ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিয়া রহমানকে ১১ লাখ ৪৬ হাজার ৬০১ টাকা পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। পাওনা টাকা পরিশোধ সাপক্ষে তার আগাম অবসর কার্যকর করা হবে বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার গণমাধ্যমের কাছে আসা ওই চিঠির অনুলিপি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। তবে এই চিঠির কোনো ‘যৌক্তিকতা’ নেই দাবি করে সামিয়া রহমান জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রবীর কুমার সরকার স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, প্রিয় মহোদয়া, আপনার ৩১-০৩-২০২২ তারিখের পত্রের বরাতে এবং ২৬-০৪-২০২২ তারিখে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে জানানো যাচ্ছে যে, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে আপনাকে দেনা-পাওনা সমন্বয় সাপেক্ষে ১৫-১১-২০২১ তারিখ হতে বিধি মোতাবেক আগাম অবসর (আর্লি রিটায়ারমেন্ট) গ্রহণের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। সিন্ডিকেটের ২৬-০৪-২০২২ তারিখের সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে আপনাকে আরও জানানো যাচ্ছে যে, আপনার নিকট বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা টাকা পরিশোধ না করলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে সামিয়া রহমানের পাওনার হিসাব উল্লেখ করে বলা হয়, ‘হিসাব পরিচালকের দপ্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী আপনার দেনা-পাওনা: মূল বেতন ৬,০৭,৫৭৪ টাকা, বাড়ি ভাড়া ৩, ০৩, ৭৮৭ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ১২,৮০০ টাকা, গবেষণা ভাতা ৪২,৬৬৭ টাকা, অফ ক্যাম্পাস ভাড়া ৮,৫৩৩ টাকা, বৈশাখী ভাতা ১৪,২৪০ টাকা, উৎসব ভাতা ১,৪২, ৪০০ টাকা, মোবাইল ভাতা ৯,৬০০ টাকা। মোট ১১ লাখ ৪১, হাজার ৬০১ টাকা (এগারো লাখ একচল্লিশ হাজার ছয় শত এক টাকা মাত্র)। আপনার প্রভিডেন্ট ফান্ডে সুদসহ জমাকৃত টাকার পরিমাণ ১৬,৫৮,২১৬ টাকা (ষোল লাখ আটান্ন হাজার দুইশত ষোল টাকা)।’
গবেষণায় ‘চৌর্যবৃত্তির’ অভিযোগে গত বছরের ২৮ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সামিয়া রহমানকে সহযোগী অধ্যাপক থেকে এক ধাপ নামিয়ে দুই বছর পর্যন্ত সহকারী অধ্যাপক রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সামিয়া রহমান গত বছরের ৩১ আগস্ট উচ্চ আদালতে রিট করেন। ৪ আগস্ট উচ্চ আদালত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের ওই সিদ্ধান্তকে ‘আইনগত কর্র্তৃত্ববহির্ভূত’ বলে রায় দেয় এবং তাকে সকল সুযোগসুবিধা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে পারিবারিক সমস্যার কারণে চার মাসের ছুটি নিয়ে গত বছরে নভেম্বরের শেষে সামিয়া রহমান যুক্তরাষ্ট্রে যান। ছুটির মেয়াদ শেষ হয় গত ৩১ মার্চ। ওই ছুটি শেষ হওয়ার আগেই ফেব্রুয়ারিতে বিনা বেতনে আরও এক বছরের ছুটি চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন তিনি। কিন্তু কর্র্তৃপক্ষ এই ছুটির অনুমোদন না দিলে ৩১ মার্চ সামিয়া রহমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগাম অবসরের আবেদন করেন, যা ২৬ এপ্রিলের সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সামিয়া রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাকে বিব্রত করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি ছুটি নিয়ে দেশত্যাগ করেছিলাম। ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আমি বিনাবেতনে এক বছরের জন্য ছুটির আবেদন করেছিলাম। কিন্তু তারা ছুটি না দেওয়ায় ৩১ মার্চ অর্থাৎ ছুটির শেষের দিন আমি স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেছিলাম। তারা আমাকে এর পাঁচ মাস আগ থেকে অবসরে পাঠাল, সেটা কীসের ভিত্তিতে। আর কীসের ভিত্তিতেই আবার তারা আমার কাছে টাকা ফেরত চাইছে? এর কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় অন্যায়ভাবে আমাকে শাস্তি দিয়েছিল সেটা আদালতে প্রমাণ হয়েছে। ষড়যন্ত্র করে তারা আমার মানহানি করেছে। এখন আবার নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। আমি এখন বিদেশে আছি, আমার অ্যাকাউন্টে তারা কত টাকা দিয়েছে কী করেছে আমি কিছুই জানি না।’
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাওয়া হলে সামিয়া রহমান বলেন, ‘আমি অবশ্যই এই বিষয়ে মামলা করব। ইতিমধ্যে আমি এই বিষয়ে উকিলের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি বিদেশে থাকায় আমার উকিল মামলার বিষয়ে যাবতীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আগের মামলাতে যেমন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হেরেছে এটাতেও হারবে তারা।’
সামিয়া রহমানকে দেওয়া চিঠির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ‘নিয়মনীতি অনুসরণ করেই এ ধরনের চিঠি দেওয়া হয়ে থাকে। তার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।’
