আবারও গ্রেপ্তার জাল টাকার সেই হোতা হুমায়ুন কবির

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২২, ০৩:১৮ এএম

ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে জাল টাকা তৈরি ও বাজারে ছড়িয়ে দিয়ে আসছিল একটি চক্র। মাসে প্রায় ৬০ লাখ টাকা তৈরি করেছে তারা। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় চক্রটির সদস্যদের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের জাল টাকাও ছড়িয়েছে। এ চক্রটির প্রধান হলো সাবেক পুলিশ সদস্য হুমায়ুন কবির খান (৪৮)।

গত বুধবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে হুমায়ুনকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিএমপির জনসংযোগ শাখায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হারুন অর রশীদ বলেন, হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে আগে আরও চারটি মামলা আছে। এবারের অভিযানে তার কারখানা থেকে ১৬ লাখ জাল টাকা, জাল টাকা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। তার চক্রের বাকি সদস্য ইমাম হোসেন (৩০), মো. আলাউদ্দীন (৩৫), মো. সাইফুল (৩০), মজিবর (৩২) ও আলাউদ্দীনকে (৪২) গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

ডিবি প্রধান বলেন, ঈদ ও পূজা সামনে রেখে চক্রটি জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। বর্তমানে ডলার সংকট ও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় চক্রটি জাল ডলারও তৈরি করছিল। এমন সংবাদের ভিত্তিতে গত বুধবার সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকার ৪ নম্বর রোডের ১১ নম্বর বাসার পাঁচতলার ৫/৬ নম্বর ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় ডিবি। সেখান থেকে হুমায়ুন কবিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ওই বাসা থেকে ১৬ লাখ টাকার জাল নোট, একটি ল্যাপটপ, একটি ইপসন প্রিন্টার, একটি লেমিনেশন মেশিন, একটি পেস্টিং গামের কৌটা, তিনটি টাকা তৈরির ডাইস, দুই বা-িল ফয়েল পেপার, টাকা তৈরির কাগজ দুই প্যাকেট, একটি কাটার ও দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।

ডিবি প্রধান বলেন, হুমায়ুন কবির ভাড়ায় নেওয়া বাসাটিকেই জাল টাকা  তৈরির কারখানা বানিয়েছিল। জাল নোট তৈরির জন্য যেসব উপকরণ লাগে তার সবই ছিল কারখানাটিতে। এ কাজে হুমায়ুন কবিরের বেশ কয়েকজন সহযোগী রয়েছে, যারা এসব জাল নোট বিক্রি করে। এছাড়া তারা মাঝেমধ্যেই ভিড়ের সময় ব্যাংকে এই জাল নোটের বা-িল জমা দেওয়ার চেষ্টা চালায় বলে জানা গেছে।

ডিএমপির ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার কাজী শফিকুল আলম, অতিরিক্ত উপকমিশনার আছমা আরা জাহানের তত্ত্বাবধানে ও অতিরিক্ত উপকমিশনার কায়সার রিজভী কোরায়েশীর নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়।

ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হুমায়ুন কবির খান প্রায় ১২ বছর ধরে জাল টাকা তৈরি করছে। তার ছোট ভাই কাওসার হামিদ খানও এই কারবারে জড়িত। এর আগে ২০২০ সালে  কদমতলী এলাকা থেকে দুই সহযোগীসহ হুমায়ুনকে গ্রেপ্তার করে ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। ওই সময় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের জাল নোট ও এগুলো তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এর আগে একবার লালবাগ এলাকা থেকেও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারও আগে র‌্যাবের হাতেও গ্রেপ্তার হয়েছিল এই কারবারি।

একই ব্যক্তি বারবার গ্রেপ্তার হয়েও কীভাবে জাল টাকা তৈরি করে জানতে চাইলে ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ বলেন, কারাগারে গিয়ে নতুন নতুন অপরাধীর সঙ্গে পরিচয় হয়। এভাবে তার চক্রের সদস্য আরও বেড়ে যায়। যার কারণে জামিনে বের হয়ে একই কাজ আবার শুরু করে।

এ চক্রের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও জড়িত রয়েছেন বলেও তথ্য রয়েছে ডিবির কাছে। ডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে জাল টাকা তৈরি করলে জলছাপ, নিরাপত্তা সুতাসহ সবকিছু নিখুঁত হয়। এ কারণে সেটি আসল টাকার মতোই দেখায়। সাধারণ লোক তো দূরের কথা, অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিও এগুলোকে আসল টাকা ভেবে প্রতারিত হচ্ছেন।

হুমায়ুনের কারখানায় তৈরি করা এসব জাল নোট বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে চক্রের সদস্যরা। তারা ১ লাখ টাকার জাল নোটের বা-িল ১০ থেকে ১৪  হাজার টাকায় কিনে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিয়ে থাকে।

ডলার মজুদ করলে ব্যবস্থা : কেউ ডলার মজুদ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডলারের মূল্য বাড়তে থাকায় এ সময়ে কেউ যদি তা মজুদ করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেউ যদি জাল ডলার তৈরি করে, তথ্য পেলে তার বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি এ ধরনের তথ্য পাই কেউ ডলার মজুদ করছে বা অবৈধভাবে ডলার তৈরির সরঞ্জাম অথবা মেশিন আছে, তাহলে অবশ্যই অভিযান পরিচালনা করব। আমরা এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত