একত্রিংশ (৩১তম) পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) কে হচ্ছেন, এ নিয়ে গুঞ্জন চলছে; আলোচনাও কিছু হচ্ছে। বর্তমান আইজিপিই নতুন মেয়াদে থাকবেন, নাকি নতুন একজনকে আইজিপি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে তা নিয়েই গুঞ্জন এবং আলোচনা। এ নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে আলোচনা হচ্ছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেই আইজিপি নিয়োগের কথা ভাবা হচ্ছে। নির্বাচনই এ ক্ষেত্রে নিয়ামক উপাদান।
একই সঙ্গে র্যাব মহাপরিচালক ও ডিএমপি কমিশনার পদে নতুন মুখ নিয়ে আলোচনা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ এ তিন পদে আসীন হওয়ার জন্য জোর তদবির শুরু হয়েছে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে। অনেকে মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতা, আমলাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে জানা গেছে। পুলিশের আরও কিছু পদে বদল হওয়ারও আভাস পাওয়া গেছে। বলা যায়, সবার চোখ এখন পুলিশে নিবদ্ধ।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আইজিপি নিয়োগের ক্ষেত্রে এবার মুখ্য বিবেচনায় থাকবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ধরে নেওয়া হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা থাকবে বেশি। বর্তমান আইজিপির মেয়াদ না বাড়লে নতুন আইজিপি হিসেবে ‘গ্রহণযোগ্য’ একজন কর্মকর্তাকে বিবেচনা করবে সরকার। নির্ভরযোগ্য একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে এ পদে।
বর্তমান আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে যাচ্ছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৫৯ বছর বয়স হলে অবসরকালীন ছুটিতে (পিআরএল) যেতে হয়। সে হিসাবে বর্তমান আইজিপির চাকরির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। নতুন আইজিপি নিয়োগ করা হচ্ছে, নাকি বর্তমান আইজিপির চাকরির মেয়াদ চুক্তি ভিত্তিতে বাড়ানো হচ্ছে তা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনে এবং সংশ্লিষ্ট মহলে জোরালো আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন, বর্তমান আইজিপির মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হচ্ছে। আবার কেউ বলছেন, আইজিপি পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার নজির নেই। বলা চলে, দুই লাখের বেশি সদস্যের পুলিশ বাহিনীতে নতুন অভিভাবক আসছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান আইজিপির পক্ষে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য নানা চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অন্যরাও নানা তদবির করছেন আইজিপি হতে। আসলে কে আইজিপি হবেন তা প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কেউ বলতে পারবেন না।’ বর্তমান আইজিপি সপ্তম ব্যাচের কর্মকর্তা। পরের ব্যাচে আছেন তিনজন কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলামের চাকরির বয়সসীমা প্রায় এক বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে। তাকে এক বছরের জন্য চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি কিছুদিন পর অবসরে চলে যাবেন। একই ব্যাচের আরেক কর্মকর্তা চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এখন র্যাবের প্রধান। আগামী জানুয়ারি মাসে তিনি অবসরে যাবেন। আরেক কর্মকর্তা আওরঙ্গজেব মাহবুব। তিনি এখন অ্যাডিশনাল ডিআইজি। তিনি আরও বলেন, ডিএমপি কমিশনার ও র্যাবের ডিজি পদের জন্যও তদবির চলছে। ১২ বা ১৫ ব্যাচের কোনো একজন র্যাব মহাপরিচালক হতে পারেন। ১২, ১৫ ও ১৭ ব্যাচের চারজন কর্মকর্তার নাম আলোচনায় আছে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে। বর্তমান কমিশনারের পক্ষে আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য তদবির করা হচ্ছে।
আইজিপি হিসেবে আলোচনায় আছেন যারা : পুলিশ সূত্র জানায়, নতুন আইজিপি হিসেবে পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার নাম আলোচনায় এসেছে। র্যাবের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আলোচনায় আছেন। অষ্টম ব্যাচের এই কর্মকর্তার আগামী ১১ জানুয়ারি অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। সৎ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে বাহিনীতে ও সরকারের কাছে তার সুনাম রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন), রেঞ্জ ডিআইজি হিসেবে ময়মনসিংহ ও ঢাকার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত আইজিপির দায়িত্ব পান। র্যাবের ডিজি হিসেবে যোগদানের আগে তিনি সিআইডি প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
আইজিপি হিসেবে আলোচনায় আছেন ১৫তম ব্যাচের (গ্রেড-১ চলতি দায়িত্ব) কর্মকর্তা, এসবির প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. মনিরুল ইসলাম। সৎ ও দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে বাহিনীতে ও সরকারের কাছে সুনাম রয়েছে তার। তিনি নিজ ব্যাচের মেধাতালিকায় প্রথম। তিনি সারদা পুলিশ একাডেমি, মেট্রোপলিটন পুলিশ, জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। একক প্রচেষ্টায় তিনি ২০১৬ সালে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) গঠন করেন। ওই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি সিটিটিসির প্রধানের দায়িত্ব নেন তিনি। জঙ্গি দমনে ও নির্মূলে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।
আইজিপি হিসেবে আলোচনায় আছেন ১২তম ব্যাচের কর্মকর্তা ও পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (লজিস্টিকস অ্যান্ড অ্যাসেট অ্যাকুইজিশন) এসএম রুহুল আমিন। সৎ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে বাহিনীতে ও সরকারের কাছে তার সুনাম রয়েছে। তিনি নিজ ব্যাচের মেধাতালিকায় প্রথম। তিনি সিএমপির উপপুলিশ কমিশনার, সিলেট জেলার পুলিশ সুপার, সিআইডির এসএস, চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি, রেলওয়ে রেঞ্জের ডিআইজি ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আইভরি কোস্ট, দক্ষিণ সুদানসহ বিশে^র বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন।
আইজিপি হিসেবে আলোচনায় আছেন ১২তম ব্যাচের কর্মকর্তা, হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি ড. মল্লিক ফখরুল ইসলাম। সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা হিসেবে পুলিশ বিভাগে ও সরকারের কাছে তার সুনাম রয়েছে। নিজ ব্যাচের মেধাতালিকায় তিনি তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। তিনি ভোলা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট ও ফেনী জেলার পুলিশ সুপার, ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার, পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (প্রশিক্ষণ), র্যাব-৩-এর কমান্ডিং অফিসার, এসবির ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রেলওয়ে, হাইওয়ে ও ট্যুরিস্ট রেঞ্জে নেতৃত্ব দেন। ফখরুল ইসলাম পূর্ব তিমুরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে (ইউএনএমআইটি) এফপিইউ কমান্ড্যান্টের দায়িত্ব পালন করে জাতিসংঘ পদক অর্জন করেছেন।
আইজিপি হিসেবে আলোচনায় আছেন অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. কামরুল আহসান। তিনি ডিএমপির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার, ফেনী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, শরীয়তপুর, চট্টগ্রাম ও যশোর জেলার পুলিশ সুপার, পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (সংস্থাপন ও ট্রেনিং), সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি এবং রেলওয়ে রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সিলেট রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে প্রথম বিট পুলিশিং কার্যক্রম শুরু করে প্রশংসিত হন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের ‘পুলিশ অ্যাডভাইজার’ হিসেবে সিয়েরা লিওন ও সুদানে দায়িত্ব পালন করেন।
ডিএমপি পুলিশ কমিশনার হিসেবে যাদের নাম আলোচনায় আছে : এক বছরের জন্য চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম আগামী ৩০ অক্টোবর অবসরে যাবেন। নয়া কমিশনার হতে পুলিশ কর্মকর্তারা সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলে দৌড়ঝাঁপ করছেন। বর্তমান কমিশনারের পক্ষে আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার জন্য তদবির করা হচ্ছে। ১২তম ব্যাচের অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম, ১৫তম ব্যাচের অতিরিক্ত আইজিপি মাহবুবুর রহমান, ১৭তম ব্যাচের ডিআইজি হাবিবুর রহমান ও ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেনের নাম আলোচনায় আসছে বেশি। আতিকুল ইসলাম পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত আছেন। তিনি নৌ-পুলিশের প্রধান ও ডিএমপির রমনা ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মাহবুবুর রহমান বর্তমানে শিল্প পুলিশের প্রধান। তিনি সিএমপি কমিশনার ছিলেন। হাবিবুর রহমান বর্তমানে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে কর্মরত। তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন),ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার ও ডিএমপিতে (প্রশাসন) ছিলেন। মো. আনোয়ার হোসেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে কর্মরত। তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন), গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রথম কমিশনার ও ডিএমপির মতিঝিল, মিরপুর ও লালবাগ ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার ছিলেন।
র্যাব মহাপরিচালক হিসেবে যাদের নাম আলোচনা রয়েছে : এলিট ফোর্স র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। তার চাকরির মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের ১১ জানুয়ারি। আইজিপি হিসেবে তার নিয়োগ হওয়ারও আভাস মিলছে। পদটি শূন্য হওয়ার পর নতুন ডিজি হিসেবে যোগ দেবেন পুলিশের একজন চৌকস কর্মকর্তা। বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে অতিরিক্ত আইজিপি ড. মল্লিক ফখরুল ইসলাম, অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. শাহাবুদ্দিন খান রয়েছেন। মল্লিক ফখরুল ইসলাম ও শাহাবুদ্দিন খান বিভিন্ন সময়ে র্যাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইজিপি, পুলিশ কমিশনার ও র্যাব মহাপরিচালক ছাড়াও পুলিশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি হচ্ছে। ২ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) ড. মইনুর রহমান চৌধুরী অবসরে যাবেন। তার স্থানে অতিরিক্ত আইজিপি এসএম রুহুল আমিন, অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাজহারুল ইসলাম বা অতিরিক্ত আইজিপি এম খুরশীদ হোসেন আসতে পারেন। পুলিশ টেলিকম সংস্থার পদটিও খালি। সেখানে একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে নিয়োগ দেওয়া হবে। কয়েকজন ডিআইজি ও মেট্রোপলিটন কমিশনারও পরিবর্তন হতে পারে।
