বাংলাদেশ জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। পদ্মা ও যমুনায় যেভাবে ভাঙন বেড়েছে তাতে ২০৫০ সালের মধ্যে জিডিপি বছরে ১ থেকে ৩ শতাংশ কমবে। এজন্য সরকারের নেওয়া বদ্বীপ পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতকে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত বাংলাদেশ ডেলটা প্ল্যান ২১০০: নিরাপদ, পরিবেশ-বান্ধব ও সমৃদ্ধ বদ্বীপ অর্জনে বেসরকারি খাতের সংযুক্ততা বিষয়ক সেমিনারে তিনি এ আহ্বান জানান।
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, দেশের পরিবহন খরচ বিশে্বর মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল। সরকারের হিসাব অনুযায়ী ৪০৫টি নদী আছে, এগুলো ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনে খরচ কমিয়ে আনা যায়। বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নে প্রতি বছর গড়ে জিডিপির ২.৫ শতাংশ পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে, যার ২০ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে আসবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে। নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনাসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ যত বাড়বে, কাজের গতি ও মান তত বাড়বে।
জসিম উদ্দিন বলেন, শহরাঞ্চলে যানজট কমাতে নৌরুটের সম্ভাব্যতা কাজে লাগাতে হবে। এজন্য মূল ঢাকার সঙ্গে এর নিকটবর্তী অঞ্চল এবং জেলাগুলোর নৌপথ যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে পণ্য পরিবহন খরচ কমানো ও সহজতর করা গেলে একটি নিরাপদ পরিবেশবান্ধব ডেলটা পরিকল্পনা অর্জনের অনেকটাই সহায়ক হবে।
বদ্বীপ পরিকল্পনা লক্ষ্য অর্জনে গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ব্যবহৃত ড্রেজারসহ অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি অনেকটাই আমদানিনির্ভর। এসব পণ্যের শুল্ক হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার আহ্বান জানান সভাপতি। তিনি জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম উপাদান ড্রেজারের ওপর বর্তমানে মোট শুল্ক ৩১ শতাংশ। যা আগে ছিল ১ শতাংশ। প্রকল্প বাস্তবায়নে ড্রেজারের শুল্ক আগের হারে নিয়ে যাওয়া জরুরি বলে মনে করেন এফবিসিসিআই সভাপতি।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, রাজস্ব কাঠামো আয়মুখী না হয়ে উন্নয়নমুখী হওয়া উচিত। বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্যতম অনুষঙ্গ ড্রেজিংয়ের জন্য অপরিহার্য যন্ত্র ড্রেজারের শুল্কহার পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, সরকারের হাতে মাত্র ৩০টি ড্রেজার রয়েছে। কিন্তু এ কাজে ২ শতাধিক ড্রেজার দরকার। ড্রেজিংয়ের কার্যক্রম শতভাগ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।
ডেল্টা প্ল্যানের বাস্তবায়ন হচ্ছে বলেই দেশে দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হচ্ছে না বলে দাবি করেন ড. শামসুল আলম। প্রতিমন্ত্রী বলেন ২০৩০ সাল পর্যন্ত ডেল্টা পরিকল্পনার স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ঠিক করা হবে। এসময় দেশের নতুন করে কোনো সড়ক, মহাসড়ক নির্মাণ না করে বর্তমান অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে মনোযোগী হওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্ষার সময় নদীর পানি সমুদ্রে যাওয়ার আগে যদি সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে সারা বছর দেশে পানির কোনো অভাব হবে না, একই সঙ্গে পানি রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ড. মো. মিজানুর রহমান। মূল প্রবন্ধে সমৃদ্ধ বদ্বীপ অর্জনে ড্রেজিং, ভূমি পুনরুদ্ধার, জাহাজ নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন, কৃষি ও সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন খাতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ব্যাপক ভিত্তিতে সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলে জানান। বেসরকারি খাতকে সংযুক্ত করা গেলে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থানও সহজ বলে মনে করেন ড. মো. মিজানুর রহমান।
ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে আরও বেশি সুশাসন নিশ্চিতের তাগিদ দেন সেমিনারের বিশেষ অতিথি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার।
প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি কমছে, বিপরীতে বাড়ছে মানুষের খাদ্য চাহিদা। বেসরকারি খাত ছাড়া আগামীর স্বয়ংসম্পূর্ণ কৃষি খাত বিনির্মাণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ জানান, ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে ২৩০ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি বিনিয়োগ দরকার। এজন্য ব্যক্তি খাতকে ডেল্টা প্ল্যানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত করার বিকল্প নেই।
এর আগে প্যানেল আলোচনায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, বেসরকারি খাতকে কাজে লাগিয়ে নদী ও সমুদ্রবক্ষে বিপুল পরিমাণ ভূমি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এসময় প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ডেল্টা প্ল্যান পরিমার্জন করার পক্ষে মত দেন তিনি। একই সঙ্গে বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়গুলোর প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, নেদারল্যান্ডসের ভৌগোলিক অবস্থার সঙ্গে আমাদের ভৌগোলিক অবস্থার অনেক মিল আছে। ভূমিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য বেসরকারি খাতের অনেক বড় সুযোগ আছে।
এছাড়া সেমিনারে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সদস্য সচিব স্থপতি ইকবাল হাবীব, এফবিসিসিআইয়ের প্যানেল উপদেষ্টা ও চ্যানেল আইয়ের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শাইখ সিরাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক অরনি বারকাত, এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি মো. আমিন হেলালী, পরিচালক মো. নাসের, আবু মোতালেব।
বক্তারা বলেন, বদ্বীপ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশীদার কারা হবেন তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের পরিবেশ, প্রকৃতি, জলবায়ুর পরিবর্তনের গতির তুলনায় গবেষণা কার্যক্রমের গতি ধীর। অনেক সময় পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।
তারা জানান, দায়ী না হয়েও, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে রয়েছে। এজন্য দায়ী দেশগুলোর কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে হবে। সরকারের প্রতি ইউনিয়ন ও গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু, সহ-সভাপতি সালাউদ্দিন আলমগীর, মো. হাবীব উল্লাহ ডন, বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান, মহাসচিব মাহফুজুল হকসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা।
