দেশে কোনো গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নেই বলে জাতিসংঘকে জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দেশে গুম বলে কোনো শব্দ নেই উল্লেখ করে সরকারের তরফে বলা হয়, নিখোঁজদের তথ্য পেলে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ অবশ্যই তদন্ত করবে। তবে এক্ষেত্রে নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের পরিবার ভয়ে কোনো তথ্য দিতে চায় না। যেটাকে এক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবেও তুলে ধরা হয়।
গতকাল রবিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাংলাদেশ সফররত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেটের সঙ্গে বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কিছু কিছু লোক বলেছে যে, ৭৬ জন গত ১০ বছরে নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের দাবি সরকার নিখোঁজ করেছে। এই ৭৬ জনের মধ্যে ১০ জনকে পাওয়া গেছে, ঘোরাঘুরি করছে। বাকিগুলো আমরা ঠিক জানি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমেরিকায় প্রতি বছর পুলিশ হাজারখানেক লোককে মেরে ফেলে। আমাদের দেশেও আগে হতো। ২০০২ বা ২০০৩ বা পরে এবং ওই সময় হার্টফেল হতো। কিন্তু এখন আর হার্টফেল নেই।’ ড. মোমেন বলেন, ‘বিশেষ করে বৈঠকে ডেভিড বার্গম্যান ও ব্র্যাড অ্যাডামস যে অভিযোগ করেছেন, সেটা বলেছি। দেশ উন্নতি করছে, সেটা তাদের পছন্দ নয়। তাই তারা এসব অভিযোগ করছেন। আর অভিযোগ রয়েছে ডেভিড বার্গম্যান টাকা নিয়ে এসব কাজ করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ও তিনি বিচারের বিপক্ষে কাজ করেছেন।’
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেইএ ধরনের কোনো তথ্য তার কাছে নেই বলে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক মিডিয়া নিবন্ধন করা হয়েছে। আমি বললাম, এ দেশে ২,৮০০ সংবাদপত্র প্রতিদিন বের হয়। সরকার এগুলোকে সেন্সর করে, এ ধরনের কোনো তথ্য আমার জানা নেই। এই ক্ষমতাও আমাদের নেই।’
নিজের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে ড. মোমেন বলেন, ‘আমরা অনেকের চেয়ে ভালো আছি, বলতে পারেন বেহেশতে আছি। আর যায় কোথায়! সবাই আমারে এক্কেরে... আমি তো ট্রু সেন্সে বেহেশত বলিনি, কথার কথা। কিন্তু আপনারা সবাই আমারে খেয়ে ফেললেন। এই হলো বাংলাদেশের মিডিয়ার স্বাধীনতা খর্ব!’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি কি মিডিয়ার স্বাধীনতা খর্ব করেছি? আফটার অল আই অ্যাম অ্যা পাবলিক ফিগার। নিশ্চয় আপনারা আমাকে ক্রিটিসাইজ করতে পারেন। আই ডোন্ট মাইন্ড। তবে আগামীতে সাবধান হতে হবে। আমি খোলামেলা মানুষ, আমি শিক্ষক মানুষ। আমি যেটা মনে করি, সেটা খোলামেলা বলে ফেলি।’
মিশেল ব্যাচেলেটের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিসংঘ খুব উদ্বিগ্ন। তারা চায় এদের সাহায্য করতে এবং এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে থাকবে। আমরা বলেছি রোহিঙ্গা আগেও এসেছিল বহুবার এবং ফেরত গেছে। এবারে সংখ্যায় বেশি। তবে দুঃখের বিষয় যারা মানবাধিকারের জন্য শান্তি পুরস্কার পেয়েছে তারা মিয়ানমারের সঙ্গে আগের মতো সম্পর্ক বজায় রাখছে। চুটিয়ে ব্যবসা করছে এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ব্যবসা ১৫ গুণ বেড়েছে। শুধু যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য বেড়েছে ১০০ গুণ। বিনিয়োগ হয়েছে গত ৫-৬ বছরে ২৩০ কোটি ডলার। আমরা বলেছি আপনারা রাখাইনে গিয়ে সাহায্য করেন।’
ড. মোমেন বলেন, ‘যারা আমাদের আইনের কথা বলে, মানবাধিকারের কথা বলে, আইনের শাসনের কথা বলে তাদের দেশে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ঘুরে বেড়ায়, বাজার করে, সন্তান নিয়ে সিনেমা হলে যায়। দেশে ফেরত আসলে তাদের ফাঁসি হওয়ার অজুহাতে যদি ফেরত না পাঠান, তবে ওই দেশের জেলে রাখেন না কেন। সেটাও তো করেন না।’
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট গতকাল চার দিনের সফরে ঢাকায় এসেই সিরিজ মিটিংয়ে ব্যস্ত দিন পার করেছেন। প্রথম দিন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে বৈঠক করেন।
মিশেল ব্যাচেলেটের সঙ্গে বৈঠকের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘বৈঠকে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, ফ্রিডম অব প্রেস এবং ফ্রিডম অব স্পিচ নিয়ে আলাপ হয়েছে। কারাগারে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী মোশতাক বিষয়ে এবং আলাপ হয়েছে ট্রেনিংয়ের ব্যাপারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে যে, উনাদের সঙ্গে আমার যে কথা হয়েছে সেখানে আমি ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে আপনাদের সাথে যে কথাগুলো বলেছিলাম, ঠিক সেই কথাগুলোই উনাকে জানিয়েছি। উনি এটা আরও ভালো করে জানেন। এই কারণেই, আপনারা জানেন যে, আমি একটা টিম করে দেই, যেটার মধ্যে লেজিসলেটিভ সচিব হচ্ছেন সভাপতি এবং যেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইসিটি মন্ত্রণালয় এবং আইন ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিরা আছেন। এই প্রতিনিধিরা উনার যে অফিস, অফিসের সঙ্গে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের বেস্ট প্র্যাকটিস নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছেন। সেটার একটি প্রতিবেদন আমার কাছে পৌঁছেছে, প্রতিবেদন আমি দেখার পরে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেব, সেটাই আমি বলেছি।’
আনিসুল হক বলেন, ‘আমি রোহিঙ্গাদের কথা বলেছি। মোশতাক সম্পর্কে যখন উনি প্রশ্ন করেছেন, আমি পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা তাকে পড়ে শুনিয়েছি। তারপর তিনি আর প্রশ্ন করেননি। দুই পক্ষই আমরা যেটা জোর দিয়েছি, সেটা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য যারা আছেন, তাদের ট্রেনিংয়ের ব্যাপারে। তখন আমরা বলেছি, আপনারা একটা প্রস্তাব পাঠান, আমরা অবশ্যই সেটা বিবেচনা করব।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সবশেষে আমি যেটা শক্তভাবে তুলে ধরেছি, তা হলো আমাদের সরকারের অবস্থান। আমি বলেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার মানবাধিকারকে সাংঘাতিক মূল্য দেয়। তার কারণ হচ্ছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের একজন ভিকটিম হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ মানবাধিকার বিষয়ে সবসময়, বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকার মানবাধিকারকে সবসময় সমুন্নত রাখবে এবং আইন দ্বারা এটা ভায়োলেশন বন্ধ করা যায়, সেই ব্যাপারে সক্রিয় থাকবে।’
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে তারা কি কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেছেজানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো উদ্বেগ ছিল না, এটা আলোচনার মধ্যে আসছে।’ বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে অবজারভেশন কীএ প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, ‘সেটা উনি বলবেন, আমি বলব না।’
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থার প্রধান হিসেবে এটিই মিশেল ব্যাচেলেটের প্রথম বাংলাদেশ সফর। আজ তিনি যাচ্ছেন কক্সবাজারে। সেখানে বাংলাদেশের মানবিক আশ্রয়ে থাকা মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখা ছাড়াও শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করবেন ব্যাচেলেট।
কক্সবাজার থেকে ফিরে আগামী ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। একই দিনে রাজধানীর ইস্কাটনে বিস মিলনায়তনে একটি সেমিনারে বক্তৃতা করার পাশাপাশি ঢাকার জাতিসংঘ অফিসের আয়োজনে বাংলাদেশে থাকা পশ্চিমা কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী ও এনজিও প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলাদা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করবেন তিনি। সমাপনী দিনে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এ সফর নিয়ে বিস্তারিত জানাবেন মিশেল ব্যাচেলেট।
