আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে গত রবিবার সিআইএ পরিচালিত এক ড্রোন হামলায় আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত সোমবার জাওয়াহিরির মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেন। আগেও বেশ কয়েকবার তার মৃত্যুর কথা শোনা গিয়েছিল। লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
আল-কায়েদা ও আল-জাওয়াহিরি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ঘোষণার আগেই আয়মান আল-জাওয়াহিরির মৃত্যুর খবর সামনে আনে দেশটির গণমাধ্যমগুলো। সিবিএস তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে খবরটি নিশ্চিত করে। সূত্রের বরাত দিয়ে একই তথ্য জানায় নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট ও সিএনএন।
ওসামা বিন লাদেনের পর আল-কায়েদার হাল ধরেন আয়মান আল-জাওয়াহিরি। এর আগে বহু বছর তিনি ছিলেন এর মূল সংগঠক ও কৌশল নির্ধারণকারী। তার পরিকল্পনায় আল-কায়েদার উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের আগ্রহে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানো হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তাদের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার করে। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যুদ্ধে জড়ায় মার্কিনিরা। তখন জাওয়াহিরি পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সীমান্তে লুকিয়ে ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। ২০১১ সালে পাকিস্তানে অভিযান চালিয়ে বিন লাদেনকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের নেভি সিল। এরপর আল-কায়েদার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন তিনি। তখন থেকে পাশে এফ-৪৭ বন্দুক রেখে ভিডিও বার্তায় বারবার বৈশ্বিক জিহাদের ডাক দিয়ে আসছিলেন ডাক্তার জাওয়াহিরি।
জাওয়াহিরি প্রায়ই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতি কিংবা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গে টেনে অনলাইনে বক্তব্য দিতেন। সর্বশেষ ভারতের কর্নাটকে হিজাব নিয়ে ভারতকে লক্ষ্য করে অডিও বার্তা দেন। আমেরিকানদের মতে, আল-জাওয়াহিরি আল-কায়েদার কয়েকটি বড় অভিযানে সরাসরি জড়িত ছিলেন। তিনি ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হামলার প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করেছিলেন। ১৯৯৮ সালে কেনিয়া ও তানজানিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে বোমা হামলার ভূমিকার জন্য জাওয়াহিরিকে অভিযুক্ত করা হয়। এফবিআইয়ের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা তার মাথার জন্য ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান
১৯৫১ সালের ১৯ জুন মিসরের কায়রোতে জন্ম আয়মান আল-জাওয়াহিরির। মধ্যবিত্ত তবে শিক্ষিত পরিবারে জন্ম তার। তার দাদা রাবিয়া আল-জাওয়াহিরি মধ্যপ্রাচ্যে সুন্নি ইসলামিক শিক্ষার কেন্দ্র আল-আজহারের গ্র্যান্ড ইমাম ছিলেন। তার এক চাচা ছিলেন আরব লিগের প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিকেল বিভাগে পড়েন জাওয়াহিরি। ১৯৭৪ সালে স্নাতক এবং তার চার বছর পর সার্জারিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। তার বাবার নাম মোহাম্মদ। একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফার্মাকোলজির অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৯৫ সালে তার মৃত্যু হয়। জাওয়াহিরির বেড়ে ওঠা কায়রোর মাদি উপশহরে। তিনি পারিবারিক ঐতিহ্য অব্যাহত রাখতে কায়রোর উপশহরে একটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। তারপরই বিভিন্ন ইসলামি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।
জাওয়াহিরির পথচলা
যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী লড়াইয়ে আল-জাওয়াহিরির পথচলা কয়েক দশক আগে থেকে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ১৯৮১ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন। এ সময় অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে জাওয়াহিরির বিরুদ্ধে একটি মামলা চলছিল। তখন আদালতের এজলাসে (খাঁচায়) সাদা পোশাকে বন্দি জাওয়াহিরিকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা ত্যাগ স্বীকার করেছি এবং ইসলামের বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখনো আরও ত্যাগ স্বীকারের জন্য প্রস্তুত আছি।’ ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করায় সাদাতের ওপর ক্ষুব্ধ অন্য আসামিরা এ সময় সেøাগান দিতে থাকেন। এ ঘটনার পর প্রথমবারের মতো বিশ্ব জাওয়াহিরির কথা জানতে পারে। এ সময় তিন বছর কারাভোগ করেন তিনি।
একটি বিশুদ্ধ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে মিসরে ইসলামিক জিহাদ গ্রুপের নেতৃত্ব দেন জাওয়াহিরি। তখন ১ হাজার ২০০-এর বেশি মিসরীয় নিহত হন। ১৯৯৫ সালের জুনে আদ্দিস আবাবায় প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারককে গুপ্তহত্যার চেষ্টা চালানো হয়। এরপর ইসলামিক জিহাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন অভিযান চালায় মিসর সরকার। এর প্রতিক্রিয়ায় ধূসর, সাদা পাগড়িধারী জাওয়াহিরি ১৯৯৫ সালে ইসলামাবাদে মিসরীয় দূতাবাসে হামলার নির্দেশ দেন। বিস্ফোরকভর্তি দুটি গাড়ি দূতাবাস কম্পাউন্ডের ফটকে আঘাত হানে। এতে ১৬ জন নিহত হন। ১৯৯৯ সালে জাওয়াহিরির অনুপস্থিতিতে মিসরের সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এ সময় তিনি পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন।
পেশায় চিকিৎসক জাওয়াহিরি পাকিস্তান রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে কাজ করেছেন। আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে আহত মুজাহিদদের চিকিৎসা দেন। ওই সময় তিনি বিন লাদেনের সঙ্গে পরিচিত হন। ধনাঢ্য এ সৌদি নাগরিক আফগান প্রতিরোধ যুদ্ধে যোগ দেন। এ সময়টাতে তিনি বিন লাদেনকে আল-কায়েদা গঠনে সর্বাত্মক সহায়তা করেন।
মৃত্যুর খবরে বারবার শিরোনামে
যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় জাওয়াহিরির মৃত্যুর খবরে তোলপাড় চলছে। এর সত্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ওঠা অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। এর আগেও তিন-তিনবার জাওয়াহিরির মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়েছে হোয়াইট হাউজ থেকে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিনি ফিরে এসেছেন। ২০০৬, ২০০৮ এবং ২০২০ সালে জাওয়াহিরির মৃত্যুর খবর সামনে আসে। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী পাকিস্তানে হামলা চালায়। ওই হামলায় জাওয়াহিরিসহ একাধিক আল-কায়েদা নেতার মৃত্যু হয় বলে দাবি করে হোয়াইট হাউজ। কিন্তু হামলার পর জাওয়াহিরি নিজেই একটি ভিডিও প্রকাশ করে জীবিত থাকার কথা ঘোষণা করেন। ওই ভিডিওতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বুশকে খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘বুশ! আপনি কি জানেন আমি কোথায় আছি?’
২০০৮ সালে আরও একবার জাওয়াহিরি মৃত্যুর খবর শোনা যায়। সেবার যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় মারাত্মকভাবে জখম হয়ে তিনি মারা যান বলে দাবি করা হয়। কিন্তু একটি ভিডিও আপলোড করে তার মৃত্যুর খবর মিথ্যা প্রমাণ করেন আল-কায়েদা প্রধান। ২০২০ সালে খবর রটে জাওয়াহিরি অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। কিন্তু সেবারও তিনি বেঁচে ফিরে আসেন। এবারও প্রশ্ন উঠছে, আদৌ কি জাওয়াহিরি মারা গেছেন নাকি আবারও প্রতিবারের মতো অদ্ভুতভাবে বেঁচে উঠবেন। তবে হোয়াইট হাউজ জানাচ্ছে, এবার আর বেঁচে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই জাওয়াহিরির।
পরবর্তী আল-কায়েদাপ্রধান কে?
ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর আল-কায়েদার হাল ধরেন আল-জাওয়াহিরি। তার মৃত্যুর পর কে হতে যাচ্ছেন আল-কায়েদা প্রধান?
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নাম আসছে বেশ কয়েকজনের। তারা হচ্ছেন সাইফ আল-আদেল, আবদুর রহমান আল-মাগরেবি ও ইয়াজিদ মেবরাক। তবে এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি কে হচ্ছেন পরবর্তী নেতা। এর মধ্যে সাইফ আল-আদেলের সম্ভাবনা সব থেকে বেশি। ৬০ বছর বয়সী আদেল একসময় মিসর সেনাবাহিনীতে ছিল। মিসরের সশস্ত্র বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়া ২০০১ সাল থেকে এফবিআইয়ের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা আদেল আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী লড়াইয়েও অংশ নিয়েছেন। সেখানে বিন লাদেন ও জাওয়াহিরির সঙ্গে পরিচয়। একসময় ওসামা বিন লাদেনের নিরাপত্তা প্রধানের দাায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, নাগরিক হত্যা এবং ভবন ধ্বংসের অভিযোগে তার মাথার দাম ১০ মিলিয়ন ডলার ঘোষণা করে দেশটির সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের দাবি, ১৯ বছর ধরে আদেল ইরানে লুকিয়ে আছেন। এ তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি রয়েছে অনেকের। কারণ মতাদর্শগতভাবে আল-কায়েদা আর ইরান পরস্পরবিরোধী। তবে মার্কিনবিরোধিতায় তারা এক ও অভিন্ন।
যেসব প্রশ্নের উত্তর নেই
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আল-জাওয়াহিরির নিশ্চিত মৃত্যুর কথা সগর্বে ঘোষণা করেছেন। দেশটির গণমাধ্যমগুলো বেশ ফলাও করে প্রচার করছে ড্রোন অভিযানের সাফল্যগাথা। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আদতে আল-কায়েদার মতো নেটওয়ার্ক, বিন লাদেন ও জাওয়াহিরিদের মতো চরিত্র আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পর তারাই এসব চরিত্রকে ধ্বংস করে ফেলে, এবার সেটাই হয়েছে। দৃশ্যপট থেকে আপাতত জাওয়াহিরিকে সরিয়ে দেওয়া হলো।
২০১১ সালে বিন লাদেনকে হত্যা করে তার লাশ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার দাবি করে আমেরিকা। ওই অভিযানের কোনো বিশ্বাসযোগ্য ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করেনি হোয়াইট হাউজ। এবারও অভিযানের কোনো বিশ্বাসযোগ্য ছবি কিংবা ভিডিও প্রকাশ করেনি। দেশটির সমর্থিত বিভিন্ন গণমাধ্যমে গ্রাফ এঁকে বলা হচ্ছে, জাওয়াহিরি রোজ সকালে ফজরের নামাজ সেরে বারান্দায় পায়চারি করতেন। সেখানেই বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র তাকে আঘাত করে। বাড়ির অন্যদের কিছু হয়নি। যত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার পুরোটাই বারান্দার ঠিক মাঝের জায়গা জুড়ে। তাহলে তার স্ত্রী-সন্তানরা এখন কোথায়?
জাওয়াহিরি যে বাড়িতে ছিলেন, ওই বাড়ির কয়েকটি ছবি প্রকাশ হয়েছে। একটিতে ভাঙা জানালা দেখা যাচ্ছে, অন্যটি ত্রিপল দিয়ে ঢাকা। আরেক ছবিতে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাছে। ছবিটি বেশ দূর থেকে তোলা। বলা হচ্ছে, হামলার পর ওই বাড়ি থেকে ধোঁয়া উঠছে। নিনজা ক্ষেপণাস্ত্রে বিস্ফোরকের বদলে বিশেষ ছয়টি ব্লেড থাকে। তাহলে ধোঁয়া এলো কীভাবে? এভাবে নানা অসংগতি তুলে ধরছেন বিশ্লেষকরা।
জাওয়াহিরির লাশ নিয়ে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। বলা হচ্ছে, বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তার দেহ টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, সেসব টুকরো কোথায়? তালেবান কর্র্তৃপক্ষ হামলার কথা স্বীকার করলেও কারো প্রাণহানির দাবি নস্যাৎ করেছে। আরেকটি বিষয় হলো, গত ২০ বছর কাবুল আমেরিকার দখলে ছিল, সেখানেই নিশ্চিন্তে বসবাস করছিলেন জাওয়াহিরি? এর উত্তর নেই।
উত্তর নেই জাওয়াহিরিকে লক্ষ্য করে ড্রোনটি কোথা থেকে পরিচালনা করা হয়েছে সেই জায়গার বিষয়ে। হেলিকপ্টার, স্থলভিত্তিক যানবাহন, জাহাজ এমনকি ফিক্সড উইং বিমানসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা যেতে পারে। জাওয়াহিরির ক্ষেত্রে মানুষবিহীন একটি ড্রোন থেকে এ মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে। সেটা পরিচালনা করা হয়েছে কোথা থেকে? অতীতে পাকিস্তানের ড্রোন হামলা আফগানিস্তান থেকে চালানো হতো। আবার সিরিয়ায় পরিচালিত হামলাগুলো হতো ইরাকের মিত্র অঞ্চলগুলো থেকে। কিন্তু কাবুলের এ ঘটনায় আশপাশে কোনো মিত্র দেশ নেই। সব মিলিয়ে পুরো বিষয়টি ধোঁয়াশাপূর্ণ।
বলা হচ্ছে, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী তালেবান সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে জাওয়াহিরি বেশিরভাগ সময় আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশের মুসা কালা জেলার পাহাড়গুলোতে থাকতেন। তিনি সেখানে নিজেকে খানিক আড়ালেই রাখতেন। গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে বছরের পর বছর আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে লুকিয়ে ছিলেন। পাহাড়ের ওই কঠিন পরিবেশ ছেড়ে জীবনের শেষ কয়েকটি মাস তিনি রাজধানী কাবুলের কাছে এক অভিজাত এলাকায় থাকতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তালেবান কর্র্তৃপক্ষ সে দাবি নাকচ করে দিয়েছে।
ওসামা বিন লাদেনকে গোপন অভিযানে হত্যার বিষয়টি নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। অবিশ্বাসের সেই গনগনে চুলায় তুষ ছুড়েছিলেন খোদ সাবেক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছিলেন, ‘আমেরিকান সেনারা বিন লাদেনের পরিবর্তে অন্য কাউকে হত্যা করেছে এবং লাদেনের এখনো বেঁচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’
শুধু ট্রাম্পই নন, মরদেহ খতিয়ে দেখার সুযোগ না দিয়ে সাগরে ফেলে দেওয়ায় লাদেন হত্যার এ অভিযানকে সে সময় ‘নাটক’ বলে অভিহিত করেন অনেকেই। কেননা হত্যার পর যে ছবি প্রকাশ করা হয়েছে সেটি আসলে লাদেনের ছবি নয়। জাওয়াহিরি কা-কেও ওসামা বিন লাদেনের হত্যার মতো আরেক নাটক মনে করা হচ্ছে। এটা বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে আমেরিকানদের হারানো ভাবমূর্তি ফেরানোর চেষ্টামাত্র। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ব্যর্থতা ঢাকতে তাদের এমন কিছু করার দরকার ছিল, যা তাদের আলোচনায় নিয়ে আসে।
বাড়তে পারে সহিংসতা
আয়মান আল-জাওয়াহিরির মৃত্যুতে যুদ্ধরত বিভিন্ন দেশে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। কারণ তার মৃত্যুর ঘটনা যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের কথিত সন্ত্রাসী কিংবা জিহাদি গোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীদের ওপর প্রভাব ফেলবে। ইতিমধ্যে সিরিয়ার একটি গ্রুপ কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সিরিয়ায় আল-কায়েদা দশকব্যাপী সংঘাতের সময় বেশ কয়েকটি জিহাদি গোষ্ঠীকে সমর্থন করেছে।
হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) গ্রুপের আবু আবদুল্লাহ আল-শামি নামে উচ্চপদস্থ এক নেতা মঙ্গলবার সামাজিকমাধ্যম টেলিগ্রামের অনলাইন চ্যাটরুমে আল-জাওয়াহিরির মৃত্যু উপলক্ষে তার প্রশংসা করে একটি বার্তা প্রকাশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন দেশের অনেক সংগঠন আল-কায়েদা দ্বারা অনুপ্রাণিত। তাদের মতাদর্শ এখনো তারা মান্য করে। তাদের কাছে জাওয়াহিরির মৃত্যু একটি বিশাল ধাক্কা। যেমন ইদলিবে অবস্থিত হুরাস আল দিন এবং সিরিয়ার তুর্কিস্তান ইসলামিক পার্টি আল-কায়েদার প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছে। এ শ্রেণির নেতারা জাওয়াহিরির মৃত্যুতে একেবারে চুপ করে থাকবে, সেটা বলা মুশকিল।
আবার ভিন্নমত রয়েছে। অনেকের মতে, জাওয়াহিরি ছিলেন আল-কায়েদার একটি পুরনো প্রজন্মের প্রতীক, যারা সিরিয়া এবং অন্যত্র আজকের জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রাসঙ্গিক নয়। হতে পারে জিহাদিদের বিশাল একটি অংশ আল-কায়েদা দ্বারা অনুপ্রাণিত। কিন্তু আল-কায়েদার কার্যকারিতা এখন আর সেভাবে নেই। তাই তরুণ প্রজন্মের জিহাদি নেতাদের মধ্যে জাওয়াহিরিসহ অন্যদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই ভিন্ন। তাই তাদের কাছে তার মৃত্যু বিশেষ কোনো ঘটনা নয়।
