বঙ্গবন্ধুর লাশের খোঁজে ঢাকা মেডিকেলে

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২২, ০২:১৮ এএম

আমি তখন আজিমপুর কবরস্থানের পশ্চিমপাশে নিউপল্টনের একটা গলির ভেতরে, এলাহী বখশের মেসে থাকি। মেসটি ছিল একটা তিন কক্ষবিশিষ্ট টিনশেড, পাকা মেঝে এবং তল্লাবাঁশের বেড়া। ১৯৬৯ সালে আমি যখন এই মেসে ঢুকেছিলাম, তখন প্রতি রুমের ভাড়া ছিল ৪০ টাকা করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও আমি আমার ঐ প্রিয় মেসটিতেই ফিরে যাই। তখন মেসের ভাড়া যতদূর মনে পড়ে ৮০-১০০ টাকা ছিল।

ঐ মেসের সবাই ছিল আমার বন্ধু। আড্ডাবাজ এবং খেলা পাগল। আমরা দুটো তিনটার আগে কখনো ঘুমাতাম না। ১৪ আগস্ট ১৯৭৫-এর সেই রাতেও আমি ঘুমাতে গেছি দুটোর পর। বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারলাম না। ভোর পাঁচটা থেকে ছয়টার দিকে বন্ধুদের ডাকে আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমার রুমের দরজায় ধাক্কা দিয়ে একজন আর্তকণ্ঠে বলল, কবি সাহেব, ওঠেন। সর্বনাশ হয়ে গেছে। শোনেন রেডিওতে কী যেন বলছে। বঙ্গবন্ধুকে নাকি মেরে ফেলেছে।

আমি উঠে লাইট জ্বালালাম। তখন রেডিওটি নিয়ে সবাই আমার রুমে চলে এলো। রেডিও ঘিরে আমরা বসে খবরটি শুনছি আর প্রবল উৎকণ্ঠায় কেঁপে উঠছে আমাদের বুক। আমার মেসের বন্ধুরা সবাই জানে আমি বঙ্গবন্ধুর লোক। তাছাড়া আমি সাংবাদিকতা করি। সাংবাদিক। এই ঘটনা সত্যিই ঘটেছে কি-না, ঘটে থাকলে দেশের পরিস্থিতি এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এই নিয়ে সবার মনের মধ্যেই আতঙ্ক ও উদ্বেগ কাজ করে।

আমরা ঘটনাটিকে মিথ্যা বলে যতই উড়িয়ে দিতে চাইছিলাম বাংলাদেশ বেতার থেকে জনৈক মেজর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে এই দুঃসংবাদটি ততই গর্বের সঙ্গে ঘনঘন প্রচার করছিল। ঐ মেজর অবশ্য বঙ্গবন্ধু নয়, শেখ মুজিবই বলছিল।

মেসের বাইরে থেকেও আশপাশের কিছু লোক এসে ভিড় করেছিল আমাদের মেসটিতে, বাংলাদেশ রেডিওর ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ঐ অবিশ্বাস্য খবরটি নিজের কানে শোনার জন্য।

আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না।

খবরটির সত্যতা যাচাই করার জন্য আমি আমার অনুজপ্রতিম কবিবন্ধু মোস্তফা মীরকে নিয়ে মেস থেকে পথে বেরিয়ে পড়লাম। তখন ভোরের আকাশে আলো ফুটেছে সবে।

আমরা বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বাড়িতে যাব বলেই বেরিয়েছিলাম। কিন্তু আজিমপুর চৌরাস্তায় এসে লোকমুখে জানলাম, শুধু বঙ্গবন্ধু নন, গত রাতে বঙ্গবন্ধুসহ আরও অনেককেই হত্যা করা হয়েছে। এবং কিছুক্ষণ আগে নিহতদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। 

কী করে জানলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে একজন জানালেন যে, ঐ কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী কিছু সৈনিক কিছুক্ষণ আগে কামান তাক করা জিপে করে মেডিকেল কলেজের দিকে যাওয়ার পথে আজিমপুরে মোড়ে কিছুক্ষণের জন্য থেমেছিল। সৈনিকদের জিপ দেখে ভয়ে পথের পাশ থেকে সটকে পড়া লোকজনকে ঐ সৈনিকরা বলেছে ‘আপনারা ভয় পাবেন না, ভয়ের দিন শেষ হয়ে গেছে। আমরা শেখ মুজিবকে হত্যা করেছি। আপনারা ঢাকা মেডিকেল কলেজে যান এবং (তাদের ভাষায়) বেইমানদের লাশ দেখে আসুন।’

মেডিকেল কলেজের দিক থেকে তখন যারা আজিমপুরের দিকে আসছিলেন তারাও বললেনরেডিও থেকে প্রচারিত বিশেষ বুলেটিনে শুধু শেখ মুজিবকে হত্যা করার কথা বলা হলেও ঐ শেষ রাতের সেনা অভ্যুত্থানকালে আরও বহু মানুষকে যে হত্যা করা হয়েছেএরকম কোনো কথা রেডিওর সংবাদে একবারও বলা হয়নি।

শুধু বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখার জন্যই আমরা মেস থেকে পথে বেরিয়েছিলাম। আজিমপুর পেছনে রেখে আমরা পলাশী মোড়ে এসে লোকমুখে শুনতে পেলাম, শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয়, গত রাতের সামরিক অভ্যুত্থানকালে বঙ্গবন্ধু, শেখ মণি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের সব সদস্যকেই হত্যা করা হয়েছে। তাদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছে।

এসব কথা শোনার পর ভয়ে আমরা একবার মেসে ফিরে যাওয়ার কথাও ভাবছিলাম। হাসপাতালে গিয়ে না আবার বিপদে পড়ি। তারপর ভাবলাম, যা থাকে কপালে, চলো হাসপাতালে তো যাই। বঙ্গবন্ধুকে শেষবারেরর মতো দেখে আসি।

আমরা স্থির করলাম, শহীদ মিনারের পাশের গেইট দিয়েই আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে প্রবেশ করব।

শহীদ মিনারের সামনে এসে আমরা আর এগোনোর সাহস পেলাম না। শহীদ মিনার সংলগ্ন প্রবেশপথটি আগলে রেখে তখন কয়েকজন সৈনিক সামরিক জিপের পাশে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছিল। তাদের মুখে বিশ্বজয়ের হাসি।

পথচারীরা সৈনিকদের দৃষ্টি এড়িয়ে শহীদ মিনারের সামনের রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে চলে যাচ্ছিলেন।

আমরা দেখলাম ঐ প্রবেশপথ দিয়ে কেউই হাসপাতালের ভেতরে যাচ্ছেন না। তখন শুধু আমরা নই, কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী ঐ সৈনিকরাও বুঝতে পারল যে, পথচারীরা তাদের ভয় পাচ্ছে। এই ‘মহৎকর্ম’ সম্পাদনের জন্য ঢাকাবাসীর কাছ থেকে তারা তাদের ‘প্রত্যাশিত আচরণ’ পাচ্ছে না।

তখন ঐ সৈনিকরা পথচারীদের অভয় দিয়ে বলল ‘আসুন, আপনারা হাসপাতালের  ভেতরে যান, ভয় পাবেন না, যান (তাদের ভাষায়) বেইমানদের লাশ দেখে আসুন।’

শহীদ মিনার সংলগ্ন গেইট দিয়ে সৈনিকদের পাশ কাটিয়ে হাসপাতাল প্রবেশ না করে আমরা তখন বকশীবাজারের দিকে চলে গেলাম। আমরা জানতাম বকশীবাজারের দিকে হাসপাতালের দেয়ালে একটা ইটখোলা ভাঙা প্রবেশপথ আছে। আমার স্থির করলাম ঐ পথ দিয়ে সৈনিকদের দৃষ্টি এড়িয়ে আমরা হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করব। তখনো আমাদের মনে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর লাশ ঐ হাসপাতালের ভেতরেই আছে।

রেডিও থেকে প্রচারিত সংবাদে বারবার শুধু শেখ মুজিবকে হত্যা করার খবরটিই প্রচারিত হচ্ছিলঐ রাতে আরও কাউকে হত্যা করার কথা আমরা বুঝতে পারছিলাম না।

বকশীবাজারের দিকে গিয়ে দেখলাম, ঐ রাস্তায় কোনো সৈনিক নেই। ঐ পথের পাশের ভাঙা দেয়ালের ভেতরেও বাইরে সাধারণ মানুষের একটা ছোট্ট জটলা। শ’খানেক মানুষ হবে সেখানে।

তারা বলল, দেয়াল সংলগ্ন হাসপাতালের মর্গে অনেকগুলো লাশ স্তূপ করে রাখা আছে।

আমরা ভিড় ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলাম এবং মর্গের দিকে এগিয়ে গেলাম। মর্গের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরের মেঝেতে স্তূপ করে রাখা লাশগুলো সহজেই দেখা গেল। কিন্তু কোনো লাশের মুখই আমি দেখতে পেলাম না। ফলে আমি মর্গের আরও কাছে যেতে চাইলাম।

তখন একজন ডোম আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, স্যার এখানে বঙ্গবন্ধুর লাশ নাই। উনার লাশটি এখানে আনা হয়নি। রাতে নিহত আর সবার লাশই এখানে আছে।

পরে লাশ দাফনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্নেল হামিদের বই পড়ে জেনেছি হাসপাতালের মর্গে শেখ মণি ও আব্দুর রব সেরনিয়বাতের পরিবারের নিহত সদস্যের লাশই শুধু ছিল। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের লাশগুলো বত্রিশ নম্বরের বাড়িতেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। এই তথ্যটির সত্যতা যাচাই করার জন্য আমি একজনকেই শুধু পেলাম। তিনি হলেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। বঙ্গবন্ধুর ভাগনে, শেখ মণির ছোট ভাই। কর্নেল হামিদকে সমর্থন করে তিনিও জানালেন যে১৫ আগস্টের সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের নিহত সদস্যদের কারও লাশ নেওয়া হয়নি।

এখনো আশ্চর্য হই এই ভেবে যে, ১৫ আগস্টের সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমি কোনো পরিচিতজনকেই দেখিনি।

না কোনো কবি-সাহিত্যিক, না কোনো সাংবাদিক, না কোনো বুদ্ধিজীবী, না কোনো রাজনীতিক। হাসপাতালের মর্গের সামনে সেই সকালে যারা ভিড় করেছিলেন, তাদের অধিকাংশই ছিলেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের অ্যাটেনডেন্ট এবং কিছু পথচারী।

তখন আমি আর কবি মোস্তফা মীর স্থির করলাম আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করব। আমরা আজিমপুর-নিউমার্কেট হয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পথে অগ্রসর হওয়ার পথে সায়েন্স ল্যাবরেটরির কাছে পৌঁছে দেখলাম কিছু সৈনিক পথে কামান ফিট করে ঐ রাস্তাটি পাহাড়া দিচ্ছে। তারা কাউকেই ঐ পথে অগ্রসর হতে দিচ্ছে না।

পরে জেনেছিলাম, ১৫ আগস্টের সকাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার সবগুলো পথেই এরকম পাহাড়া বসিয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী সৈনিকরা। কয়েক ঘণ্টা আগে তারা যে বর্বর ও নিষ্ঠুর-হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে, তার প্রতি জনগণের প্রত্যাশিত সমর্থন যে ছিল না, তারা নিজেরাই তা বুঝতে পারছিল।

তাই মৃত-মুজিবকেও ঐ সৈনিকরা সেদিন নিিদ্র সামরিক পাহারায় ঢাকাবাসীর কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছিল। তারা বুঝে গিয়েছিলমৃত মুজিব জীবিত মুজিবের চেয়ে কম শক্তিশালী নন।

উপসংহার:

শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছেরেডিও থেকে এই সংবাদটি প্রচারিত হওয়ার পর থেকে আমি একটা অবিশ্বাস্য পরিস্থিতির মুখোমুখি হই। ঘটনাটিকে মিথ্যা বলে কিছুতেই উড়িয়ে দিতে পারছিলাম না। আবার এই মুজিবহীন বাংলাদেশে আমার এখন কী কর্তব্যসেটাও ঠিক করে উঠতে পারছিলাম না। একটি অসহায় পতঙ্গের মতো মনে হচ্ছিল নিজেকে। তারপরও আমার মস্তিষ্কের ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মতো শক্তিশালী দুটো কাব্যপঙক্তি।

‘‘মুজিব হত্যার দণ্ড এড়াবে,

খুনিদের এতো সাধ্য কী?

আমি কবি

জানি বাঙালির আরাধ্য কী!’’

রচনাকাল : ১৫ আগস্ট-১৬ আগস্ট, ১৯৭৫।  

লেখক : কবি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত