সবুজ-শ্যামল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বাংলা জলবায়ুু পরিবর্তনের কারণে ধুঁকছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব দেশজুড়ে। ভালো নেই উপকূলের মানুষ। জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব দিনকে দিন বাড়ছে। বাড়ছে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বহু আগে থেকেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ উপকূলের বিভিন্ন জেলার হাজার হাজার পরিবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিকার হয়ে উদ্বাস্তুর জীবন বরণ করতে বাধ্য হয়েছে এবং হচ্ছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে প্রত্যক্ষ প্রভাব না পড়লেও রাজধানীসহ দেশের মধ্যাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে। জলবায়ু উদ্বাস্তুরা ভিড় জমাচ্ছেন দেশের মধ্যাঞ্চলে। উপকূলের শিশুদের জীবনও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এলোমেলো। প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো আরও বেশি সংকটের কবলে নিমজ্জিত হচ্ছে। একটা দুর্যোগ কাটিয়ে না উঠতেই আরেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে উপকূলবাসীর স্বপ্ন তছনছ করে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলের মানুষের কর্মসংস্থান কমে গেছে। উপকূলের শত শত পরিবার কাজ হারিয়ে, নদীভাঙনের শিকার হয়ে, সুপেয় পানির সংকটে বেঁচে থাকার তাগিদে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। উপকূলে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলার কথা এখনো কেউ ভোলেনি। সাতক্ষীরা ও খুলনায় উপকূলের বেড়িবাঁধে এখনো বহু পরিবার মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।
‘পরিবেশগত শরণার্থী’ শব্দটি ১৯৭৬ সালে লেস্টার ব্রাউন প্রথম ব্যবহার করেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) পরিবেশগত অভিবাসীর সংজ্ঞায় বলেছে, ‘পরিবেশগত অভিবাসী’ হলো সেই ব্যক্তিরা বা ব্যক্তির দলসমূহ, যারা পরিবেশের আকস্মিক বা ক্রমপরিবর্তনের কারণে, যে পরিবর্তনসমূহ তাদের জীবন বা জীবনযাত্রার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, সাময়িক বা স্থায়ীভাবে নিজেদের অভ্যাসগত আবাস ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, অথবা স্বেচ্ছায় এ পথ বেছে নেয়, এবং যারা দেশের ভেতরে অন্যত্র কিংবা বিদেশে চলে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশে পরিবেশগত সংকট তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষত বয়ে বেড়াতে হচ্ছে শিশুদের। জলবায়ুর সরাসরি প্রভাবে ভুগতে থাকা পরিবারগুলো তাদের শিশুসন্তানদের দিকে নজর দিতে পারছে না। শিশুদের লেখাপড়া, পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ ও স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জীবনের তাগিদে পরিবারগুলো যখন অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই শিশুরা তাদের পরিবারের সঙ্গে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাচ্ছে। উপকূলের শিশুদের স্বাভাবিক জীবন এমন ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংকটে থাকা উপকূলের মানুষের মধ্যে এমনিতেই সচেতনতা কম! উপর্যুপরি দুর্যোগে পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে না পারার ছাপ পড়েছে শিশুদের ওপর।
ঘূর্ণিঝড়, খরা, নদীভাঙন, বন্যা, লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট, জলোচ্ছ্বাস, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি প্রভৃতি উপকূলের জীবনব্যবস্থার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও বরগুনার উপকূলীয় এলাকায় জনসংখ্যা তুলনামূলক কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার উপকূল ছাড়ছে। জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে উপকূল ছেড়ে মানুষজন জেলা শহর, বিভাগীয় শহর ও রাজধানী শহরে থিতু হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ছে, বাড়ছে উদ্বাস্তু। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষম বাস্তবতা থেকে শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না, বরং শিশুরা এর বড় ভুক্তভোগী। শিশু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ‘অ্যাকশন এইড’ এবং ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়া’ তাদের এক যৌথ জরিপ শেষে সদ্য প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা আগামী ৩০ বছরে ৭ গুণ বেড়ে যাবে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে আরও ৩০ লাখ মানুষ তাদের বাস্তুভিটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। গবেষণার ফলাফলে আরও বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ ও ভয়াবহ প্রভাবে ২০৫০ সাল নাগাদ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে বাস্তুভিটা ছেড়ে দিতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাসস্থান হারাবে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব জানাচ্ছে, বাংলাদেশে এখন প্রতি বছর চার লাখ মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসছে স্থায়ীভাবে। এ সংখ্যা প্রতিদিন দুই হাজারের মতো। তাদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগ জলবায়ু উদ্বাস্তু। যে শিশুরা উদ্বাস্তু হয়ে পরিবারের সঙ্গে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছে তাদের জীবনে নেমে আসছে অজানা সমস্যা। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিশুদের বেগ পেতে হচ্ছে। কেউ পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে, অনেকে আবার পারছে না।
জলবায়ু উদ্বাস্তু শিশুরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক সময় উদ্বাস্তু হয়ে আসা পরিবারগুলো সংকটে পড়ে শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক শিশু শিক্ষার অভাবে বিপথে চলে যাচ্ছে। উপকূলের বাস্তবতা সত্যিই ভয়াবহ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবের শিকার হয়ে যদি দেশের শিশুদের একাংশের জীবনে এমন চরম সংকট নেমে আসে তাহলে এ ক্ষতি মেনে নেওয়া কঠিন।
উপকূলের শিশুদের সংকটের মধ্যে রেখে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন করা কি সম্ভব? যে জলবায়ু পরিবর্তনে শিশুদের কোনো হাত নেই তারা কেন সমস্যার ফল ভোগ করবে? উন্নত বিশে^র কার্বন নির্গমনের দায় কেন অসহায় শিশুদের ভোগ করতে হবে? উন্নয়নশীল দেশে বসবাস করার কারণে কেন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্বাস্তু জীবন গ্রহণ করতে হবে? জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমান প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত তো হচ্ছেই বোধ করি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এর ফল ভোগ করতে হবে। হয়তো বর্তমান থেকে আরও ভয়াবহ ফল ভোগ করতে হতে পারে!
শুধু বাংলাদেশে নয়, যুদ্ধ-সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে দেশে উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়ছে। উদ্বাস্তুর জীবন যে কত কষ্টের তা শুধু উদ্বাস্তুরাই জানেন। শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ সম্পদ। দেশের শিশুদের একাংশকে সংকটের মধ্যে রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। উদ্বাস্তু শিশুদের বসবাস হয়তো কোনো বস্তিতে, রেললাইনের ধারে কিংবা নদীর তীরে উঁচু বাঁধে। উদ্বাস্তু শিশুদের শনাক্ত করে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে যেসব প্রকল্প বা কার্যক্রম চালু আছে সেগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
লেখক : শিক্ষক ও পরিবেশকর্মী
