বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও মূল্যবৃদ্ধির জাঁতাকলে জনগণ

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২২, ১০:১৯ পিএম

যুদ্ধ মানুষকে বিপর্যস্ত করে। মুখোমুখি করে মানবেতর সময়ের। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব প্রায় বিশ্বজুড়ে পড়লেও, বাংলাদেশে যে সংকটগুলো প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে, এর সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব ছাড়াও আছে অপরিকল্পিত, উচ্চাভিলাষী উন্নয়নের ধকল। সম্প্রতি প্রথম আলোর এক রিপোর্ট অনুযায়ী ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ৭.৫৬%। ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি ৩.০৮১কোটি ডলার। টাকার মূল্যমান কমেছে জানু-২১ জুলাই ১০.০৮%।

মুদ্রামান কমে গেলে এমন অবস্থা হয় যে সামান্য কিছু কিনতে হলেও ক্রেতাকে ব্যাগ ভরে টাকা নিয়ে বাজারে যেতে হবে। অথচ টাকার জোগান সীমিত। চাল, আটা, ভোজ্য তেল থেকে শুরু করে গত প্রায় ১০ মাসে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। গত বছর নভেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর পাইকারি হারে বেড়ে গেছে শতভাগ পণ্যের মূল্য। দ্বিগুণ হয়েছে ভোজ্য তেলের দাম। গত ছয় মাসের চেয়ে বেশি সময় ধরে দেখা যাচ্ছে শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ নয়, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তরাও দাঁড়াচ্ছেন টিসিবির লাইনে। হন্যে হয়ে ছুটছেন ট্রাকের পিছে।

কিন্তু কেন এই মূল্যবৃদ্ধি? গত দশ বছরে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় নব্বই পার্সেন্ট। ২০০৮ সালের ৫ টাকা ইউনিটের পানি ২০২১ সালে এসে হয়েছে ১৬ টাকা। আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু এলপিজি নয়, গত ১১ বছরে প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে সরকারি গ্যাসের দাম। পাঁচ দফায় বেড়ে তা হয়েছে ১৪৩.৭৫ শতাংশ। দুই চুলার গ্যাসের বিল ২১০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। ২০০৯ সালে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের খুচরা দাম ছিল ৪ টাকা ৩৪ পয়সা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৯ টাকা ৯৬ পয়সা, বেড়েছে ১২৯ শতাংশ। এই দাম ১১৭ শতাংশ বাড়ানোর আবেদন করেছে পেট্রোবাংলা।

বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সরকার আরও একধাপ এগিয়ে রয়েছে। গত ১১ বছরে সরকার ১০-বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। গ্রাহকপর্যায়ে দাম বেড়েছে ৯০ শতাংশ। ২০১০ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় খুচরা মূল্য ছিল তিন টাকা ৭৬ পয়সা। সর্বশেষ ২০২০ সালের মার্চে তা বাড়িয়ে ৭ টাকা ১৩ পয়সা করা হয়। পরে আরেক দফা দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ধীরে ধীরে এসব অপরিহার্য পরিসেবাগুলো যেন চলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অতি প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম গত ১২ বছরে বেড়েছে দুই থেকে আড়াই গুণ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতে লোডশেডিং। গত মার্চ মাসে শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘোষণা এলেও বর্তমানে জ্বালানির অভাবে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট কমে গেছে। অতিমাত্রায় গ্যাসনির্ভর বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যানুসারে, ২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ২৭টি। এখন সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১৫২টি। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুসারে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হতো। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে আসে ২২০-২৩০ ঘনফুট। ৭০ থেকে ৮০ ঘনফুট আমদানি করা হয় এলএনজি হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে ২৭০ থেকে ২৮০ ঘনফুটের বেশি সরকার দিতে পারছে না। এই গ্যাস আবার শিল্প খাত ও বিদ্যুৎ খাতে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়।

ওদিকে বিশ্ববাজারে এখন প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৪১ ডলারের কাছাকাছি। কভিডের আগে দাম ছিল ৪ ডলার। তেলের দাম ছিল ৭৭ ডলার প্রতি ব্যারেল। এখন বিক্রি হচ্ছে ১৭১ ডলারে।

ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় মনে হচ্ছে উচ্চমূল্যের জ্বালানি আমদানি করার মতো অবস্থাও সরকারের নেই। তাই জ্বালানি আমদানিতে ভাটা পড়েছে। ফলে সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে জ্বালানি দিতে পারছে না। অথচ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গত ১০ বছরে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ৭০ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছে সরকার। অপখরচ, পাচার এবং অপরিকল্পিত উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রভাব বিদ্যুৎ খাতের ওপরে অনেকটা পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যয় বাড়ছে দিন দিন। চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হওয়ায় বসিয়ে বসিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে উদ্যোক্তাদের। এখন তেল আর গ্যাসের সাশ্রয়ের জন্য লোডশেডিং দেওয়া হলেও এর ফলে জ্বালানি ব্যবহার না কমে উল্টো বাড়তেও পারে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে জ্বালানি ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নজর না দিয়ে গ্যাস আমদানির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এতেও বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে সরকারের। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দূর না করে, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা না নিয়ে দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ মূলত সরকারের ব্যর্থতার দায় জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার নামান্তর।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সংকট জিইয়ে রেখে এলএনজির ব্যবসার দ্বার খোলা হয়েছে। সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের পকেট ভরছেন। এটা স্পষ্ট যে, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের লোকসান আসলে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীলদের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা আর দুর্নীতির ফল। কিন্তু এর দায় মেটাতে হচ্ছে জনগণকে, ভোগান্তিও জনগণের।

অন্যদিকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জ্বালানি তেলের মূল্যহার বিইআরসি আইন লঙ্ঘন করে বছরের পর বছর অবৈধ উপায়ে বৃদ্ধি করে আসছে। দিনে ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি কমানোর অজুহাতে আবারও তারা ডিজেল, পেট্রল তথা জ্বালানি তেলের মূল্যহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে সিদ্ধান্ত যেকোনো দিন হয়তো নীরবে কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায়। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এতে পরিবহন ভাড়াসহ ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয় শত শত কোটি টাকা বেড়ে যাবে।

জ্বালানি তেলের মূল্যহার বৃদ্ধিতে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং ভোগ ব্যয় কমবে। ফলে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা হ্রাসে সরকার যথেষ্ট পরিমাণে আয় হারাবে, বাজেট ঘাটতি বাড়বে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কর্র্তৃক মূল্যহার বৃদ্ধি কিংবা মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব বিইআরসির পরিবর্তে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পাঠানো এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ কর্র্তৃক মূল্যহার বৃদ্ধি কোনোটিই যেমন বৈধ নয়, তেমনি মূল্যহার বৃদ্ধির পরিমাণও ন্যায্য ও যৌক্তিক নয়।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে এমন অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে। দুর্বিষহ জীবনে পড়েছেন শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। বিনোদন, চিকিৎসা, লেখাপড়া এমনকি খাওয়ার খরচ কমিয়ে তারা চাপ সামলাচ্ছেন। সবদিকে কাটছাঁট করে শুধু প্রাণটুকু বাঁচিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছেন দিন। এর ওপর নিত্যনতুন দাম বাড়ানোর চেষ্টা যেন তাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা হচ্ছে আরও সাশ্রয়ী হতে। অথচ লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প খাতে উৎপাদন কম হলে রপ্তানি আয় কমে আসবে। অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদার কম পণ্য উৎপাদন হলে দাম আরও বেড়ে যাবে। জ্বালানি সাশ্রয় করতে সৃষ্ট লোডশেডিংয়ের ক্ষতি সাশ্রয়ের চেয়ে আরও অনেক বেশিও হতে পারে।

লেখক কথাসাহিত্যিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত