চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকার তহবিল সীমিত করেছে। এতে সরকারের ৩৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। তবে, তহবিল সীমিত করায় অর্ধেকের বেশি উন্নয়ন প্রকল্প বাধার মুখে পড়েছে বলে জানা গেছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘চলতি অর্থবছরের (২০২২-২৩) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ১ হাজার ৩০০টি প্রকল্পের ৭১৭টি তহবিল স্থগিত করার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অর্থায়ন বন্ধ করার জন্য ৮১টি প্রকল্পকে লাল তালিকায় রেখেছে পরিকল্পনা কমিশন। এ ছাড়া উন্নয়ন বাজেটের অধীনে ৬৩৬টি প্রকল্পে আংশিক অর্থায়ন করা হবে।’
২০২১-২২ অর্থবছরের জুনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার জন্য এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রায় ১ হাজার ৩০০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য (২০২২-২৩ অর্থবছর) ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করে।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পের ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভ্রমণ, আপ্যায়ন ও প্রশিক্ষণ খরচ ৫০ শতাংশ এবং কম্পিউটার, মনিহারি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, আসবাব কেনার খরচ ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে। বিভিন্ন কমিটির সম্মানি ও প্রকল্পের জন্য যানবাহন কেনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে সরকারের ৩৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ কর্মসূচির সমন্বিত বাজেট ও হিসাবরক্ষণ পদ্ধতির আওতায় এসব কাজে অর্থায়ন চলতি অর্থবছরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি হলে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।’
অর্থ মন্ত্রণালয় ৩ জুলাই পরিপত্র জারি করে জানায়, ‘মন্ত্রণালয়/বিভাগ/অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং অধীন দপ্তর/সংস্থা “এ” ক্যাটাগরির প্রকল্পের বাস্তবায়ন যথানিয়মে অগ্রাধিকার দিয়ে চালিয়ে যাবে। “বি” ক্যাটাগরির প্রকল্পের সরকারি (জিওবি) অংশের ২৫ শতাংশ সংরক্ষিত রেখে অনূর্ধ্ব ৭৫ শতাংশ খরচ করবে। “সি” ক্যাটাগরির প্রকল্পের অর্থছাড় আপাতত স্থগিত থাকবে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ/অন্যান্য প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন অনুসারে “সি” ক্যাটাগরির প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ (পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ বিভাগের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে) “এ” ক্যাটাগরির প্রকল্পে খরচ করতে পারবে।’
পরিকল্পনা কমিশন ফাস্টট্র্যাক ৯টি প্রকল্প ক্যাটাগরির বাইরে রেখেছে।
সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের কিছু খাতে বরাদ্দ করা টাকা দিয়ে যানবাহন কেনা (মোটরযান, জলযান ও আকাশযান) বন্ধ রাখা হয়েছে। জরুরি ও অপরিহার্য বিবেচনায় আপ্যায়ন খরচ, ভ্রমণ খরচ এবং মনিহারি, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি ও আসবাব বাবদ খরচের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ খরচ করা যাচ্ছে। প্রশিক্ষণ খাতে (সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ব্যতীত) বরাদ্দের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ খরচ করা যাচ্ছে। তবে এসব খাতের বরাদ্দ অন্য কোনো খাতে যোগ করা যাচ্ছে না। উন্নয়ন বাজেট ও নিজস্ব তহবিলের আওতায় বাস্তবায়নাধীন সব ধরনের প্রকল্প/কর্মসূচি/স্কিমের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি), প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি), বিভাগীয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (ডিপিইসি), বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (এসপিইসি) এবং বিভাগীয় বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (ডিএসপিইসি) সভায় সম্মানী বাবদ টাকা খরচ বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার অর্থবছরের শুরুতেই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজস্ব আয়ের যে অবস্থা তাতে সময়মতো সরকার যে এ সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যয়-সংকোচনের কোনো বিকল্প নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য একটি নীতিমালা দরকার।’
প্রবাস-আয় (রেমিট্যান্স) কমে যাওয়ায় এবং রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি (রিজার্ভ) কমেছে এবং অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি (রিজার্ভ) নেমে এসেছে ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে। এক বছর আগেও যা ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলার। একসময় বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি (রিজার্ভ) ৪৮ বিলিয়ন ডলারও হয়েছিল।
