শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার সব ঘটনার বিচার জরুরি

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২২, ১১:৩৫ পিএম

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে দুটি জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান হয়। একটি হচ্ছে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক হরকাতুল জিহাদ (হুজি), যার নেতৃত্বে ছিল আফগান ফেরত যোদ্ধারা। অপরটি মধ্যপ্রাচ্যপন্থি জেএমবি। উভয় দলের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকলেও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর কারণে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে জামায়াত। শিবিরের সাবেক ক্যাডাররা যুক্ত হয়েছিল এসব দলে। চার্জশিট, বাদীদের সাক্ষ্যপ্রমাণ, হরকাতুল জিহাদের (হুজি) প্রধান মুফতি হান্নান এবং খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ও তৎকালীন এপিএস-১ সাইফুল ইসলাম ডিউকের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এটি পরিষ্কার যে, এই আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা। এই কাজের জন্য হুজি সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করা হয়। অবশ্য, হুজি জঙ্গিদের বিকৃত মতাদর্শের কারণে তাদের খুব বেশি অনুরোধ করতে হয়নি। কারণ ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের জন্য শেখ হাসিনাকে তারা ‘ইসলামের শত্রু’ বলে বিবেচিত করত। হামলার কয়েকদিন আগেই গুলশানে ‘হাওয়া ভবন’ নামে পরিচিত তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। সান্ত¡না এই যে, ১৫ বছর পরে হলেও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারী অপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষিত হয়েছে। ২০০৮ সালের ১১ জুন সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রথম চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। এরপর বিচারে ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ২০১১ সালের ৩ জুলাই অধিকতর তদন্ত শেষে তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর এই মামলায় ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ এসেছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দেশ পরিচালনায় চ্যালেঞ্জসমূহকে সামনে এনেছে; স্পষ্টভাবে চেনা গেছে তার ও বাংলাদেশের শত্রুদের। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে বিএনপির আমলে ১৯৯৪ সালে ঈশ্বরদীতে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টা মামলার রায়ে ৯ জনের ফাঁসির দণ্ড ঘোষিত হয়েছে। উপরন্তু ২৫ জনের যাবজ্জীবন, ১৩ জনের ১০ বছর কারাদণ্ড হয়েছে। ২১ আগস্ট ভয়াল গ্রেনেড হামলার মতোই ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুকন্যা ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রাণনাশের চেষ্টা করেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সন্ত্রাসীরা। ওই হামলায়ও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো পাবনার ঈশ্বরদীতে ট্রেন বহরে হামলার ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার। কিন্তু অপরাধীরা পার পায়নি। ২৫ বছর পর হলেও ১৯৯৪ সালের সবচেয়ে বহুল আলোচিত চাঞ্চল্যকর এই হামলা মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে ২১ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু যারা সেসব হত্যা চেষ্টা করেছিল তাদের কাউকেই হত্যার চেষ্টা করা হয়নি, বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির পার্থক্য। ২১ বার হত্যাচেষ্টার মধ্যে ১৪টি ঘটনায় মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কেবল চারটি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। এসব হামলার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬০ জন দলীয় নেতাকর্মী নিহত হওয়ার হিসাব আছে; আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। এসব ঘটনার মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় যাদের প্রাণহানি ঘটেছে সেই পরিবারগুলো এখনো বিচার পায়নি। শেখ হাসিনাকে যতবার হত্যাচেষ্টা করা হয় তার অনেক ঘটনায় মামলাও হয়নি। এমনকি হামলার পর উল্টো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার নজিরও আছে। যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছিল, তার প্রতিটিরই বিচারে সময় লেগেছে এক যুগের বেশি। কোনো কোনোটির ২০ থেকে ২৫ বছর। আবার বিচারিক আদালতে রায় এলেও উচ্চ আদালতে একটিরও মীমাংসা হয়নি এখনো। ১৯৮৯ সালে ধানমন্ডিতে হত্যা চেষ্টার রায় আসে ২০১৭ সালে। সময় লাগে ২৮ বছর। ১৯৯৪ সালে পাবনা ঈশ্বরদীতে হত্যা চেষ্টার মামলায় রায় এলো চলতি বছর; সময় লেগেছে ২৫ বছর। ২০০১ সালে গোপালগঞ্জে হত্যাচেষ্টার মামলায় রায় আসে ২০১৭ সালে। সময় গেছে ১৬ বছর। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় হত্যাচেষ্টার রায় আসে ২০১৮ সালে। সময় লেগেছে ১৪ বছর।

দেশে ফেরার পর পিতার মতো তাকেও হত্যাচেষ্টা হয়েছে বারবার। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে দুটি (১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি, ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট), ১৯৯১ থেকে ’৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে চারটি (১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, ৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, ’৯৫ সালের ৭ মার্চ, ১৯৯৬ সালের ৭ মার্চ), ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে তিনটি (২০০০ সালের ২২ জুলাই, ২০০১ সালের ৩০ মে, ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর), ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে চারটি (২০০২ সালের ৪ মার্চ, ২০০২ সালের ২৬ আগস্ট, ২০০৪ সালে ২ এপ্রিল, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট), সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একটি (২০০৭ সালে ১/১১ পরবর্তী সময় কারাবন্দি থাকা অবস্থায় খাবারে বিষপ্রয়োগ করে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়) এবং আওয়ামী লীগের আমলেই চারটি হত্যাচেষ্টার কথা জানা যায় (২০১১ সালে শ্রীলঙ্কার একটি সন্ত্রাসবাদী দলের চেষ্টা নস্যাৎ হয়)। বঙ্গবন্ধুর খুনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শরিফুল হক ডালিম এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ জন অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সদস্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য সামরিক অভ্যুত্থানের চক্রান্ত করে। ২০১৪ সালের শেষদিকে প্রশিক্ষিত নারী জঙ্গিদের মাধ্যমে মানববোমায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। ২০১৫ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে কারওয়ান বাজার এলাকায় তার গাড়িবহরে বোমা হামলার চেষ্টা চালায় জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্যরা। তবে ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়া জঙ্গিনেতা মুফতি হান্নান শেখ হাসিনাকে বারবার হত্যার চেষ্টা করেছে। গোপালগঞ্জে ২২ জুলাই ২০০০, খুলনায় ৩০ মে ২০০১, সিলেটে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০১ এবং ঢাকায় ২১ আগস্ট ২০০৪ সালের চেষ্টা ছিল অন্যতম। আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হয় মুফতি হান্নান। একপর্যায়ে সে এদেশে ধর্মভিত্তিক উগ্রপন্থার সূচনাকারী হুজি-বির অন্যতম শীর্ষ নেতায় পরিণত হয়। তার নেতৃত্বে এ দেশে হুজি-বি প্রথম বোমা হামলা চালায় ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে। এরপর সাত বছরে অন্তত ১৩টি নাশকতামূলক ঘটনা ঘটায় তারা। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০১, আহত হয়েছেন ৬০৯ জন।

২০১১ সালের ৩ জুলাই ৫২ জনকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার প্রকৃত অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচিত হয়। এই মামলার ৫২ আসামির মধ্যে ৩৩ জন কারাগারে; পলাতক ১২ জনের মধ্যে তারেক রহমান লন্ডনে, কেউ কেউ আছেন কানাডা, ব্যাংকক, আমেরিকায়; হুজির শীর্ষ নেতারা পাকিস্তানে পালিয়েছে। এদের সবাইকে অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকর করা হলে এদেশে আইনের শাসন আরও মজবুত হবে। মনে রাখতে হবে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা বিএনপি-জামাতের কুকর্মের দলিল এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা।

লেখক অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত