জ্বালানি তেলের কর কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো যেত

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২২, ০১:৫২ এএম

সব ধরনের জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি দেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় উল্লেখ করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলেছে, বৈশি^ক অর্থনীতির এ অস্থির সময়ে সরকারের এ পদক্ষেপের কারণে মানুষ আরও চাপে পড়বে। সবচেয়ে বেশি ভুগবে নিম্ন আয়ের ও নির্ধারিত আয়ের মানুষ। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। দেশে কৃষি উৎপাদন কমলে আমদানি বাড়বে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি কমবে।

সিপিডি মনে করে, জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, অপচয় রোধ করে এবং কর প্রত্যাহার বা কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো যেত।

গতকাল বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে ‘জ্বালানি তেলের কি?’ শীর্ষক আলোচনায় উপস্থাপন করা সিপিডির নিবন্ধে এ মন্তব্য করা হয়েছে।

সদ্য শেষ হওয়া ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। একই অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত বিপিসির দাবি করা ৮ হাজার ১৫ কোটি টাকা লোকসানের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। এ প্রশ্ন তোলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন, বিকেএমইএ সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক, যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রমুখ।

গত শুক্রবার সরকার জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৪২ থেকে ৫২ শতাংশ বাড়িয়েছে।

নিবন্ধ উপস্থাপনকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার হিসাব তুলে ধরে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত সাত বছর (২০১৫-২১) বিপিসি জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৪৬ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা লাভ করেছে। এর মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে। বাকি ৩৬ হাজার কোটি গেল কোথায়?

তার প্রশ্ন, গত সাত বছরে বিপিসি প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। কিন্তু লাভের টাকার তো কোনো খোঁজই নেই, উল্টো শুধু এ বছর ৮ হাজার ১৫ কোটি টাকা লোকসানের কথা বলছে প্রতিষ্ঠানটি। দুর্নীতি, চুরি, অব্যবস্থাপনা কমিয়ে আনা এবং দক্ষতার উন্নয়ন করা গেলে এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের দাম একলাফে এত বাড়ানো দরকার হতো না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ড. ফাহমিদা বলেন, ‘অনেকে বলছেন আমাদের দেশের চেয়ে নাকি অন্য দেশে তেলের দাম কম। তবে আমি বলছি, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা ছাড়া অন্য কোনো দেশে তেলের দাম বাড়তি নেই। ভিয়েতনাম উদীয়মান অর্থনীতির একটা দেশ। অথচ ভিয়েতনামে ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ৯৭ দশমিক ৯ টাকা। আমরা কার সঙ্গে কী তুলনা করছি।’

সিপিডি জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিপিসির আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দরকার। এটা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তের জন্য হলেও ভোক্তার ওপর না চাপিয়ে আরও কিছুদিন চালিয়ে নেওয়ার আর্থিক সক্ষমতা বিপিসির ছিল।’ তিনি বলেন, ‘বিপিসি সব সময় জ্বালানি তেল বিক্রি করে লাভ করেছে। তাহলে এখন কেন ভর্তুকি তুলে নেওয়া হলো? বাকি ৩৬ হাজার কোটি টাকা কোথায়। শুনেছি প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু টাকা খরচ করছে। বিপিসির ২৫ হাজার কোটি টাকা অ্যাকাউন্টে রাখা হয়েছে। তাহলে এসব টাকা কার?’ তিনি মনে করেন, বিপিসি চাইলে এই সংকটের সময়ে জ¦ালানি তেলের ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে পারত।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, কৃষি খাতে ১৫ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয়, যার ৭৫ শতাংশ ডিজেলচালিত। এখানে অন্তত আগের দামে জ¦ালানি তেল সরবরাহ করতে হবে। কৃষিতে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ধানের উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশ বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘এমনিতেই আমরা নানা সমস্যায় আছি। বর্তমানে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এর ফলে জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে তো যাবেই। অনেক শ্রমিক খরচ মেটাতে পারবে না, তারা গ্রামে চলে যাবে। এতে আমাদের শিল্প বন্ধ হবে। ৪০ লাখ পোশাকশ্রমিক বিপদে পড়বে।’

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘হঠাৎ জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম চাপিয়ে দেওয়ায় আমরা আশ্চর্য হয়ে গেছি। সরকার এত সাহস করল কীভাবে? জ্বালানি তেলকে রাজস্ব আয়ের জন্য সরকার ব্যবহার করছে। পরোক্ষভাবে রাজস্ব নিতেই তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, বিশ্বে তেল থেকে রাজস্ব আয়ের প্রচলন আছে। তবে ডিজেলের দাম সব দেশেই কম রাখে। ডিজেলে ভর্তুকি না দিলে অনেক রকম ক্ষতি হয়। বাংলাদেশ ইতিহাসের খারাপ সময়ে আছে। তেলের দাম বৃদ্ধিতে সবাই বিপদে পড়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দিনে শহরে যাতায়াত খরচ বেড়েছে গড়ে ৭০ থেকে ২০০ টাকা। আর দূরপাল্লার বাসে খরচ বেড়েছে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা। শহরে প্রতি কিলোমিটারে আড়াই টাকা নির্ধারণ করা হলেও ৩ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে বিভিন্ন পরিবহন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত