প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে মাউশি কর্মকর্তা মিল্টন গ্রেপ্তার

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২২, ০৬:৪১ এএম

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে নিয়োগের নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাউশির শিক্ষা কর্মকর্তা (মাধ্যমিক-১) চন্দ্রশেখর হালদার মিল্টন। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগ (ডিবি)। তিনি এতদিন প্রকাশ্যে ঘুরলেও ডিবির কাছে ছিলেন পলাতক।

গ্রেপ্তারের পর মিল্টনকে আদালতে সোপর্দ করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করে ডিবি। ঢাকার মহানগর হাকিম মামুনুর রশীদ ছিদ্দিকীর আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে জামিনের আবেদন নাকচ করে দিয়ে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

মিল্টন ৩১তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি। মাউশির ওই নিয়োগ পরীক্ষার ইডেন মহিলা কলেজ কেন্দ্র সমন্বয় করার দায়িত্বে ছিলেন মিল্টন।

মিল্টন গ্রেপ্তার হলেও এখন পর্যন্ত তদন্তের বাইরে রয়েছেন নিয়োগ পরীক্ষা কমিটির সদস্যরা। কমিটির প্রধান অধ্যাপক মো. শাহেদুল খবির চৌধুরীর বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আগে থেকেই রয়েছে। অত্যন্ত প্রভাবশালী মাউশির এ পরিচালকের (কলেজ ও প্রশাসন) বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে নেমে একপর্যায়ে পিছু হটে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) এখনো তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করছে। নিয়োগ-বাণিজ্যসহ মাউশির বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরও নিয়োগ পরীক্ষার কমিটিতে শাহেদুল খবিরের থাকার বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ডিবি জানিয়েছে, মাউশির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের মূল হোতা চন্দ্রশেখর হালদার মিল্টন। ফাঁস করা প্রশ্নের উত্তর তৈরি করান মেডিকেলের এক শিক্ষার্থীকে দিয়ে। আর পরীক্ষা শুরুর আগেই মিল্টন মুঠোফোনের হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর পাঠিয়ে দেন চক্রের সদস্য সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলামকে। সেখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ে উত্তর। মিল্টন ছাড়াও তার সমপর্যায়ের মাউশির আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিবি কর্মকর্তারা।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের এ ঘটনায় এর আগে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের এক কর্মকর্তাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে মিল্টনের নাম উঠে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রতিবেদনও তৈরি করে ঊর্ধ্বতনদের পাঠায় ডিবি। সেখানে মিল্টনকে পলাতক দেখানো হয়।

এ বিষয়ে গত ৫ জুন ‘প্রভাবের ফাঁদে প্রশ্ন ফাঁসের তদন্ত’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় দেশ রূপান্তরে। এর পরই নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গত ২১ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক অফিস আদেশে মিল্টনকে মাউশি থেকে বদলি করে মাদারীপুর সরকারি কলেজে। এ সপ্তাহে সেখানে যোগদানের কথা ছিল তার।   

ডিবি তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহাদাত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাউশির প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় এর আগে গ্রেপ্তারদের তথ্য মতে মিল্টনের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তিনি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।’

ডিবির এ কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রশ্ন ফাঁসে আর কেউ জড়িত আছে কিনা তা মিল্টনকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাবে। প্রশ্ন প্রণয়ন কমিটির সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানান তিনি।

এডিসি শাহাদাত হোসেন সোমা আরও বলেন, ‘মিল্টন গ্রেপ্তার এড়াতে ফোন ব্যবহার করতেন না। যে ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে উত্তর পাঠিয়েছেন সে ফোনটিও তিনি ধ্বংস করেছেন। গ্রেপ্তার অন্যদের ফোন সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পরই মিল্টনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল অ্যাক্টে মামলা হবে। এছাড়া অর্থ লেনদেনের বিষয়টি তদন্ত করবে সিআইডি (পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ)। 

উল্লেখ্য, গত ১৩ মে রাজধানীর ৬১টি কেন্দ্রে মাউশির অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক (গ্রেড-১৬) পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ৫১৩টি পদের জন্য প্রথম ধাপের নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় (এমসিকিউ) অংশ নেন ১ লাখ ৮৩ হাজার চাকরিপ্রার্থী। পরীক্ষা চলাকালে ইডেন মহিলা কলেজ কেন্দ্রে প্রশ্নের ৭০টি  উত্তর প্রবেশপত্রে লেখা থাকায় সুমন জমাদ্দার (৩০) নামের এক পরীক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। এ ঘটনায় রাজধানীর লালবাগ থানায় একটি মামলা করেন ইডেন মহিলা কলেজের প্রধান সহকারী আবদুল খালেক। প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ওই পরীক্ষা বাতিল করে মাউশি।

গ্রেপ্তারের পর সুমনের দেওয়া তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় প্রশ্ন ফাঁসের দায়ে ডিবি একে একে গ্রেপ্তার করে পটুয়াখালীর খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিতের সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম, বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ৩৪তম ব্যাচের পটুয়াখালী সরকারি কলেজের প্রভাষক রাশেদুল ইসলাম (৩৪), মাউশির উচ্চমান সহকারী আহসান হাবীব (৪৫) ও মাউশির অফিস সহকারী মো. নওশাদুল ইসলামকে (৩৭)।

গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রশ্ন ফাঁসের সার্বিক বিষয়ে তদন্ত করে ডিবি একটি প্রতিবেদন তৈরি করে গত ১৮ মে ডিএমপি কমিশনারকে পাঠায়। সেখানে প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় ‘মাউশির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ও উত্তরপত্র ফাঁস চক্রের তথ্য’ শিরোনামে লেখা হয়েছেÑ ‘পলাতক আসামি চন্দ্রশেখর হালদার মিল্টন, যিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) শিক্ষা কর্মকর্তা (মাধ্যমিক-১) হিসেবে কর্মরত।

প্রতিবেদনে আরও নাম এসেছে তাদের মধ্যে মো. মকবুল হোসেন (ক্যাশিয়ার বদরুন্নেসা কলেজ) এবং আবদুল মালেককে (সরকারি তিতুমীর কলেজের বুক সেন্টার) এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

ডিবি প্রধান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘বেশ কিছুদিন আগে মাউশির প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আমরা তদন্তকাজ শুরু করেছিলাম। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকায় আগেই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী দেখা যায় মূল হোতা মাউশি কর্মকর্তা চন্দ্রশেখর হালদার মিল্টন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত