কিংসকে অনেকেই হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন দেখতে চায়নি

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২২, ১২:৪৩ এএম

বসুন্ধরা কিংসের হ্যাটট্রিক প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা সভাপতি ইমরুল হাসানের। শুক্রবার ছিল তার জন্মদিন। দেশের অন্যতম করপোরেট হাউজ বসুন্ধরা গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও ফুটবল নিয়ে ভাবনাটা তার আকাশছোঁয়া। বাফুফের এই সহ-সভাপতি দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র

সঙ্গে বিশেষ দিনে মেতে উঠেছিলেন আড্ডায়। যার পুরোটাই ফুটবলময়

আর দশটা জন্মদিনের চেয়ে এবারেরটা নিশ্চয় একটু আলাদা?

ইমরুল : তা তো অবশ্যই। দু’ম্যাচ আগেই চ্যাম্পিয়নশিপ নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় একটা স্বস্তি ও আনন্দ তো কাজ করছেই। আসলে প্রথমপর্বে আবাহনীর চেয়ে ছয় পয়েন্টে এগিয়ে থাকার পরই একটা বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল যে বড় কোনো অঘটন না ঘটলে আমরাই জিতব।

অথচ স্বাধীনতার মতো দলের কাছে হেরে লিগ অভিযান শুরু করেছিল দল।

ইমরুল : স্বাধীনতা কাপের ফাইনালে আবাহনীর কাছে হারার পর লিগের প্রথম ম্যাচে স্বাধীনতার কাছে অঘটনের শিকার হই। পরপর দুটি ম্যাচে হার, মাঝখানে একটা টুর্নামেন্ট (ফেডারেশন কাপ) না খেলা। একটু তো ভাবিয়ে তুলেছিল। এরপরই নিজেদের ভেন্যুতে খেলার অধিকারে লড়াই শুরু করি। ক্রীড়া আদালত পর্যন্ত যাই। শেষ পর্যন্ত (বাফুফে) ভেন্যু দিতে বাধ্য হয়।

আপনাদের মাঠের বাইরেও বেশ লড়াই করতে হয়েছে এবার?

ইমরুল : এমনিতে একটা টুর্নামেন্ট না খেলায় (বাফুফের সঙ্গে) দূরত্ব তৈরি হয়। পাশাপাশি ভেন্যু নিয়ে জটিলতা তৈরি করা হয়। বারবার সূচি পরিবর্তন, বিদেশি রেফারি আনার প্রস্তাব না শোনা, সব মিলিয়ে মাঠের বাইরেও আমাদের অনেক বেশি সময় দিতে হয়েছে এবার।

সাফল্যটা তাহলে এসেছে মাঠ ও মাঠের বাইরের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

ইমরুল : তা তো বলাই যায়। মাঠের লড়াইয়ের মতো মাঠের বাইরের লড়াইটাও খুব দরকার ছিল। বাফুফে প্রথমে আমাদের হোম ভেন্যু দেবে বলেও দিল না। পরবর্তীতে স্বীকৃতি দিল ঠিকই, তবে দেখা গেল আমাদের মাঠে আমাদের চেয়ে অন্য দলগুলোর খেলা বেশি। তখনই চেয়ারম্যান স্যার (আহমেদ আকবর সোবহান) খুব রাগান্বিত হন এবং তার নির্দেশে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে প্রতিকারের জন্য গিয়ে সফল হই। আমার মনে হয়, কিংসের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে মাঠ নিয়ে এরকম জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিংসকে অনেকেই হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন দেখতে চায়নি।

বসুন্ধরা কিংসকে ঘিরে আপনার এগিয়ে যাওয়ার গল্পটা শুনতে চাই।

ইমরুল : বসুন্ধরা গ্রুপের পুরো পরিবারটাই ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ পরিবার। চেয়ারম্যান স্যার নিজে হকি খেলতেন। ওনার বড় ভাই (আবদুস সাদেক) ফুটবল ও হকির কিংবদন্তি। ছেলেরাও বিভিন্নভাবে খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত। ক’বছর আগে আমাদের মধ্যে ফুটবল নিয়ে আলোচনা হয়। দেশের ফুটবলের মান নিম্নগামী হওয়ার পাশাপাশি দর্শক আগ্রহও কমে গেছে। দর্শক ফেরাতে তাই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেই। বসুন্ধরা গ্রুপ শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রকে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে অনেক দিন। তবে তাতে দর্শক ফেরানোর প্রত্যাশা মিটছিল না। তখন কিংস গঠন করে পাইওনিয়ার লিগে ২০১৬ সালে খেলে পরের ধাপে উন্নীত হই। এরপর বাফুফে শর্ত পূরণ করে পেশাদার লিগের দ্বিতীয়স্তরে সরাসরি উঠে আসি এবং ওই বছরই চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রিমিয়ারে আসি। প্রিমিয়ারে আসার পর দর্শক ফেরাতে চেয়েছি চমক দিতে। তাই বিশ্বকাপে খেলা তারকা কলিনদ্রেসকে দলে নেই। জাতীয় দলের সেরাদেরও নেওয়া হয়। এসবে আমরা ভালোই সাড়া পাই। দল ভালো করায় এখন অনেকের একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে কিংসকে নিয়ে। দর্শক ফেরানোর প্রাথমিক উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। তবে দেশের ফুটবল উন্নয়ন করার মূল উদ্দেশ্য সফল করতে কেবল ক্লাব ফুটবল ও জাতীয় দলের নির্ভর করলে চলবে না। জোড় দিতে হবে বয়সভিত্তিক ফুটবলে। সেটা করতেই আমরা স্পোর্টস কমপ্লেক্স করছি। কমপ্লেক্স হয়ে গেলে বেশ কয়েকটা বয়সশ্রেণিতে ফুটবলারদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। তাতে ফুটবলারের পাইপলাইনটা কিছুটা হলেও মসৃণ হবে। তবে এককভাবে ফুটবলের খোলনলচে পাল্টে ফেলা সম্ভব নয়। আরও করপোরেট হাউজগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে আবাহনী-মোহামেডানকে। কারণ এই দুটি ক্লাব একটা আবেগ। এদের বাদ দিয়ে এদেশের ফুটবলের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

এত পয়সা খরচ করে ফুটবল দল গড়ে কী লাভ। বিপরীতে তো কিছুই মিলছে না?

ইমরুল : আর্থিক লাভ বলতে কিছুই নেই। তবে বসুন্ধরা কিংসের কথা বললে, এই ফুটবলের মধ্য দিয়ে বাইরের অনেক দেশ আমাদের বসুন্ধরা গ্রুপ সম্পর্কে জানতে পারছে। ক্লাব বসুন্ধরার জন্য বিশাল ব্র্যান্ডিং। খেলার মধ্য দিয়ে যে ব্র্যান্ডিংটা হচ্ছে, সেটা শত কোটি টাকারও ওপরে।

একটা নতুন ক্লাবকে জনপ্রিয় করে তোলাও তো নিশ্চয় বড় চ্যালেঞ্জের?

ইমরুল : একটা নতুন দলকে সহজে কেউই নিতে পারে না। এটা নিয়ে তাই শুরু থেকেই কাজ করেছি। খেলা শুরুর আগেই বিভিন্ন অঞ্চলে সমর্থক গোষ্ঠী গঠন করেছি, নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে চেষ্টা করেছি দর্শকদের আগ্রহী করে তুলতে। এর সঙ্গে ভালো খেলা, ভালো মানের বিদেশি আনার ব্যাপার তো ছিলই। এখন কিংসের খেলায় কিছু দর্শক আসে। কিংসকে নিয়ে যুবসমাজের মধ্যে একটা বাড়তি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এটাও ক্লাবের বড় প্রাপ্তি।

পেশাদার ক্লাব হিসেবে কিংস প্রশংসা কুড়িয়েছে। অথচ আপনাদের চরম অপেশাদার একটা লিগে খেলতে হচ্ছে?

ইমরুল : এটা নিয়ে বললে দায়টা বাফুফের সহ-সভাপতি হিসেবে আমার ওপরও আসে। তারপরও দুঃখের সঙ্গে বলছি, বাফুফে সত্যিকার অর্থে এত বছরেও লিগের একটা পেশাদার অবকাঠামো দাঁড় করাতে পারেনি। এই লিগ শেষ হতে চলল, ক্লাবগুলো জানে না আগামী মৌসুম কোন ফরম্যাটে হবে, কবে দলবদল হবে, খেলাই বা করে শুরু হবে। এতে পরিকল্পনা করা কঠিন হয়। তাছাড়া বহিঃবিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দলবদল হয় না বলে চাইলেই ভালো বিদেশি আনা যায় না। ধরুন, ভারতসহ বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গায় এখন উইন্ডো খোলা। ভারত তাই চাইলেই ভালো খেলোয়াড় আনতে পারছে। আমাদেরটা যখন খুলবে, তখন সব বন্ধ হয়ে যাবে। সব কিছু মিলিয়ে একটা লেজেগোবরে অবস্থা। এ থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন নয়। শুধু প্রয়োজন আন্তরিক প্রচেষ্টা।

নারী লিগেও সেরা দল কিংস। অথচ অন্যদের এ নিয়ে আগ্রহই নেই।

ইমরুল : এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা বারবারই অনুরোধ করেছি পেশাদার লিগের বাকি ক্লাবগুলোকে নারী ফুটবল লিগে নিয়ে আসতে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন লিগে বারবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেয়ে লড়াই করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাহাত্ম্যটাই আলাদা।

এখনো কিংস আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। এই আক্ষেপটা নিশ্চয় খুব পোড়ায়?

ইমরুল : প্রত্যাশার বিচারে হয়তো শতভাগ পূরণ হয়নি। তবে এএফসি কাপে আবাহনী একবারই গ্রুপপর্ব পেরিয়েছে। বাকিগুলোতে ভালো করতে পারেনি। শেষ দু’বার প্লে-অফ থেকেই বাদ পড়েছে। সেই তুলনায় আমাদের পারফরম্যান্স খারাপ ছিল না। সামনে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগের প্লে-অফে খেলার সুযোগ পেলে চেষ্টা করব গ্রুপপর্বে যেতে। আর এএফসি কাপে খেললে লক্ষ্য থাকবে গ্রুপসেরা হওয়া।

আন্তর্জাতিক সাফল্য পেতে তো স্থানীয় ফুটবলারদেরও দায়িত্ব নিয়ে খেলতে হয়। গেল দু’বার ভারতের মোহনবাগানের কাছে এই জায়গাটাতেই পিছিয়ে পড়েছে কিংস?

ইমরুল : আমরা জাতীয় দলের সেরাদের নিয়ে দল গড়ি। বিদেশিও ভারতীয়দের ক্লাবগুলোর সমপর্যায়ের। আসলে আমাদের তুলনায় ভারতের স্থানীয়রা অনেক পরিণত। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে সম্মিলিতভাবে যদি কাজ হয়, তবে আমরাও ভালো করতে পারব।

একে তো সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আবার জন্মদিন। এই দিনেও আপনাকে ফুটবলে মশগুল থাকতে হলো। পরিবার থেকে যথেষ্ট সমর্থন পান বলেই নিশ্চয় এতটা করতে পারছেন?

ইমরুল : সেটা না পেলে তো কিছুই সম্ভব হতো না। এর জন্য পরিবারের কাছে কৃতজ্ঞ। একই সঙ্গে বসুন্ধরা গ্রুপের কাছেও ঋণী। গ্রুপ আস্থা রেখেছে বলেই ক্লাব নিয়ে, ফুটবল নিয়ে কাজ করতে পারছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত