ফেইসবুকে কিডনি কেনাবেচা পাচার করা হতো ভারতে

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২২, ০১:৪৩ এএম

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে কিডনি কেনাবেচার একটি চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব জানিয়েছে, এই চক্রটি চিকিৎসা সহায়তার নাম করে অর্থ আয়ের উদ্দেশ্যে কিডনি প্রতিস্থাপনে মানুষকে উৎসাহিত করত। রোগীদের সেবা দেওয়ার আড়ালে কিডনি কেনাবেচা করত তারা। চক্রের সদস্যরা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কিডনি কেনাবেচা চক্রের সদস্যদের সঙ্গে মিলে শতাধিক লোককে ওই দেশে পাচার করেছে। এই সংঘবদ্ধ চক্রের অন্যতম হোতা মো. শহিদুল ইসলাম মিঠুসহ পাঁচ সদস্যকে রাজধানীর ভাটারা, বনশ্রী ও মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গত মঙ্গলবার রাত ৮টা থেকে গতকাল বুধবার ভোর ৫টা পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়। গ্রেপ্তারকৃত বাকি চারজন হলো মিজানুর রহমান, মো. আল মামুন ওরফে মেহেদী,  মো. সাইমন ও মো. রাসেল হোসেন।

তাদের কাছ থেকে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে চুক্তির এফিডেভিট কপি, ভুক্তভোগীদের পাসপোর্টসহ মোট ১৪টি পাসপোর্ট, কিডনির ক্রস ম্যাচিংয়ের বিভিন্ন দলিলাদি, দেশি ও বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই ও এটিএম কার্ড, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের জাল সিল, খালি স্ট্যাম্প, কম্পিউটার,  মোবাইল ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়।

গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানান র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন। তিনি বলেন, প্রতিটি কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য চক্রটি রোগীপ্রতি ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা নিত। বিপরীতে কিডনিদাতাকে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দিত। সাম্প্রতিক সময়ে র‌্যাব সাইবার মনিটরিং সেল ভার্চুয়াল জগৎ তথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবৈধভাবে কিডনিসহ অন্যান্য মানব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেনাবেচা সিন্ডিকেটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আসছিল। এসব সিন্ডিকেটের সদস্যরা অনলাইনে বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে গ্রাহক ও দাতাদের আকৃষ্ট করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিডনি কেনাবেচা এ চক্রের মোট সদস্য সংখ্যা ১৫-২০ জন। তারা মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে কিডনি কেনাবেচার এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। চক্রের একটি দল ঢাকায় অবস্থান করে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন এমন বিত্তশালী  রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। চক্রের আরেকটি দলটি প্রথম দলের চাহিদা অনুযায়ী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব ও অভাবী মানুষদের চিহ্নিত করে এবং তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অর্থের বিনিময়ে কিডনি দিতে প্রলুব্ধ করে ঢাকায় নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে তৃতীয় ধাপে অন্য একটি দল প্রলোভনের শিকার কিডনিদাতাদের ঢাকায় বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে চান এমন রোগীদের সঙ্গে ব্লাড ম্যাচিং এবং অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে। ম্যাচিং ও অন্যান্য পরীক্ষায় কিডনি দিতে উপযুক্ত হলে দাতার পাসপোর্ট, ভিসা এবং ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে তাকে ভারতে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়। ভারতে তাদের লোক সেখানকার সব কাজ শেষ করে। এরপর সেই কিডনিদাতাকে বৈধ বা অবৈধ উপায়ে বিমান বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত এলাকার মাধ্যমে দেশে ফেরত পাঠায়।

র‌্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে যে তারা কিডনিদাতাকে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বললেও অগ্রিম ২ লাখ টাকা দিত। পরে বাকি টাকা চাইলে ভয় দেখাত। চক্রের মূলহোতা ও অন্যতম অভিযুক্ত মো. শহিদুল ইসলাম মিঠু ২০১৬ সালে নিজের চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী  দেশে যায়। সেখানে অবস্থানকালীন তিনি কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যাপক চাহিদা দেখতে পান এবং তিনি নিজেই কিডনি প্রতিস্থাপনের অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এখন পর্যন্ত তার মাধ্যমে ৫০টির বেশি কিডনি কেনাবেচা হয়েছে। চক্রের আরেক সদস্য মিজানুর রহমান কিডনিদাতাদের ভারতে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাসপোর্ট, ব্যাংক এনডোর্সমেন্ট, মেডিকেল ডকুমেন্টস, ভিসা এবং অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করেন।

র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃত সাইমন গত এক বছর আগে ও মো. আল মামুন ওরফে  মেহেদী ছয় মাস আগে চক্রটির মাধ্যমে জনপ্রতি ৪ লাখ টাকায় কিডনি বিক্রি করেন। পরবর্তী সময়ে অধিক টাকা কামানোর জন্য এ চক্রটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তারা নিজেদের সুস্থতার প্রমাণ দেখিয়ে অন্যদের কিডনি বিক্রি করতে রাজি করাতেন। তারা এখন পর্যন্ত ১০ জনের কিডনি কেনাবেচা করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত