নিষেধাজ্ঞামুক্ত রুশ কৃষিপণ্য

রাশিয়া থেকে সার-গম আমদানিতে বাধা নেই

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২২, ০৮:৩৮ এএম

রাশিয়া থেকে খাদ্যসহ কৃষিজাতপণ্য, কৃষি যন্ত্রাংশ, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের বিধিনিষেধ থাকছে না। রাশিয়ার পাশাপাশি  ইউক্রেন থেকে এসব পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে দৃঢ়ভাবে সহযোগিতা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

গতকাল রবিবার ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে পাঠানো এক ফ্যাক্ট শিটে এই তথ্য জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, রাশিয়ার সারসহ খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, বিক্রয়, পরিবহনের ওপর কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা থাকছে না। এতে আরও বলা হয়, ইউক্রেনের ওপর আক্রমণের কারণে অন্য বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও রাশিয়ার খাদ্য ও সার বাণিজ্যে কোনো বিধিনিষেধ নেই।

এই বিধিনিষেধ না থাকার ফলে এখন থেকে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে গম, সার এবং ভোজ্য তেলসহ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের আর কোনো সংকট থাকল না। বিশেষ করে চলতি মৌসুমে কৃষির জন্য রাশিয়া থেকে সার আমদানিতে আর কোনো বাধা রইল না। এ ছাড়া রাশিয়া ও ইউক্রেনের গমের ওপর বাংলাদেশের যে আমদানিনির্ভরতা রয়েছে তাতে স্বস্তি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে ৮ লাখ টনের অধিক এমওপি সার আমদানি করে। এর ৬০ শতাংশ আসে  রাশিয়া ও বেলারুশ থেকে।  রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সারের দাম বেড়ে যায়। এ কারণে সরকারকেও ভর্তুকি বাড়াতে হয়। তা ছাড়া রাশিয়া থেকে আমদানির পথ সহজ না হওয়ায় আগামী মৌসুমে সার নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।
 
অন্যদিকে ২০২০-২১ মার্কেটিং ইয়ারে বাংলাদেশ ৭৬ লাখ টন গম আমদানি করে। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ গমের জোগান দিয়েছে রাশিয়া।

ইউএসডিএর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের বাজারে মার্চেই আটার দাম বেড়েছিল ১৭ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা না থাকার ফলে বিশ্ববাজারে চলমান খাদ্য নিরাপত্তা সংকট অনেকটাই কাটবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য স্বস্তি আসবে। তাদের মতে, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দুটি দেশের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। রাশিয়া যেহেতু বড় জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ, ফলে দেশে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়। আর এই সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী আমদানি খরচও বেড়ে যায় এবং দেখা দেয় মূল্যস্ফীতি। আর বাংলাদেশ বড় বিপাকে পড়ে গম আমদানি নিয়ে। কারণ রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ আমদানি হয়ে থাকে। ফলে দেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যপণ্য গম আমদানি নিয়ে সংকট তৈরি হয়। রাশিয়া থেকে আমদানি নিষেধাজ্ঞার পর রাতারাতি দেশে গম, আটা ও এ জাতীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায় এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।

সেই সময় সরকারকে গম আমদানির জন্য আবার পুরোপুরি ভারতের ওপর নির্ভর হতে হয়। সেই সঙ্গে বিকল্প বাজার খুঁজতে জয়। এরই মধ্যে ভারতও এই বছরের মে মাসে গম রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে। যদিও সেখানে বলা হয়, প্রতিবেশী দেশ এবং আগের রপ্তানি আদেশের পণ্য তারা সরবরাহ করবে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার কিছুটা সংকটে পড়ে। যদিও এরপর দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা ও কূটনৈতিক পত্র চালাচালিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু শঙ্কা থাকে দীর্ঘদিন যুদ্ধ চলতে থাকলে এবং রাশিয়ার পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলে কীভাবে সংকট সমাধান হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাই এই বিধিনিষেধ না থাকায় গম আমদানি এখন সহজ হবে।

গমের বাইরে আর যে কৃষিপণ্যের ওপর বাংলাদেশ রাশিয়া ও ইউক্রেনের ওপর নির্ভরশীল সেটি হলো সার। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে ৮ লাখ টনের অধিক এমওপি সার আমদানি করে। এর ৬০ শতাংশ আসে  রাশিয়া ও বেলারুশ থেকে।  রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সারের দাম বেড়ে যায়। এ কারণে সরকারকেও ভর্তুকি বাড়াতে হয়। তা ছাড়া রাশিয়া থেকে আমদানির পথ সহজ না হওয়ায় আগামী মৌসুমে সার নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা না থাকার কারণে আগামী মৌসুমে সার নিয়ে সংশয় কাটবে।

এ ব্যাপারে খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক বদরুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা অবশ্যই একটি সুখবর। খাদ্যপণ্যের মধ্যে ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে আমরা গম আমদানিতে নির্ভরশীল। খাদ্যপণ্যের মধ্যে ভোজ্য তেলও পড়বে। এখন সরকারের উচিত হবে শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে রাশিয়া থেকে ভোজ্য তেল আমদানির ব্যবস্থা করা। জ্বালানি সংকট এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েটের প্রাক্কালে বাংলাদেশের জন্য নমনীয় ভূমিকা রাখতে যুক্তেরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে বেলারুশ, ইউক্রেন এবং রাশিয়া থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার আসে। এখন বিষয় হলো, যে পোর্ট দিয়ে এসব পণ্য আসে সেসব এলাকা কি নিরাপদ? এই প্রশ্নটি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে আমাদের একজন নাবিকসহ একটি পণ্যবাহী জাহাজ সমুদ্রে ডুবেছে। তারপরও এই নিষেধাজ্ঞা না-থাকা বড় ব্যাপার। বাংলাদেশ প্রায় ৭৬ লাখ টন গম আমদানি করে থাকে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দেশের জন্য খাদ্য সংকটের হুমকি আসত।  রাশিয়ায় আমাদের কিছু প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পের ফল আগামী বছর থেকে আসতে শুরু করে দেবে। এসব প্রকল্পের অর্থছাড়ের বিষয়ও এখন আলোচনায় আসা উচিত। তিনি বলেন, রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ প্রচুর পরিমাণে সার আমদানি করে থাকে। দেশের কৃষিতে ব্যবহৃত মিউরিট অব পটাশিয়াম (এমওপি) এবং ফসফেটের প্রায় ৬০ শতাংশ রাশিয়া ও বেলারুশ থেকে  আসে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই সহজ হয়েছে।

খাদ্য সচিব মো. ইসমাইল হোসেন দেশ রূপান্তরকে  বলেন, এই ঘোষণা আমাদের জন্য বড় রকমের স্বস্তির। বিশ্ববাজার যে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে তা থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসবে। আমরা রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে গম, সার ও সূর্যমুখী তেল আমদানি করি। নিষেধাজ্ঞার কারণে আমরা কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলাম। এখন অনেক সহজ হলো। আশা করছি আরও অন্যান্য বিষয়ে ভালো খবর আসবে। এ বছরের মার্চে রাশিয়া থেকে সার কেনার প্রস্তাব মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন পায়।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা যখন রাশিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কঠিন করে তুলেছে, তখন দেশটি থেকে ৩০ হাজার টন সার কেনার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ সরকার। সেই সময় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে না বলে তিনি আশাবাদী, আর তখন রাশিয়া থেকে পণ্য আমদানির সংকটও কেটে যাবে।

রাশিয়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পাশের দেশ ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মস্কোর ওপর। রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংককে বিশ্বের প্রধান আর্থিক লেনদেন পরিষেবা সুইফট থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং তাদের মিত্ররা। তার মধ্যেই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের প্রস্তাবে রাশিয়ার জেএসসি ফরেন ইকোনমিক করপোরেশনের (প্রোডিনটর্গ) কাছ থেকে তৃতীয় লটে ৩০ হাজার টন এমওপি সার ১৫০ কোটি ২১ লাখ ২৩ হাজার ২২০ টাকায় আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত