিক দিনে ভোটগ্রহণ করা; ৩. নির্বাহী বিভাগ থেকে রিটার্নিং ও প্রিসাইডিং অফিসার নিয়োগ না করা; ৪. নির্বাচনকালীন গণমাধ্যমবিষয়ক নীতিমালা প্রণয়ন করা; ৫. নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা; ৬. নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তিতে জেলা পর্যায়ে শক্তিশালী নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল গঠন করা; ৭. নির্বাচনের সময়ে নির্বাচন কমিশনার সুপার প্রাইম মিনিস্টারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে জনপ্রশাসনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে; ৮. ইভিএম ব্যবহারে পেপার অডিট ট্রেইল সংযুক্ত করতে হবে; ৯. ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন ও পোলিং এজেন্ট নিয়োগ বাতিল করা; ১০. নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার বন্ধ করা; ১১. বিদেশি পর্যবেক্ষকসহ নিরপেক্ষ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ টিমকে পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া; ১২. নির্বাচনী প্রচারের সময়ে সব বিভাগে প্রার্থীদের নিয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা এবং ১৩. নির্বাচনী ব্যয়সীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

১৬ প্রস্তাব বাংলাদেশ কংগ্রেসের : নির্বাচনের সময়ে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইসির অধীনে রাখাসহ ১৬ দফা সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ কংগ্রেস। সুপারিশগুলো হচ্ছে ১. ভোটার তালিকা প্রণয়ন, সংশোধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানসংক্রান্ত কাজ ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্বাচন কমিশন সম্পন্ন করবে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সরবরাহ করা তথ্য অনুসারে জাতীয় ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে হবে; ২. সকল প্রকার নির্বাচন পরিচালিত হতে হবে নির্বাচন কমিশনের দ্বারা এবং নির্বাহী বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানে বাধ্য থাকবে; ৩. সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে; ৪ পৃথক আইন দিয়ে নির্বাচন কমিশন জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল নিবন্ধন দেবে এবং কারণসাপেক্ষে নিবন্ধন বাতিল করবে; ৫. জাতীয় বাজেটের ০.০২ শতাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সমানহারে বরাদ্দ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো ওই অর্থ সমাজকল্যাণমূলক কাজ ও দল পরিচালনায় ব্যয় করবে। বছর শেষে হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দেবে; ৬. নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা ও নির্দেশনা অনুসারে রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে হবে; ৭. প্রার্থীদের কাছ থেকে নির্ধারিত মুদ্রণ ফি নিয়ে নির্বাচন কমিশন সব প্রার্থীর নাম ও ছবি সংবলিত পোস্টার ছাপাবে এবং তা প্রার্থীদের মাঝে সমহারে বণ্টন করবে। প্রার্থীরা ওই পোস্টার প্রদর্শন করবেন; ৮. নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখার জন্য ভোটকেন্দ্রে একটি অস্থায়ী মনিটরিং কমিটি রাখতে হবে; ৯. জাতীয় সংসদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইসির কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে; ১০. নির্বাচনের দিন নির্বাচনী এলাকায় বিশেষ ছুটি ঘোষণা করতে হবে। ভোট চলাকালে দলীয় ক্যাম্প স্থাপন ও পরিচালনা, ভোটারবাহী পরিবহন ও জনসমাগম নিষিদ্ধ করতে হবে; ১১. ইভিএমে গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। এ মেশিনে ভোট দেওয়ার পর প্রতীকসহ মুদ্রিত টোকেন (পেপার অডিট টেইল) পদ্ধতি চালু করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ভোটার টোকেনের কপি নির্দিষ্ট বক্সে ফেলবেন যাতে পরবর্তী সময়ে ফলাফলের সঙ্গে মেলানো যায়; ১২. নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ কার্যকর থাকবে না। ওই সময়ে যে সরকার থাকবে তা ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ হিসেবে গণ্য হবে। ওই সরকারের স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রপতির পরামর্শক্রমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কর্র্তৃক পরিচালিত হবে; ১৩. যেকোনো নির্বাচন পর্যবেক্ষণে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষণ সংস্থা ও গণমাধ্যমকর্মীদের অবাধ সুযোগ দিতে হবে; ১৪. নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও দলের সদস্যদের যেকোনো বেআইনি ও অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনে ‘পলিটিক্যাল ট্রাইব্যুনাল’ ও ‘পলিটিক্যাল অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করতে হবে; ১৫. নির্বাচন কমিশনের অধীনে ‘লিডারশিপ ইনস্টিটিউট’ চালু করে সেখানে বিভিন্ন মেয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করতে হবে। নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে ওই প্রতিষ্ঠানের সনদপত্র থাকতে হবে; ১৬. সম্পর্ক উন্নয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন প্রতি বছর বার্ষিক সম্মেলনের আয়োজন করবে।

গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনিশ্চিত-বিএনএফ : সংলাপে অংশ নিয়ে বিএনএফের প্রেসিডেন্ট এসএম আবুল কালাম আজাদ লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘দেশে সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা ও সংসদে শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতি সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এমন অবস্থায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল নির্বাচন কমিশনের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে।’

তার দল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ আসুক বা না আসুক আমরা নির্বাচন করব সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নির্বাচন কোনো দলের অধীনে হবে না, নির্বাচন কমিশনের অধীনে হবে। নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে।’

তার এ বক্তব্যে সিইসি বলেন, ‘সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না, নির্বাচন হবে আমাদের অধীনে। সরকার চাইলে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে সহায়তা করতে পারে, এটা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাহী বিভাগের সহায়তা করার কথা বলা আছে।’

লিখিত বক্তব্যে আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, ‘অতীত অভিজ্ঞতা বলে, নির্বাচন কমিশনের ওপর সরকার প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এমন অবস্থায় অতীতের সব সন্দেহ-অবিশ্বাস মুক্ত হয়ে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার দিকে দেশবাসী তাকিয়ে আছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত